ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা প্রতি তিন টাকার এক টাকাই এখন খেলাপি ঋণ। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে খেলাপি ঋণ আরও ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা বেড়েছে। ফলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এখন প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেশের ব্যাংকিং খাতের এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। একই সঙ্গে বেড়েছে মূলধন ঘাটতি, প্রভিশন ঘাটতি এবং ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের পরিমাণ। সব মিলিয়ে ব্যাংকিং খাতের অবস্থা এখন নড়বড়ে। ব্যাংকগুলোর স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ সক্ষমতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ মোট ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ এখন খেলাপি।
গত ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। তখন খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
ব্যাংকগুলো বছরের পর বছর ঋণ পুনঃতফসিল, কিস্তি পুনর্নির্ধারণ এবং বিভিন্ন ধরনের বিশেষ সুবিধা দিয়েছে। কিন্তু তাতেও খেলাপি ঋণ কমেনি। বরং বেড়েই চলেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়ন ও উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (আইআইএফডি) নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তাফা কে. মুজেরী মনে করেন, দেশে ঋণখেলাপি হওয়া এখন এক ধরনের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, “দেশে ঋণখেলাপি হওয়া এখন এক ধরনের ক্ষতিকর সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। দেশের কিছু বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বছরের পর বছর সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নানা সুবিধা পেলেও ঋণ শোধ করছে না।”
মুজেরীর ভাষায়, “এই গোষ্ঠীগুলো সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের নীতিগত সুবিধা পেয়েছে। কিন্তু তারপরও তারা ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছে।”
সবচেয়ে বেশি সংকটে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ এখন প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। তাদের মোট ঋণের ৪৫ দশমিক ৮৫ শতাংশই খেলাপি।
সহজ ভাষায় বললে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো যে প্রতি দুই টাকা ঋণ দিয়েছে, তার প্রায় এক টাকা আর সময়মতো ফেরত আসছে না।
বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। তাদের মোট ঋণের ৩০ দশমিক ১১ শতাংশ খেলাপি।
রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার ৪০ দশমিক ৭২ শতাংশ। অন্যদিকে বিদেশি ব্যাংকগুলো এখনো তুলনামূলক ভালো অবস্থায় রয়েছে।
বিশ্বের অনেক দেশে খেলাপি ঋণের হার ৩ শতাংশ পার হলেই সতর্ক সংকেত ধরা হয়। সেখানে বাংলাদেশে এই হার এখন ৩২ শতাংশেরও বেশি। অর্থাৎ আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য সীমার তুলনায় ১০ গুণেরও বেশি।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি হিসাবেও পুরো সমস্যার চিত্র দেখা যাচ্ছে না। অনেক ঋণ আদালতের স্থগিতাদেশ, বিশেষ সুবিধা বা পুনর্গঠনের কারণে এখনো খেলাপি হিসেবে দেখানো হচ্ছে না। এছাড়া প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকার অবলোপনকৃত ঋণ সরকারি হিসাবের বাইরে রয়েছে।
ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টদের ধারণা, আরও ২ লাখ থেকে আড়াই লাখ কোটি টাকার ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ এখনো খেলাপি তালিকার বাইরে আছে। সেগুলো যোগ করলে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও অনেক বেশি হবে।
খেলাপি ঋণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকগুলোর আরেকটি সমস্যা বেড়েছে। সেটি হলো প্রভিশন ঘাটতি। প্রভিশন হলো ভবিষ্যতে ঋণ আদায় না হলে ক্ষতি সামাল দেওয়ার জন্য আলাদা করে রাখা অর্থ।
মার্চ শেষে ব্যাংকগুলোর ৪ লাখ ৬১ হাজার ৭১৪ কোটি টাকা প্রভিশন রাখার কথা ছিল। কিন্তু তারা রাখতে পেরেছে মাত্র ২ লাখ ৫৬ হাজার ৪৯ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা। মাত্র তিন মাসে এই ঘাটতি বেড়েছে ১৪ হাজার ২২৪ কোটি টাকা।
আরও একটি উদ্বেগের বিষয় হলো এসএমএ বা স্পেশাল মেনশন অ্যাকাউন্ট ঋণ। এসএমএ বলতে এমন ঋণকে বোঝায়, যা এখনো খেলাপি হয়নি, কিন্তু খেলাপি হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
মার্চ শেষে এ ধরনের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩২ হাজার ১২০ কোটি টাকা। ডিসেম্বর শেষে ছিল ১ লাখ ৩ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ বেড়েছে ২৮ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা। এতে আশঙ্কা করা হচ্ছে, আগামী মাসগুলোতে আরও অনেক ঋণ খেলাপি তালিকায় যোগ হবে।
ব্যাংক খাতের মূলধন সংকট নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। গত ১৬ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে আটলান্টিক কাউন্সিলের এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাত এবং বেসরকারি খাতের মূলধন ঘাটতি পূরণ করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি বলেন, “প্রথম কাজ হওয়া উচিত বেসরকারি খাতের মূলধন ঘাটতি পূরণ করা এবং ব্যাংকিং খাতে মূলধন পুনর্গঠন করা। এটি না করলে অন্য কোনো সংস্কার কার্যকর হবে না। অনেক ব্যাংক কার্যত দেউলিয়া অবস্থায় রয়েছে।”
বিশ্বব্যাংকও সতর্ক করেছে যে, দীর্ঘদিনের দুর্বল সুশাসন, রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়মিত ঋণ বিতরণ এবং উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। এতে ব্যাংকগুলো নতুন বিনিয়োগে ঋণ দিতে নিরুৎসাহিত হবে। ব্যবসা সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হবে। অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সবশেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে—দেশের ব্যাংকগুলো যে প্রতি তিন টাকা ঋণ দিয়েছে, তার এক টাকাই এখন খেলাপি। আর সামনে যে বিপুল পরিমাণ ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ রয়েছে, তা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এই সংকট এখনো শেষ হয়ে যায়নি।

