বাংলাদেশের রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান হলো। উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক, মহান মুক্তিযুদ্ধের অগ্রসৈনিক, আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ আর নেই। সোমবার বিকেল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।
পরিবারের একাধিক সদস্য এবং ঘনিষ্ঠজন তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন। তোফায়েল আহমেদের জামাতা ডা. তৌহিদুজ্জামান তুহিন জানান, দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাধীন থাকার পর সোমবার বিকেলে হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।
স্কয়ার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, নিউমোনিয়াজনিত শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ এবং বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতা নিয়ে তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর দীর্ঘ সময় নিবিড় চিকিৎসার মধ্যে ছিলেন তিনি।
তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বাধীনতা-পূর্ব আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন, সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পর্বগুলোতে তিনি ছিলেন সক্রিয় ও প্রভাবশালী এক ব্যক্তিত্ব।
ভোলার গ্রাম থেকে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষে
১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তোফায়েল আহমেদ। তাঁর বাবা ছিলেন আজহার আলী এবং মা ফাতেমা খানম।
ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাস করার পর তিনি বরিশালের ব্রজমোহন কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে আইএসসি ও বিএসসি সম্পন্ন করে উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।
ছাত্রজীবনেই রাজনীতিতে তাঁর উত্থান শুরু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতৃত্বে আসেন। ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-এর সহসভাপতি (ভিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা
বাংলাদেশের ইতিহাসে উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান একটি মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা। সে সময় চারটি ছাত্রসংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা ছিলেন তোফায়েল আহমেদ।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা কর্মসূচিকে ভিত্তি করে ছাত্রসমাজ যে ১১ দফা কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল, তার বাস্তবায়ন আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ছিলেন তিনি। পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ঐতিহাসিক সমাবেশে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন তোফায়েল আহমেদ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি একটি স্মরণীয় ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।
পরে এক সাক্ষাৎকারে সে সময়ের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেছিলেন, “ছয় দফাই ছিল আমাদের মুক্তির সনদ। বঙ্গবন্ধু আমাদের বলেছিলেন, এই পথ ধরেই একদিন স্বাধীনতার কাছে পৌঁছানো যাবে।”
মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
১৯৭০ সালের নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তোফায়েল আহমেদ। পরের বছর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত মুজিব বাহিনীর চারজন আঞ্চলিক প্রধানের একজন ছিলেন তিনি। বরিশাল, পটুয়াখালী, খুলনা, ফরিদপুর, যশোর, কুষ্টিয়া ও পাবনা অঞ্চলের দায়িত্ব তাঁর ওপর ন্যস্ত ছিল।
মুজিবনগর সরকার গঠনের ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পরিচালনা এবং সংবিধান প্রণয়ন প্রক্রিয়ায়ও সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।
বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব হিসেবে নিয়োগ দেন। প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদাসম্পন্ন এই পদে তিনি ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
পরে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থা চালু হলে বঙ্গবন্ধুর বিশেষ সহকারী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। একই সময়ে জাতীয় যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
১৫ আগস্টের পর কারাবরণ
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা আমূল বদলে যায়। সে সময় তোফায়েল আহমেদকে গৃহবন্দি করা হয়। পরে তাঁকে গ্রেপ্তার করে বিভিন্ন কারাগারে রাখা হয়।
তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে তিনি নির্যাতনের শিকার হন এবং প্রায় ৩৩ মাস কারাবন্দি ছিলেন।
কারাগারে থাকাকালেই ১৯৭৮ সালে তিনি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে সামরিক শাসনবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন
তোফায়েল আহমেদ ছিলেন বাংলাদেশের সবচেয়ে অভিজ্ঞ সংসদ সদস্যদের একজন। ১৯৭০ সালের পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ নির্বাচনসহ মোট নয়বার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে তিনি বিজয়ী হন।
তিনি শিল্পমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রীসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯২ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন এবং দীর্ঘ ১৮ বছর সে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১০ সালে দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ওই দায়িত্বেই ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে সোচ্চার
রাজনৈতিক জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তোফায়েল আহমেদ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও বঙ্গবন্ধুর উত্তরাধিকার রক্ষার প্রশ্নে সক্রিয় ছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার, ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল এবং একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার দাবিতে তিনি প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছিলেন।
সমর্থকরা তাঁকে স্বাধীনতা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের ধারাবাহিকতার একজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হিসেবে মনে করেন। রাজনৈতিক মতভেদ থাকা সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা, বক্তৃতাশৈলী এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ব্যাপকভাবে স্বীকৃত ছিল।
এক যুগের অবসান
তোফায়েল আহমেদের মৃত্যু শুধু একজন প্রবীণ রাজনীতিকের প্রস্থান নয়; এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, গণঅভ্যুত্থান এবং রাষ্ট্রগঠনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি প্রজন্মের আরেকটি অধ্যায়ের সমাপ্তি।
ছাত্রনেতা থেকে জাতীয় নেতা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক থেকে মন্ত্রী—বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পর্বের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে আছে। তাঁর মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে শূন্যতা সৃষ্টি হলো, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।

