প্রায় দুই বছর পর আবারও বাংলাদেশের মাটিতে খেলতে আসছে ভারতের একটি জাতীয় দল। আগামী ১০ জুন ঢাকায় শুরু হতে যাওয়া আন্তর্জাতিক হ্যান্ডবল ফেডারেশনের (আইএইচএফ) ট্রফি-২০২৬ টুর্নামেন্টে অংশ নিতে ভারত তাদের যুব হ্যান্ডবল দল পাঠাচ্ছে।
ক্রীড়াঙ্গনের এই ঘটনা শুধু একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের অংশগ্রহণ নয়, বরং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাওয়া বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে একটি তাৎপর্যপূর্ণ উন্নয়ন হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এর প্রভাব পড়ে কূটনীতি, বাণিজ্য, ভিসা ব্যবস্থা এবং ক্রীড়া বিনিময়েও। ভারত বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা প্রদান উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত করে। একই সময়ে বেশ কয়েকটি ক্রীড়া ইভেন্টেও ভারতীয় দল অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকে অথবা সফরের অনুমতি পায়নি।
এমন পরিস্থিতিতে ঢাকায় ভারতের হ্যান্ডবল দলের অংশগ্রহণকে দুই দেশের ক্রীড়া যোগাযোগ পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পল্টনের শহীদ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী জাতীয় হ্যান্ডবল স্টেডিয়ামে ১০ জুন শুরু হবে পাঁচ দিনব্যাপী আইএইচএফ ট্রফি-২০২৬। দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার জোন-২ অঞ্চলের এই টুর্নামেন্টে অংশ নেবে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ইয়েমেন, মালদ্বীপ ও আফগানিস্তান।
আন্তর্জাতিক হ্যান্ডবল ফেডারেশন (আইএইচএফ) এক ঘোষণায় জানিয়েছে, “দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া অঞ্চলের অনূর্ধ্ব-১৮ ও অনূর্ধ্ব-২০ বিভাগের আইএইচএফ ট্রফি প্রতিযোগিতা ১০ থেকে ১৪ জুন ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে।” সংস্থাটি আরও জানায়, এই প্রতিযোগিতা থেকে চ্যাম্পিয়ন দল পরবর্তী মহাদেশীয় পর্বে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে।
ক্রীড়া কূটনীতির নতুন ইঙ্গিত
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ইতিহাসে খেলাধুলা বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। রাজনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন থাকলেও ক্রিকেট, ফুটবল ও অন্যান্য খেলাধুলার মাধ্যমে দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বজায় থেকেছে।
তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেই চিত্র বদলে যায়। ভারতীয় ক্রীড়া দলগুলোর বাংলাদেশ সফর কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। গত বছর ঢাকায় অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-২০ নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপেও ভারত দল পাঠায়নি।
এর আগে ২০২৫ সালে বাংলাদেশের বিপক্ষে তিনটি ওয়ানডে ও তিনটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলতে ভারতের জাতীয় ক্রিকেট দলের ঢাকায় আসার কথা ছিল। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) সরকারের অনুমতি না পাওয়ার কথা জানিয়ে সিরিজটি স্থগিত করার অনুরোধ করে।
ভারতের ক্রিকেট সফর স্থগিত হওয়া দুই দেশের ক্রীড়া সম্পর্কের অবনতির অন্যতম বড় উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। কারণ ক্রিকেট দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতা।
তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে শুরু করে। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দুই দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়ে এবং ভারতও স্থগিত ক্রিকেট সিরিজ আয়োজনের আগ্রহ প্রকাশ করে।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) প্রকাশিত সূচি অনুযায়ী, ভারতীয় ক্রিকেট দল আগামী ২৮ আগস্ট ঢাকায় পৌঁছাবে। এরপর ১, ৩ ও ৬ সেপ্টেম্বর তিনটি ওয়ানডে এবং ৯, ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর তিনটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে।
তরুণদের জন্য বড় মঞ্চ
হ্যান্ডবল টুর্নামেন্টটি মূলত তরুণ খেলোয়াড়দের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেওয়ার লক্ষ্যে আয়োজন করা হয়। বিশ্বজুড়ে খেলাটির প্রসার এবং নতুন প্রতিভা গড়ে তুলতে আইএইচএফ বিভিন্ন মহাদেশকে একাধিক অঞ্চলে ভাগ করেছে।
দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলো নিয়ে গঠিত হয়েছে এশিয়ান জোন-২। এই অঞ্চলের দলগুলোর জন্য আইএইচএফ ট্রফি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতাগুলোর একটি।
আইএইচএফ তাদের টুর্নামেন্ট সংক্রান্ত ঘোষণায় বলেছে, “এই প্রতিযোগিতা এশিয়ার মহাদেশীয় পর্বে উত্তরণের বাছাই প্রতিযোগিতা হিসেবে কাজ করবে।”
অনূর্ধ্ব-২০ বিভাগে অংশগ্রহণকারী ছয়টি দলকে দুটি গ্রুপে ভাগ করা হয়েছে। ‘এ’ গ্রুপে রয়েছে ভারত, নেপাল ও ইয়েমেন। ‘বি’ গ্রুপে খেলবে স্বাগতিক বাংলাদেশ, মালদ্বীপ ও আফগানিস্তান।
প্রতিটি গ্রুপের শীর্ষ দুই দল সেমিফাইনালে উঠবে। ১৪ জুন অনুষ্ঠিত হবে ফাইনাল।
অন্যদিকে অনূর্ধ্ব-১৮ বিভাগে রাউন্ড-রবিন পদ্ধতিতে খেলা হবে। সর্বাধিক পয়েন্ট অর্জনকারী দল চ্যাম্পিয়ন হবে।
বাংলাদেশের জন্য সুযোগ
বাংলাদেশের জন্য এই টুর্নামেন্ট শুধু একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা নয়, বরং আঞ্চলিক ক্রীড়া আয়োজনের সক্ষমতা প্রদর্শনেরও সুযোগ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্রিকেটের বাইরে অন্যান্য খেলায় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা আয়োজনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
একই সঙ্গে ভারতীয় দলের উপস্থিতি দুই দেশের ক্রীড়া সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার ইঙ্গিতও বহন করছে। ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক সম্পর্কে মতপার্থক্য থাকলেও খেলাধুলা প্রায়ই পারস্পরিক আস্থা গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
ভারতের হ্যান্ডবল দলের ঢাকা সফর এবং আগামী সেপ্টেম্বরে ভারতীয় ক্রিকেট দলের সম্ভাব্য বাংলাদেশ সফর সেই দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।
প্রায় দুই বছরের বিরতির পর বাংলাদেশের মাটিতে কোনো ভারতীয় জাতীয় দলের উপস্থিতি শুধু হ্যান্ডবল টুর্নামেন্টের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের বর্তমান গতিপ্রকৃতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
আগামী কয়েক দিনে মাঠের লড়াইয়ে কে জিতবে, সেটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ক্রীড়া কূটনীতির মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক কতটা এগোয়, সেটিও নজরে রাখবেন পর্যবেক্ষকরা।

