নির্বাচনের পর বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা বেড়েছে

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও খ্রিস্টান সংগঠনগুলোর দাবি, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর হিন্দু, খ্রিস্টান ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে হামলা ও নিপীড়নের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাংলাদেশে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের পর ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, নির্যাতন এবং বৈষম্যের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খ্রিস্টান অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন ওপেন ডোরস ইউকে অ্যান্ড আয়ারল্যান্ড, ব্রিটিশ খ্রিস্টান সংবাদমাধ্যম ক্রিশ্চিয়ান টুডে এবং মানবাধিকার সংগঠন জাস্টিস মেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্স (জেএমবিএফ) এ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

আন্তর্জাতিক এসব সংগঠনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর থেকেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় হিন্দু, খ্রিস্টান এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে হামলার ঘটনা বাড়তে শুরু করে। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর সেই পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে।

ক্রিশ্চিয়ান টুডের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশেষ করে ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণকারী ব্যক্তিরা বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। তাদের অনেকেই সামাজিক বয়কট, হুমকি এবং শারীরিক হামলার শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জয়লাভ করলেও জামায়াতে ইসলামী প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভোট পেতে সক্ষম হয়েছে। সংখ্যালঘু নেতাদের অভিযোগ, যেসব এলাকায় জামায়াতের রাজনৈতিক প্রভাব বেশি, সেসব এলাকায় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনাও তুলনামূলক বেশি ঘটছে।

সম্প্রতি ঢাকার সেন্ট ইউজিন দে মাজেনোদ চার্চে কর্মরত এক ক্যাথলিক যাজক হামলার শিকার হন। দুর্বৃত্তরা তার পাসপোর্ট এবং প্রায় এক হাজার পাউন্ড সমমূল্যের অর্থ ছিনিয়ে নেয় এবং তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে। খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের নেতারা এই ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন নয়, বরং বৃহত্তর নিরাপত্তাহীনতার অংশ হিসেবে দেখছেন।

তাদের দাবি, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর থেকে অন্তত ৫০টিরও বেশি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে রয়েছে ভয়ভীতি প্রদর্শন, হামলা, সম্পত্তি দখলের চেষ্টা এবং ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে হয়রানি।

সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে মার্চ মাসে ঢাকায় হিন্দু ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের নেতারা বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। তারা সরকারের কাছে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান।

এদিকে ফ্রান্সভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন জাস্টিস মেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্স (জেএমবিএফ) আরও বিস্তৃত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সংগঠনটি হিউম্যান রাইটস কংগ্রেস ফর বাংলাদেশ মাইনরিটিজ (এইচআরসিবিএম)-এর তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র চার মাসে দেশের আটটি বিভাগের ৬২টি জেলায় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে মোট ৫০৫টি ঘটনার তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছে।

সংগঠনটির দাবি, এসব ঘটনার মধ্যে রয়েছে হত্যা, রহস্যজনক মৃত্যু, শারীরিক নির্যাতন, অপহরণ, যৌন সহিংসতা, ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, জমি দখল, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে নিপীড়ন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৪৩টি জেলায় মন্দির, প্রতিমা এবং অন্যান্য ধর্মীয় স্থাপনায় হামলা ও ভাঙচুরের ৯৫টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। জেএমবিএফের মতে, এসব ঘটনা শুধু সম্পত্তির ক্ষতি নয়; বরং ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপর সরাসরি আঘাত।

এছাড়া ২৩টি জেলায় ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণসহ মোট ২৮টি যৌন সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। সংগঠনটি বলেছে, সংখ্যালঘু নারীদের বিরুদ্ধে এ ধরনের সহিংসতা প্রায়ই আতঙ্ক সৃষ্টি এবং পুরো সম্প্রদায়কে ভীত করার কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ছয়টি জেলায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে অন্তত ছয়টি ঘটনা ঘটেছে। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করে সংখ্যালঘুদের ভয় দেখানো এবং সামাজিকভাবে কোণঠাসা করার প্রবণতা এখনও উদ্বেগজনকভাবে বিদ্যমান।

জেএমবিএফের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি শাহানুর ইসলাম এক বিবৃতিতে বলেন, “এসব ব্যাপক ও সমন্বিত লঙ্ঘন বাংলাদেশে অসহিষ্ণুতা, বৈষম্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার একটি বিপজ্জনক চিত্র তুলে ধরছে। এটি মানবাধিকার, সমতা, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং আইনের শাসনের মৌলিক নীতিগুলোর জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “পরিস্থিতি দিন দিন অবনতি হচ্ছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার সহিংসতা প্রতিরোধ এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে।”

জেএমবিএফ বাংলাদেশ সরকারের প্রতি অবিলম্বে একটি স্বাধীন বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠনের আহ্বান জানিয়েছে। সংগঠনটির মতে, সকল অভিযোগের নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে এবং রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও পরিবারগুলোর জন্য জরুরি সুরক্ষা, ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণেরও আহ্বান জানানো হয়েছে।

সংগঠনটি আরও দাবি করেছে, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার জন্য একটি ‘সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন’ প্রণয়ন এবং একটি স্বাধীন ‘সংখ্যালঘু কমিশন’ গঠন করা প্রয়োজন। তাদের মতে, এমন একটি প্রতিষ্ঠান সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অধিকার, মর্যাদা এবং আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ও ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক পর্যবেক্ষক সংস্থার ধারাবাহিক প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা দেশটির মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না এলেও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় দেশের সামাজিক সম্প্রীতি ও ধর্মীয় সহাবস্থানের ঐতিহ্য আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles