সাবেক এমপি মুজিব কারাগারে, জুলাই মামলাগুলো নিয়ে বিতর্ক তীব্র

২০২৪ এর ১৯ জুলাই উত্তরায় গোলাগুলিতে একজন নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে জেলে পাঠানোর নির্দেশ

সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা প্রকৌশলী শেখ মুজিবুর রহমানকে আটকের একদিন পর তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় ঢাকার উত্তরা এলাকায় সংঘটিত একটি হত্যা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। জুলাই-আগস্টের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া শত শত মামলার গ্রহণযোগ্যতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে চলমান বিতর্কের মধ্যে আরেকজন রাজনৈতিক নেতাকে জেলে নেওয়া হলো।

বুধবার ঢাকার অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম জাকির হোসেন এ আদেশ দেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এই সিদ্ধান্ত দেন।

এর আগে মঙ্গলবার গভীর রাতে উত্তরা পশ্চিম থানার সেক্টর-১১ এলাকার একটি বাসা থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁকে আদালতে হাজির করা হলে তদন্ত কর্মকর্তা শাহীন মাহমুদ জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন উল্লেখ করে আবেদন করেন।

প্রসিকিউশন বিভাগের উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. শামীম আদালতের আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হলেন প্রকৌশলী শেখ মুজিবুর রহমান। মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই দেশজুড়ে চলমান সহিংস আন্দোলনের অংশ হিসেবে উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টরে বিক্ষোভের সময় আসাদুল্লাহ নামে এক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হন।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গুলির ঘটনার পর আসাদুল্লাহর স্ত্রী তুরাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরে ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে তাঁর মরদেহ শনাক্ত করে পরিবার। এরপর ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়।

আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে মামলার ধারাবাহিকতা

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের প্রায় সকল নেতা, সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা ও গ্রেপ্তারের মাঝে শেখ মুজিবুর রহমানকে কারাগারে পাঠানো হলো।

২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলার বড় অংশই জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় নিহত ও আহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে।

বর্তমান সরকার ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) আইন’ প্রণয়ন করেছে। এই আইনের মাধ্যমে জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের হত্যা, সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও ধ্বংসযজ্ঞসহ বিভিন্ন ঘটনার দায় থেকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি সাংবাদিক, শিক্ষক, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং ধর্মনিরপেক্ষ মতাদর্শে বিশ্বাসী বহু ব্যক্তিকে শত শত মামলার আসামি করা হয়েছে।

মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট পারভেজ হাসেম এ বিষয়ে ভয়েসকে বলেন, “সহিংসতার ঘটনায় দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা অবশ্যই প্রয়োজন। তবে বিপুলসংখ্যক মামলা এবং সেগুলোর অনেকগুলোর প্রকৃতি ও প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন আছে। আমরা লক্ষ্য করছি, অধিকাংশ ক্ষেত্রে যথাযথ প্রমাণ, আইনি মানদণ্ড ও ন্যায়বিচারের নীতিমালা অনুসরণ করা হচ্ছে না।”

উদাহরণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, “সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হককে ৮টি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এসব মামলার মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে দায়েরকৃত বেশ কয়েকটি মার্ডার কেস রয়েছে। অতিবৃদ্ধ একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আন্দোলনের সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে মার্ডার করে বেরিয়েছেন—এমন কথা পাগলেও বলতে পারবে না। অথচ তাকে বিভিন্ন জায়গার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তার ৭টি মামলায় জামিন হওয়ার পর সম্প্রতি তাকে নতুন করে ৮ নম্বর মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়েছে। হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছে, জামিনের পর তাকে এভাবে হাস্যকর মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো যাবে না। কিন্তু উচ্চ আদালতের আদেশও উপেক্ষা করা হয়েছে।”

মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী প্রশাসনের সময় শুরু হওয়া এই দমন-পীড়ন বর্তমান বিএনপি সরকারের সময়েও অব্যাহত রয়েছে বলে আওয়ামী লীগ নেতারা অভিযোগ করে আসছেন।

মানবাধিকারকর্মী ও আইন বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগে হওয়া তদন্তগুলো অবশ্যই নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া উচিত। অভিযুক্ত ব্যক্তি যে রাজনৈতিক দলেরই হোন না কেন, বিচার প্রক্রিয়ায় সমতা নিশ্চিত করা জরুরি।

জুলাই-সংক্রান্ত মামলার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রশ্ন

গত মাসে আওয়ামী লীগ জুলাই ২০২৪-এর ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া বিভিন্ন মামলার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।

এক বিবৃতিতে দলটি দাবি করে, তদন্তে অনেক অভিযোগের ভিত্তি দুর্বল বলে প্রতীয়মান হয়েছে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে এসব মামলা ব্যক্তিগত প্রতিশোধ, আর্থিক সুবিধা আদায় কিংবা রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

বিবৃতিতে আওয়ামী লীগ বলেছে, “যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হওয়ার কথা ছিল, তা অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত প্রতিশোধ, আর্থিক লাভ এবং রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।”

দলটির দাবি, চলমান তদন্তে পাওয়া তথ্য অনেক মামলার সত্যতা নিয়েই প্রশ্ন তৈরি করেছে।

তদন্ত প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান কী বলছে

আওয়ামী লীগ তাদের বক্তব্যের পক্ষে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কিছু তথ্য তুলে ধরেছে।

দলটির দাবি, গত ২২ এপ্রিল পর্যন্ত জুলাই ২০২৪-এর ঘটনাসংক্রান্ত ১৯৫টি মামলার তদন্তভার পিবিআইয়ের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছিল।

এসব মামলার তদন্তে ২৪টিতে কোনো ধরনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া আরও ২০টি মামলা বাদীরা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন, যেগুলোর বেশিরভাগই ভিত্তিহীন ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

একই ঘটনার পুনরাবৃত্তির কারণে আরও সাতটি মামলা প্রত্যাহার করা হয়। অন্য একটি মামলায় বাদী আদালতে উপস্থিত না হওয়ায় সেটিও কার্যত অগ্রসর হয়নি।

আওয়ামী লীগের দাবি, সব মিলিয়ে পিবিআই ৫২টি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, যেগুলোতে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি অথবা মামলাগুলোকে অন্য কারণে অকার্যকর বলে বিবেচনা করা হয়েছে।

এই পরিসংখ্যান সামনে আসার পর জুলাই-আগস্টের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর একটি অংশ আদৌ গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে হয়েছে কি না, নাকি রাজনৈতিক আবহে প্রভাবিত হয়ে দায়ের করা হয়েছে—সে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।

spot_img