আওয়ামী লীগ নেতা মুক্তিযোদ্ধা এ কে এম রহমতুল্লাহর জীবনাবসান

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও ঢাকায় পাঁচ বার নির্বাচিত সংসদ সদস্য রহমতুল্লাহ ৭৬ বছর বয়সে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেছেন

ঢাকা-১১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা এ কে এম রহমতুল্লাহ আর নেই। বুধবার (৪ জুন) ভোরে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বেশ কয়েক দিন ধরে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ভোরে তাঁর মৃত্যু হলে পরিবারের সদস্যরা মরদেহ হাসপাতাল থেকে বাড্ডার বেরাইদে নিজ বাসভবনে নিয়ে যান।

রহমতুল্লাহর মেয়ে মানসুরা রহমতুল্লাহ ভয়েসকে বলেন, “আজ ভোর ৪টা ৫ মিনিটে তিনি মারা যান। তাঁর মরদেহ বাড্ডার বেরাইদে আমাদের বাসভবনে আনা হয়েছে।”

অন্যদিকে তাঁর ভাগনে ফারুক আহমেদ জানান, জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে।

তিনি বলেন, “আজ বেলা সাড়ে তিনটায় বেরাইদ মাঠে জানাজার পর বেরাইদ কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে।”

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অবসান

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এ কে এম রহমতুল্লাহ ছিলেন পরিচিত ও প্রভাবশালী এক নাম। আমৃত্যু তিনি আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। একই সঙ্গে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

রাজনৈতিক জীবনে তিনি মোট পাঁচবার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তাঁর উত্থান ঘটে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের সময়। ১৯৮৬ সালে তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সম্মিলিত বিরোধী জোটের প্রার্থী হিসেবে তৎকালীন ঢাকা-৫ আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

এরপর ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই আসন থেকে পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে আসার পর তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের একজন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে ঢাকা-১০ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১১ আসন থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হন। সর্বশেষ ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করেন।

ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা

জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রমেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল রহমতুল্লাহর। তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন এবং দীর্ঘদিন রাজধানীর উত্তরাঞ্চলে দলের অন্যতম প্রভাবশালী সংগঠক হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

দলের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল উল্লেখযোগ্য। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মসূচি, সম্মেলন ও সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী এক নেতা

এ কে এম রহমতুল্লাহ ছিলেন বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে তিনি রাজনীতির মাধ্যমে দেশ গঠনের কাজে যুক্ত হন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ এবং স্বাধীনতার চেতনা নিয়ে তিনি নিয়মিত বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করতেন।

রাজনৈতিক সহযোদ্ধারা তাঁকে একজন অভিজ্ঞ, সংগঠকসুলভ এবং দলীয় আদর্শে অবিচল নেতা হিসেবে মূল্যায়ন করেন।

শোকের ছায়া

রহমতুল্লাহর মৃত্যুতে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, মুক্তিযুদ্ধে অবদান এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের স্মৃতিচারণ করছেন অনেকেই।

তাঁর মৃত্যুতে আওয়ামী লীগ একজন প্রবীণ নেতা ও অভিজ্ঞ সংগঠককে হারাল বলে দলীয় নেতারা মনে করছেন।

ব্যক্তিগত জীবনে এ কে এম রহমতুল্লাহ তিন মেয়ে ও দুই ছেলের জনক। পরিবার, রাজনৈতিক সহকর্মী এবং অসংখ্য শুভানুধ্যায়ীকে শোকসাগরে ভাসিয়ে তিনি চিরবিদায় নিলেন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রায় চার দশকের বেশি সময় সক্রিয় থাকা এই রাজনীতিকের মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটল।

spot_img