ঢাকার পল্লবীতে আট বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত দম্পতিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। মাত্র পাঁচ কার্যদিবসের বিচারিক কার্যক্রম শেষে দেওয়া এই রায়কে রাষ্ট্রপক্ষ বাংলাদেশের ইতিহাসে দ্রুততম হত্যা মামলার বিচার হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে একই সঙ্গে মামলাটির অস্বাভাবিক দ্রুত নিষ্পত্তি বিচারপ্রক্রিয়া ও ন্যায়বিচার নিয়ে নতুন বিতর্কও সৃষ্টি করেছে।
রোববার ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল এই রায় ঘোষণা করেন। ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় এবং অভিযোগপত্র দাখিলের পর মাত্র পাঁচ দিনের শুনানি শেষে বিচারক মাসরুর সালেকিন অভিযুক্ত সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে মৃত্যুদণ্ড দেন।
রায়ের পাশাপাশি সোহেল রানাকে পাঁচ লাখ টাকা এবং স্বপ্না খাতুনকে দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, এই অর্থ ভুক্তভোগী শিশুর পরিবারকে দিতে হবে। জরিমানার অর্থ পরিশোধ না করলে দণ্ডপ্রাপ্তদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি জব্দ করে নিলামের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের ব্যবস্থাও নেওয়া যাবে।
রায় ঘোষণার সময় আদালত বলেন, দণ্ডপ্রাপ্তদের “মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত ফাঁসিতে ঝুলিয়ে রাখা হবে।”
মামলাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। গত ১৯ মে ঢাকার পল্লবী এলাকার একটি বাসা থেকে শিশুটির খণ্ড-বিখণ্ড মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তদন্ত কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দিনই শিশুটিকে হত্যা করা হয়। পরে মরদেহ টুকরো টুকরো করে গোপন করার চেষ্টা করা হয়।
ঘটনার পর স্বপ্না খাতুনকে ঘটনাস্থল থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই দিন নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে সোহেল রানাকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরে তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করে পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। এরপর নজিরবিহীন গতিতে বিচারকার্য সম্পন্ন হয়। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো হত্যা মামলার বিচার এত দ্রুত শেষ হয়নি।
বিশেষ সরকারি কৌঁসুলি আজিজুর রহমান দুলু রায়ের পর সাংবাদিকদের বলেন, “ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার পেয়েছে। আমরা রায়ে সন্তুষ্ট।”
শিশুটির বাবাও রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে দণ্ড কার্যকর করা হবে।
তবে মামলার দ্রুত বিচার নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ অভিযুক্তদের পক্ষে কোনো বেসরকারি আইনজীবী মামলা পরিচালনা করতে রাজি হননি। ফলে আদালত একজন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী নিয়োগ দেন। তিনি সোহেল রানার ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং স্বপ্না খাতুনের জন্য অপেক্ষাকৃত লঘু শাস্তির আবেদন করেছিলেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, ভয়াবহ অপরাধের বিচার দ্রুত হওয়া প্রয়োজন হলেও মৃত্যুদণ্ডের মতো গুরুতর মামলায় অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগের বিষয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, অধিকাংশ মামলায় বিচার পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়, আবার অনেক ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত দোষীদের সাজাও হয় না।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট এবং উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের যৌথ এক গবেষণায় দেখা গেছে, ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতনসংক্রান্ত মামলায় দণ্ডপ্রাপ্তির হার মাত্র প্রায় ৩ শতাংশ। বিপরীতে প্রায় ৭০ শতাংশ আসামি শেষ পর্যন্ত খালাস পান বা মুক্তি লাভ করেন।
এই পরিসংখ্যান দেশের বিচারব্যবস্থা নিয়ে জনমনে হতাশা তৈরি করেছে। ফলে আলোচিত ও নৃশংস অপরাধের ঘটনায় দ্রুত বিচারের দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস কাজল জানিয়েছেন, ট্রাইব্যুনালের নথিপত্র হাতে পাওয়ার পর তার কার্যালয় উচ্চ আদালতে দ্রুত শুনানির আবেদন করবে।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “ট্রায়াল কোর্টের নথি পাওয়ার পর আমরা দ্রুত শুনানির উদ্যোগ নেব।”
আইনমন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানও আশা প্রকাশ করেছেন যে, সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ অগ্রাধিকার দিলে আপিল ও পর্যালোচনাসহ পুরো আইনি প্রক্রিয়া তিন মাসের মধ্যেই শেষ হতে পারে।
তবে বাংলাদেশের আইনে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড সরাসরি কার্যকর করা যায় না। উচ্চ আদালতের বাধ্যতামূলক অনুমোদন এবং পরবর্তী আপিল প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই দণ্ড কার্যকর করা সম্ভব।
ফলে মামলাটি এখন উচ্চ আদালতের পর্যালোচনার মুখোমুখি হবে। সেখানে শুধু অপরাধের ভয়াবহতা নয়, বিচারপ্রক্রিয়ার গতি এবং আইনগত যথার্থতাও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
দেশজুড়ে ক্ষোভ ও শোকের জন্ম দেওয়া এই হত্যাকাণ্ডে আদালতের রায় অনেকের কাছে দ্রুত ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে। আবার অন্যদের মতে, বিচার যত দ্রুতই হোক না কেন, ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতি ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত হওয়াটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুটির মর্মান্তিক মৃত্যু বাংলাদেশের নারী ও শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা, বিচারব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং দ্রুত বিচার বনাম সুষ্ঠু বিচারের বিতর্ককে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। এখন নজর থাকবে উচ্চ আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।

