ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে উত্তেজনা, বাড়ছে ‘পুশ-ইন’ বিতর্ক

সীমান্তে আটকে পড়া কয়েক ডজন মানুষের রহস্যজনক অন্তর্ধানের পর নতুন করে মুখোমুখি অবস্থানে বিএসএফ ও বিজিবি

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কয়েকদিন ধরে চলা উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি আপাতত প্রশমিত হয়েছে। তবে সীমান্তে আটকে পড়া কয়েক ডজন মানুষের ভাগ্য, কথিত ‘পুশ-ইন’ বা জোরপূর্বক ঠেলে পাঠানোর অভিযোগ, এবং অবৈধ অভিবাসন নিয়ে দুই দেশের অবস্থান নতুন করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে সংবেদনশীল এক প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার ও জলপাইগুড়ি জেলার চারটি সীমান্ত পয়েন্টে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর মধ্যে কয়েক ঘণ্টাব্যাপী অচলাবস্থার পর শনিবার সকালে সীমান্তে আটকে থাকা প্রায় ৪০ জন বাংলাদেশি নাগরিককে আর দেখা যায়নি। বিএসএফের দাবি, তারা বাংলাদেশে ফিরে গেছে। অন্যদিকে বিজিবি আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, তারা গত ২৪ ঘণ্টায় আটটি পৃথক ‘পুশ-ইন’ প্রচেষ্টা প্রতিহত করেছে।

কোথায় কী ঘটেছিল

সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় কোচবিহারের মেখলিগঞ্জের পানিশালা সীমান্তে, ১৩৪ নম্বর সীমান্ত পিলারের কাছে। সেখানে ১০ জনকে ‘জিরো লাইনে’ আটকে রাখা হয়েছিল বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। বিএসএফ তাদের বাংলাদেশি নাগরিক বলে দাবি করলেও বিজিবি তাদের গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। বিজিবির বক্তব্য ছিল, প্রাতিষ্ঠানিক যাচাই-বাছাই ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে গ্রহণ করা হবে না।

একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে শীতলকুচি, দিনহাটা এবং জলপাইগুড়ির সাকাতি সীমান্ত এলাকায়। সেখানে নারী ও শিশুসহ আরও প্রায় ৩০ জন সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থান করছিল বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

ভারতীয় পক্ষের দাবি, এসব ব্যক্তি অবৈধভাবে ভারতে অবস্থান করছিল এবং তাদের বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে, কোনো ব্যক্তির জাতীয়তা নিশ্চিত না করে তাকে সীমান্তে ঠেলে পাঠানো আন্তর্জাতিক নিয়ম ও বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থার পরিপন্থী।

বিজিবির অভিযোগ: একাধিক ‘পুশ-ইন’ চেষ্টা

বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা শরীফুল ইসলামের মাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, সীমান্তে সতর্কতা জোরদার, টহল বৃদ্ধি এবং তাৎক্ষণিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার কারণে গত ২৪ ঘণ্টায় আটটি পৃথক ‘পুশ-ইন’ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।

বিজিবির ভাষ্য অনুযায়ী, উত্তর ২৪ পরগনা ও নদিয়া সীমান্তসংলগ্ন যাদবপুর এলাকায় তিনজন, দক্ষিণ দিনাজপুরের কর্মুদাঙ্গা সীমান্তে ১৭ জন, আসামের ধুবড়ি সংলগ্ন বরখাতা ও পায়াশোত্তিবাড়ি এলাকায় ২১ জন এবং কোচবিহারের দিঘলতাড়ি সীমান্তে সাতজনকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা হয়েছিল।

বিজিবি এক বিবৃতিতে বলেছে, “সীমান্ত দিয়ে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।” বাহিনীটি আরও বলেছে, আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনার নীতি এবং দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সমঝোতা লঙ্ঘনের যেকোনো প্রচেষ্টা “কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে।”

ভারতের অবস্থান

নয়াদিল্লি বলছে, অবৈধভাবে ভারতে অবস্থানকারী বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে ভারতীয় আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল শুক্রবার সাপ্তাহিক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেন, “আমরা বাংলাদেশকে ২ হাজার ৮৬০ জনের বেশি ব্যক্তির জাতীয়তা যাচাই করতে অনুরোধ করেছি, যাদের আমরা বাংলাদেশি নাগরিক বলে মনে করি এবং যারা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন।”

একই ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, “ভারতে অবৈধভাবে অবস্থানকারী যে কোনো বিদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে আমাদের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাংলাদেশ থেকেও যদি কেউ অবৈধভাবে অবস্থান করে, তার ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য।”

জয়সওয়াল আরও বলেন, “নির্বাসন বা প্রত্যাবাসনের জন্য একটি দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থা বিদ্যমান। আমরা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য বাংলাদেশের কাছে পাঠাই, তারা জাতীয়তা যাচাই করার পর পরবর্তী প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়। এখনও অনেক অনুরোধ বাংলাদেশের কাছে মুলতবি রয়েছে। আমরা আশা করি, সেগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি হবে।”

বাংলাদেশের উদ্বেগ

ঢাকা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, যদি কোনো ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশি নাগরিক হন, তাহলে তাকে বিদ্যমান কূটনৈতিক ও আইনি কাঠামোর আওতায় ফেরত পাঠানো উচিত। সীমান্তে এনে ছেড়ে দেওয়া বা জোর করে প্রবেশ করানোর চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়।

সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার এবং বিজিবি একাধিকবার ‘পুশ-ইন’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। গত কয়েক সপ্তাহে সীমান্তের বিভিন্ন অংশে টহল জোরদার করা হয়েছে এবং স্থানীয় জনগণকে সতর্ক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিজিবি।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো এমন এক সময়ে ঘটছে যখন পশ্চিমবঙ্গে নতুন বিজেপি সরকার অবৈধ অভিবাসন প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সরকার ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ নীতির কথা ঘোষণা করেছে এবং শত শত সন্দেহভাজন অবৈধ অভিবাসীকে আটক করার খবর প্রকাশিত হয়েছে।

ভারতের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নাগরিকত্ব ও ভোটার তালিকা যাচাই-সংক্রান্ত কার্যক্রমও সীমান্তবর্তী এলাকায় উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ফলে বহু মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে যে তারা বহিষ্কারের মুখে পড়তে পারেন।

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য নতুন পরীক্ষা

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৪ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে, যা বিশ্বের দীর্ঘতম স্থলসীমান্তগুলোর একটি। এই সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ, চোরাচালান এবং মানবপাচার দীর্ঘদিনের সমস্যা। এসব বিষয় মোকাবিলায় দুই দেশ সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (Coordinated Border Management Plan) এবং বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা চালু করেছে।

কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি দুই দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। একদিকে ভারত অবৈধ অভিবাসন প্রশ্নে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে চাইছে, অন্যদিকে বাংলাদেশ জোর দিয়ে বলছে যে প্রত্যাবাসন অবশ্যই আন্তর্জাতিক নিয়ম, মানবিক বিবেচনা এবং বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হতে হবে।

আগামী ৮ থেকে ১১ জুন নয়াদিল্লিতে বিজিবি ও বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হওয়ার কথা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, সীমান্তে সাম্প্রতিক উত্তেজনার স্থায়ী সমাধান খুঁজতে হলে জাতীয়তা যাচাই, প্রত্যাবাসন এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সমন্বয় প্রয়োজন হবে।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles