গুজব থেকে গণপিটুনি: ‘মবের মুল্লুক’ এখনো ভয়াল!

শুক্রবার সিলেটে মিথ্যা অভিযোগে হিন্দু ব্যবসায়ীকে গণপিটুনি, শনিবার মানিকগঞ্জে জনতার হাতে যুবক নিহত— ‍শুধু মে মাসেই ৬৯টি মব সহিংসতায় নিহত ৩২, গুরুতর আহত ৭১ জন।

গত শুক্রবার (২৯ মে) সন্ধ্যায় সিলেট নগরীর শিবগঞ্জ সেনপাড়ায় নিজ মুদি দোকানে ব্যস্ত সময় পার করছিলেন ব্যবসায়ী খগেন্দ্র চন্দ্র দাস। সে সময় এমন একটি অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে, যা কোনো তদন্ত শুরু হওয়ার আগেই জনরোষে রূপ নেয়।

এক আট বছর বয়সী শিশু কোমল পানীয় কিনে চলে যায়। কিছুক্ষণ পরে তার মা দোকানে এসে জিনিসপত্র দিতে দেরি করানোর অভিযোগ করেন। তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে তিনি অভিযোগ করেন, দোকানদার খগেন্দ্র চন্দ্র দাস শিশুটিকে যৌন-হয়রানি করেছেন।

অভিযোগ ছড়াতেই মুহূর্তের মধ্যে দোকানের সামনে লোকজন জড়ো হতে শুরু করে। একপর্যায়ে উত্তেজিত জনতা খগেন্দ্রকে গণপিটুনি দেয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মুমুর্ষু খগেন্দ্রকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে।

ঘটনার পর খগেন্দ্রের ছেলে ১৩ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও কয়েকজন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা করেন। পুলিশ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে।

কিন্তু অভিযোগটি তদন্তের প্রাথমিক ধাপই টিকতে পারেনি। পুলিশ দোকানের সিসিটিভি ফুটেজ এবং অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে জানায়, অভিযোগ অনুযায়ী কোনো ধরনের শ্লীলতাহানি বা যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেনি।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার মোহাম্মদ মনজুরুল আলম সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, “সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে আমরা নিশ্চিত হয়েছি, অভিযোগে যে শ্লীলতাহানির কথা বলা হয়েছে, তেমন কোনো ঘটনা ঘটেনি।”

তিনি আরও বলেন, এটি ছিল গুজব ও সন্দেহের ভিত্তিতে সংঘটিত একটি স্পষ্ট ‘মব জাস্টিস’-এর ঘটনা।

সিলেটের এই ঘটনার ২৪ ঘণ্টাও পার হয়নি, এরই মধ্যে মানিকগঞ্জে আরেক ঘটনায় জনতা নিজেরাই বিচার করে একজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে।

৩০ মে দিবাগত রাত। মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার উত্তর পুটাইল গ্রামে অবস্থান করছিলেন ২৯ বছর বয়সী মো. সজিব মিয়া। পুলিশ জানায়, রাত ৩টার দিকে শতাধিক মানুষ বাড়িটি ঘিরে ফেলে। তারা হিংস্র উল্লাসে সজিবকে টেনে বের করে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে।

স্থানীয় কিছু মানুষ সজিবের বিরুদ্ধে ডাকাতি, মাদক ব্যবসা এবং অন্যান্য অপরাধের অভিযোগ তুলেছিল। কিন্তু এসব অভিযোগের কোনোটি আদালতে যাচাই হওয়ার সুযোগ পায়নি।

মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল মাসুম ঘটনাটিকে “মব মার্ডার” বা জনতার হাতে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

দুই ঘটনার পটভূমি আলাদা হলেও একটি বিষয়ে মিল স্পষ্ট—বাংলাদেশে অভিযোগ, গুজব বা সন্দেহ এখন ক্রমেই তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার আগেই শাস্তির কারণ হয়ে উঠছে। এজন্য ভয়াল রূপে এক ‘মবের মুল্লুক’!

বাড়ছে মব সহিংসতা

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)-এর তথ্য অনুযায়ী, শুধু মে মাসেই দেশে মব সহিংসতার ৬৯টি ঘটনায় অন্তত ৩২ জন নিহত এবং ৭১ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।

এটি গত ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রাণহানির ঘটনা। এর আগের মাস এপ্রিল মাসে এ ধরনের ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন ২১ জন এবং আহত হয়েছিলেন ৪৯ জন।

গত ৩১ মে প্রকাশিত মাসিক মানবাধিকার প্রতিবেদনে এমএসএফ বলেছে, “মব সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা এপ্রিলের ২১ জন থেকে মে মাসে ৩২ জনে উন্নীত হয়েছে, যা মানুষের মধ্যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।”

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চুরি, ডাকাতি, পারিবারিক বিরোধ, ধর্ষণচেষ্টা, চাঁদাবাজি এবং জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধসহ নানা অভিযোগকে কেন্দ্র করে এসব হামলা হয়েছে।

শুধু চুরির অভিযোগেই মে মাসে ১৪ জন নিহত হয়েছেন। অন্যরা নিহত হয়েছেন ব্যক্তিগত বিরোধ বা বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগের জেরে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগেই জনতা শাস্তি কার্যকর করেছে।

এমএসএফ-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, মব সহিংসতার এই বৃদ্ধি জননিরাপত্তার জন্য “গুরুতর উদ্বেগের বিষয়”।

একই প্রতিবেদনে মে মাসে ৫৩টি অজ্ঞাতপরিচয় লাশ উদ্ধার, কারাগারে সাতজনের মৃত্যু, সীমান্তে প্রাণহানি বৃদ্ধি এবং নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে ৩২৬টি সহিংসতার ঘটনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এই সংকট হঠাৎ তৈরি হয়নি।

এমএসএফ-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ৪২৮টি গণপিটুনির ঘটনায় ১৬৬ জন নিহত হন। একই বছরে ৬৪১টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

অন্যদিকে, মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছিল, ২০২৫ সালের জুন থেকে আগস্ট—মাত্র তিন মাসে মব হামলায় অন্তত ১২৪ জন নিহত হন।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিস্থিতির অবনতি

বাংলাদেশে গণপিটুনি বা জনতার হাতে বিচার নতুন নয়। তবে মানবাধিকারকর্মী, গবেষক ও সংবাদমাধ্যমগুলোর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এ ধরনের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

২০২৫ সালের মার্চ মাসে প্রথম আলো এক প্রতিবেদনে জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনা দৃশ্যমানভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ‘উদ্বেগজনক মাত্রায়’ মব সহিংসতা বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে। একই সময়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সতর্ক করে বলেছিল, মব হামলা, বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার এবং রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জীবনে ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের অবসান ঘটে এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। কিন্তু এরপরও মব সহিংসতা কমার কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায়নি।

বরং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায় এখন বর্তমান সরকারের ওপরই বর্তায়।

সংখ্যালঘুদের উদ্বেগ আরও বাড়ছে

সিলেটের ঘটনায় পুলিশ এটিকে ধর্মীয় উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হামলা হিসেবে চিহ্নিত করেনি। তবে একজন হিন্দু ব্যবসায়ীকে এমন একটি অভিযোগের ভিত্তিতে গণপিটুনির শিকার হতে হয়েছে, যা পরে সিসিটিভি ফুটেজে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। ফলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।

হাসপাতালের শয্যা থেকে খগেন্দ্র চন্দ্র দাস স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, তিনি অভিযোগকারী পরিবারকে সত্যতা যাচায়ের জন্য সিসিটিভি ফুটেজ দেখে নেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন।

“হঠাৎ কয়েকজন যুবক এসে আমাকে মারধর শুরু করে,” বলেন তিনি।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, হামলাকারীদের একজন এর আগেও তার কাছে টাকা দাবি করেছিলেন এবং হামলার সময় দোকান থেকে নগদ অর্থ ও পণ্যসামগ্রীও লুটে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ এখনও তদন্তাধীন।

২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার প্রেক্ষাপটে দেওয়া এক বিবৃতিতে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক গবেষণা পরিচালক বাবু রাম পান্ত বলেছিলেন, “দ্রুত, নিরপেক্ষ, স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।”

প্রায় দুই বছর পর সিলেটের ঘটনাটি দেখিয়ে দিচ্ছে, সেই আহ্বান এখনও কতটা প্রাসঙ্গিক।

আশ্বাস আছে, সহিংসতা কমছে না

মব সহিংসতা রোধে সরকারের পক্ষ থেকে একাধিকবার কঠোর অবস্থানের কথা বলা হয়েছে।

গত ১০ মে ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ অডিটোরিয়ামে পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬ অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রয়োজন হলে বিদ্যমান আইন সংশোধন কিংবা নতুন আইন প্রণয়ন করে মব সহিংসতা দমনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিচার বিভাগও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

গত ২ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট সরকারের কাছে জানতে চায়, মব কিলিং ও গণপিটুনি প্রতিরোধে ব্যর্থতা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না।

একই সঙ্গে আদালত রংপুরে ২০২৫ সালের আগস্টে ভ্যান চুরির অভিযোগে গণপিটুনিতে নিহত রূপলাল দাস ও তার জামাতা প্রদীপ দাসের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়েও ব্যাখ্যা চেয়েছে।

অভিযোগই যখন শাস্তি

মব সহিংসতার পক্ষে যারা যুক্তি দেন, তারা প্রায়ই বলেন যে বিচারব্যবস্থা ধীর এবং অকার্যকর। কিন্তু সিলেট ও মানিকগঞ্জের সাম্প্রতিক দুটি ঘটনা দেখিয়েছে, বিচারব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে জনতার বিচার কতটা ভয়াবহ হতে পারে।

সিলেটে একজন মানুষকে প্রায় মেরে ফেলা হয়েছিল, অথচ তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে খুব বেশি সময় লাগেনি।

মানিকগঞ্জে একজন মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, অথচ তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো আদালতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগই পায়নি।

খগেন্দ্র চন্দ্র দাসের ক্ষেত্রে ঘটেছে শারীরিক নিগ্রহ, হাসপাতালে চিকিৎসা এবং একটি মিথ্যা অভিযোগে জীবন হারানোর আশঙ্কা। অন্যদিকে সজিব মিয়ার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সত্য না মিথ্যা, তা আর কখনও বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারণ করা সম্ভব হবে না।

দুই ক্ষেত্রেই শুধুমাত্র অভিযোগই দন্ডে পরিণত হয়েছে, আর সেই শাস্তি ছিল অপূরণীয়।

মে মাসের পরিসংখ্যান বলছে, এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং এমন একটি প্রবণতার প্রতিফলন, যেখানে ক্রমবর্ধমানভাবে মানুষ আইন ও বিচারব্যবস্থার বাইরে গিয়ে নিজেরাই তদন্তকারী, বিচারক এবং শাস্তি কার্যকরকারী হয়ে উঠছে।

এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে তা শুধু আইনশৃঙ্খলার জন্য নয়, রাষ্ট্রে আইনের শাসনের ভিত্তির জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles