নীরবতায় ঐতিহাসিক ৭ জুন, স্মৃতির লড়াইয়ে ছয় দফা

স্বাধীনতার রাজনৈতিক ভিত্তি গড়ে দেওয়া ছয় দফা আন্দোলনের দিবসটি কর্মসূচিবিহীনভাবে পালিত হচ্ছে; আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকায় ইতিহাস স্মরণের পরিসর নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।

আজ ঐতিহাসিক ৭ জুন, ছয় দফা দিবস। বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে দিনটি এক অনন্য মাইলফলক। এই ছয় দফা আন্দোলনই পরবর্তীকালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করেছিল। কিন্তু দেশের ইতিহাসের এত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন এবার অনেকটাই নীরবে পালিত হচ্ছে।

রোববার সকাল পর্যন্ত দিবসটি উপলক্ষে বড় কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের পক্ষ থেকে উল্লেখযোগ্য কর্মসূচির ঘোষণা দেখা যায়নি। এমন এক সময়ে দিবসটি এসেছে, যখন ছয় দফা আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে এবং মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার চেতনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংগঠন ও ব্যক্তিবর্গের রাজনৈতিক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত। তাদেরকে কোনো কর্মসূচী পালন করতে দেওয়া হচ্ছে না; হামলা করা হচ্ছে। দৃশ্যত স্বাধীনতার ভিত্তি রচনাকারী আন্দোলনের স্মৃতি ও উত্তরাধিকার বহনে অন্যরাও ব্যর্থ হচ্ছে।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছ থেকে দিবসটি পালনের কোনো প্রত্যাশা ছিল না। অন্যদিকে সংসদে তাদের ঘনিষ্ঠ বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর। ফলে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মাইলফলকটি বড় ধরনের কোনো জাতীয় কর্মসূচি ছাড়াই পালিত হচ্ছে।

ছয় দশক আগে, ১৯৬৬ সালের ৭ জুন, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের স্বাধিকার আন্দোলন এক নতুন মোড় নেয়। সেই আন্দোলনের দাবিই পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের পথ প্রশস্ত করে। অথচ আজ সেই ঐতিহাসিক দিবসের আবহ অনেকটাই ম্লান।

ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি শুধু কোনো কর্মসূচির অনুপস্থিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাস, স্বাধীনতা আন্দোলনের স্মৃতি এবং জাতীয় রাজনৈতিক ঐতিহ্যকে ঘিরে চলমান বৃহত্তর বিতর্কেরও প্রতিফলন।

ইতিহাস বদলে দেওয়া ছয় দফা

১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের এক সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ছয় দফা কর্মসূচি উপস্থাপন করেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান রাজনৈতিক বৈষম্য, অর্থনৈতিক শোষণ এবং প্রশাসনিক বঞ্চনার শিকার ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে ছয় দফা ছিল বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণ ও ন্যায্য অধিকারের সুস্পষ্ট রাজনৈতিক রূপরেখা।

ছয় দফার অন্যতম প্রধান দাবি ছিল ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে একটি প্রকৃত ফেডারেল কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা সীমিত থাকবে শুধু প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিষয়ে। এছাড়া পৃথক মুদ্রা বা কার্যকর আর্থিক ব্যবস্থা, কর আদায়ের ক্ষমতা প্রাদেশিক সরকারের হাতে ন্যস্ত করা, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পৃথক হিসাব এবং পূর্ব পাকিস্তানের জন্য আলাদা মিলিশিয়া বা আধাসামরিক বাহিনী গঠনের দাবিও এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল।

পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী শুরু থেকেই ছয় দফাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মসূচি হিসেবে আখ্যায়িত করে। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ এটিকে নিজেদের বাঁচার সনদ হিসেবে গ্রহণ করে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ছয় দফা আন্দোলন গণআন্দোলনে রূপ নেয়।

তৎকালীন অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানেও দুই অংশের মধ্যে বৈষম্যের চিত্র স্পষ্ট ছিল। পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় অংশ পূর্ব পাকিস্তান থেকে এলেও উন্নয়ন ব্যয় ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হতো। এসব বঞ্চনার বিরুদ্ধে জনমতকে সংগঠিত করতেই ছয় দফা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

৭ জুন: আন্দোলনের মোড় ঘুরে যাওয়ার দিন

ছয় দফা আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচিত হয় ১৯৬৬ সালের ৭ জুন।

সেদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং অন্যান্য আটক নেতাদের মুক্তির দাবিতে পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে হরতাল পালিত হয়। সরকারি দমন-পীড়ন উপেক্ষা করে লাখো মানুষ রাজপথে নেমে আসে।

ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ নেত্রী আমেনা বেগম হরতাল সফল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি বিভিন্ন জেলায় সংগঠনের নেতাকর্মীদের সক্রিয়ভাবে সংগঠিত করেন।

ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশ ও তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস গুলি চালায়।

সেদিন অন্তত ১১ জন নিহত হন। তাঁদের মধ্যে মনু মিয়া, শফিক এবং শামসুল হকের নাম ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

এই হত্যাকাণ্ড আন্দোলনের চরিত্রই বদলে দেয়। সাংবিধানিক দাবির আন্দোলন দ্রুত গণঅভ্যুত্থানের রূপ নিতে শুরু করে। জনমনে ক্ষোভ বাড়তে থাকে এবং ছয় দফার প্রতি সমর্থন আরও বিস্তৃত হয়।

পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধু তাঁর স্মৃতিচারণায় লিখেছিলেন, কারাবাস ও দমন-পীড়ন বাঙালির ন্যায্য অধিকারের আকাঙ্ক্ষাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। তিনি বারবার বলেছেন, ছয় দফা কোনো বিচ্ছিন্নতার কর্মসূচি নয়; এটি ছিল বাঙালির বেঁচে থাকা, মর্যাদা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের কর্মসূচি।

স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা

রাজনৈতিক ইতিহাসবিদদের অনেকেই ছয় দফাকে বাংলাদেশের প্রথম রাজনৈতিক নকশা বলে মনে করেন।

এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। ছাত্রসমাজ এগারো দফা কর্মসূচি নিয়ে রাজপথে নামে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক বিজয়ের পেছনেও ছয় দফার প্রভাব ছিল স্পষ্ট। শেষ পর্যন্ত এই আন্দোলনের ধারাই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথে নিয়ে যায়।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”

ইতিহাসবিদদের মতে, ছয় দফা আন্দোলনই ছিল স্বায়ত্তশাসনের দাবি থেকে স্বাধীনতার সংগ্রামে উত্তরণের সেতুবন্ধন।

স্মৃতির লড়াই

এ বছরের ছয় দফা দিবস নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—বাংলাদেশ তার রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাসকে কীভাবে স্মরণ করছে?

যে আন্দোলন একসময় কোটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক ছিল, তা আজ আগের তুলনায় অনেক কম আলোচিত। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় দলটির নেতাকর্মীরাও প্রকাশ্যে দিবসটি পালনের সুযোগ পাচ্ছেন না।

৭ জুনের শহীদরা কোনো একটি রাজনৈতিক দলের সম্পদ নন; তাঁরা জাতির ইতিহাসের অংশ। তাঁদের আত্মত্যাগ এবং ছয় দফা আন্দোলনের গুরুত্ব দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে স্মরণ করা উচিত।

আজও প্রাসঙ্গিক

ছয় দশক পরও ছয় দফা আন্দোলনের মূল বিষয়গুলো—প্রতিনিধিত্ব, জবাবদিহি, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার এবং রাজনৈতিক অধিকার—বাংলাদেশের জনজীবনে প্রাসঙ্গিক রয়ে গেছে।

এই আন্দোলনের গুরুত্ব শুধু তার অর্জনে নয়, তার প্রতীকি শক্তিতেও। এটি প্রমাণ করেছিল যে জনগণের সংগঠিত দাবি ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিতে পারে।

আজ যখন ঐতিহাসিক ৭ জুন অনেকটাই নীরবে পালিত হচ্ছে, তখন সেই নীরবতাই নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে ইতিহাসকে ঘিরে বিতর্ক কখনোই শুধু অতীতের নয়; তা বর্তমান ও ভবিষ্যতের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।

১৯৬৬ সালের ৭ জুনের শহীদরা দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছিলেন। তাঁদের আত্মত্যাগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্মৃতিতে কতটা জায়গা করে নেবে, সেটিই হয়তো বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে থাকবে।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles