বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিসিবির সভাপতি তামিম ইকবাল

বলপূর্বক সবকিছু দলীয়করণের চলমান সময়ে তামিমের নির্বাচনও ছিল প্রতিদ্বন্দীহীন

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন সাবেক জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক তামিম ইকবাল। গত এপ্রিল মাসে অন্তর্বর্তীকালীন ভিত্তিতে বোর্ডের দায়িত্ব গ্রহণের পর এবার আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের ক্রিকেটের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে বসেছেন তিনি।

রোববার মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বিসিবির পরিচালক নির্বাচন শেষে নবনির্বাচিত পরিচালকদের সভায় তামিমকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। এর আগে ক্লাব ক্যাটাগরির নির্বাচনে সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছিলেন তিনি।

বিসিবির কর্মকর্তা রাবীদ ইমাম ভয়েসকে জানান, ক্লাব ক্যাটাগরিতে সর্বোচ্চ ভোট পাওয়ার পর নবনির্বাচিত পরিচালকদের সমর্থনে তামিম সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। কেউ তাঁর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সাহস করেনি। সব জায়গা থেকে ”নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ“ বিতারণের নামে সবকিছু বলপূর্বক দলীয়করণের এই সময়ে তামিমের নির্বাচনও ছিল প্রতিদ্বন্দীহীন।

নবগঠিত বোর্ডে সহ-সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন ফাহিম সিনহা। যদিও বিসিবির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দুজন সহ-সভাপতি থাকার সুযোগ রয়েছে, নির্বাচন কমিশন এখন পর্যন্ত একজনের নামই ঘোষণা করেছে।

ক্লাব ক্যাটাগরির নির্বাচনে তামিম ৭৩ ভোট পেয়ে শীর্ষে থাকেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সাঈদ ইব্রাহিম আহমেদ ও ইসরাফিল খসরু পান ৭২ ভোট করে। এই ক্যাটাগরিতে ১২টি পদের বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ১৬ জন প্রার্থী।

জেলা ক্যাটাগরিতে ভোটের আগেই সাতজন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ফলে খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলের কয়েকটি আসনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে শফিকুল আলম, শান্তনু ইসলাম এবং মিজানুর রহমান বিজয়ী হন।

এ ছাড়া সংগঠন ও বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ক্যাটাগরি-৩ থেকে সাবেক ক্রিকেটার সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরিচালক নির্বাচিত হন।

সব মিলিয়ে নির্বাচনের মাধ্যমে ২৩ জন পরিচালক নির্বাচিত হয়েছেন। বাকি দুটি পদ জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের (এনএসসি) মনোনয়নের মাধ্যমে পূরণ করা হবে। এরপর ২৫ সদস্যের বোর্ড গঠিত হলে পরিচালকদের সভায় তামিমকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়।

তবে এই নির্বাচন শুধু ক্রিকেট প্রশাসনের ঘটনা হিসেবেই নয়, দেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতার আলোচনার মধ্যেও স্থান করে নিয়েছে।

গত এপ্রিল মাসে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ বিসিবির আগের বোর্ড ভেঙে দেয়। সে সময় পরিষদ দাবি করেছিল, পূর্ববর্তী বোর্ড গঠনের প্রক্রিয়ায় অনিয়ম পাওয়া গেছে। এর পরপরই তামিম ইকবালের নেতৃত্বে একটি অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়।

৭ এপ্রিল ঢাকায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের ক্রীড়া পরিচালক মোহাম্মদ আমিনুল আহসান বলেন, “আমরা তদন্তে কিছু অনিয়ম পেয়েছি। আমরা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলকে জানিয়েছি যে, আগের পরিচালনা পর্ষদ যথাযথভাবে গঠিত হয়নি।”

এর মাত্র দুই মাসের মাথায় নির্বাচন আয়োজন এবং পরে তামিমের সভাপতি নির্বাচিত হওয়া বিসিবির প্রশাসনিক পুনর্গঠনের প্রক্রিয়াকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে গেছে।

তবে সমালোচকদের একটি অংশ বলছেন, বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে এ ধরনের নির্বাচনগুলোকে শুধু সাংগঠনিক নির্বাচন হিসেবে দেখার সুযোগ শেষ হয়ে গেছে। সরকার দল যাকে সমর্থন দেবে তাঁর বাইরে দাঁড়ানো কঠিন।

গত কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন, আইনজীবী সমিতি, ক্রীড়া সংস্থা এবং প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনে প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অংশগ্রহণের সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের মতে, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছে যেখানে অনেক ক্ষেত্রে নির্বাচনী প্রতিযোগিতা সীমিত হয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে সরকারের সমর্থকরা এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলছেন, আইনগত ও সাংগঠনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

এই বাস্তবতায় তামিমের নির্বাচনকে অনেকেই কেবল ক্রিকেট প্রশাসনের পরিবর্তন নয়, বরং বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে দেখছেন—যখন সবকিছু বলপূর্বক দলীয়করণ করা হচ্ছে।

তবে তামিমের ক্রিকেটীয় অর্জন নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। প্রায় দেড় দশকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে তিনি বাংলাদেশের অন্যতম সফল ব্যাটার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক তিনি। তিন ফরম্যাটেই আন্তর্জাতিক শতক করা একমাত্র বাংলাদেশি ব্যাটারও তামিম।

অ্যাডহক কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন তিনি। সে সময় ক্রিকেটবিষয়ক ওয়েবসাইট ক্রিকবাজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তামিম বলেছিলেন, “আইসিসিতে অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে গড়ে তুলতে হবে।”

তার সমর্থকদের মতে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা বিসিবির জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সমালোচকদের মতে, ক্রিকেট বোর্ড পরিচালনায় জনপ্রিয়তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং প্রতিষ্ঠানগত স্বাধীনতা।

নতুন বোর্ডের সামনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ঘরোয়া ক্রিকেটের সংস্কার, আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, ক্রিকেট অবকাঠামো উন্নয়ন, বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা।

তামিম ইকবালের নির্বাচন তাই শুধু একজন সাবেক অধিনায়কের প্রশাসনিক নেতৃত্ব গ্রহণের ঘটনা নয়। এটি এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন দেশের ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানগুলোও বৃহত্তর রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

আগামী দিনে তামিমের নেতৃত্ব বিসিবিকে কতটা কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে পারে এবং তিনি ক্রিকেট প্রশাসনে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার আনতে পারেন কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles