বগুড়ার একটি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে (টিটিসি) নারী প্রশিক্ষণার্থীদের যৌন হয়রানির অভিযোগে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এক নেতাকে প্রকাশ্যে জুতাপেটা করার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তাকে দলের সব দায়িত্ব ও কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশও জারি করেছে দলটি।
অব্যাহতি পাওয়া ওই নেতার নাম আলী আজম সাব্বির। তিনি এনসিপির বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলা সমন্বয় টিমের সদস্য ছিলেন। পাশাপাশি তিনি বগুড়া কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ কোর্সের একজন শিক্ষার্থী।
ঘটনাটি ঘটেছিল গত ২৪ মে। তবে প্রায় এক সপ্তাহ পর শুক্রবার ২ মিনিট ১০ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এনসিপির বগুড়া জেলা শাখা আলী আজম সাব্বিরের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়।
শুক্রবার রাতে এনসিপি বগুড়া জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক শওকত ইমরানের স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে জানানো হয়, অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সাব্বিরকে সংগঠনের সব দায়িত্ব ও কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
ভিডিওতে যা দেখা গেছে
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, আলী আজম সাব্বিরকে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়েছে। কক্ষটিতে আরও কয়েকজন ছাত্র ও ছাত্রী উপস্থিত ছিলেন। এক পর্যায়ে একজন নারী হাতে জুতা নিয়ে সাব্বিরকে বারবার আঘাত করেন।
ভিডিওতে সাব্বিরকে উপস্থিত সবার সামনে নিজের আচরণের জন্য ক্ষমা চাইতেও দেখা যায়। তিনি স্বীকার করেন যে, তিনি বিভিন্ন সময়ে টিটিসির নারী প্রশিক্ষণার্থী এবং একজন নারী প্রশিক্ষককে মোবাইল ফোনে অনাকাঙ্ক্ষিত ও আপত্তিকর বার্তা পাঠিয়েছেন। ভবিষ্যতে এমন কাজ আর করবেন না বলেও তিনি অঙ্গীকার করেন।
প্রশিক্ষণ কেন্দ্র সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ঘটনার পর তিনি লিখিতভাবে একটি অঙ্গীকারনামাও জমা দেন।
নারী প্রশিক্ষণার্থীদের অভিযোগ
টিটিসির কয়েকজন নারী প্রশিক্ষণার্থী জানান, আলী আজম সাব্বির দীর্ঘদিন ধরে নারী শিক্ষার্থীদের বিরক্ত করে আসছিলেন। তাদের অভিযোগ, তিনি মোবাইল ফোনে অশালীন কথা বলতেন এবং বিভিন্ন সময় আপত্তিকর বার্তা পাঠাতেন।
একাধিক নারী প্রশিক্ষণার্থী দাবি করেন, তার আচরণের কারণে অনেকেই বিব্রত ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ জমতে থাকায় শেষ পর্যন্ত কয়েকজন নারী প্রশিক্ষণার্থী সরাসরি তার মুখোমুখি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২৪ মে দুপুরের দিকে সাব্বিরকে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের একটি কক্ষে ডেকে এনে জবাবদিহির মুখোমুখি করা হয়। সেখানে তিনি নিজের আচরণের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। এ সময় ক্ষুব্ধ এক নারী প্রশিক্ষণার্থী তাকে জুতা দিয়ে আঘাত করেন।
প্রশিক্ষকের বক্তব্য
বগুড়া কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ড্রাইভিং প্রশিক্ষক রাশেদুল হাসান বলেন, অভিযোগগুলো একক কোনো ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; বরং একাধিক নারী প্রশিক্ষণার্থী একই ধরনের অভিযোগ করেছেন।
তিনি বলেন, “আলী আজম সাব্বির বেশ কয়েকজন নারী প্রশিক্ষণার্থীর সঙ্গে অশালীন আচরণ করেছেন। যার কারণে একজন নারী প্রশিক্ষণার্থী তাকে জুতাপেটা করেছেন।”
ঘটনার পর সাব্বির নিজের দোষ স্বীকার করেছেন বলেও জানান তিনি।
রাশেদুল হাসান বলেন, “পরে আলী আজম সাব্বির দোষ স্বীকার করে আমাদের কাছে লিখিত অঙ্গীকারনামা দিয়েছেন। অফিস খোলার পর একাডেমি কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
তবে তার বিরুদ্ধে কী ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
এনসিপির সাংগঠনিক ব্যবস্থা
ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। কারণ অভিযুক্ত ব্যক্তি স্থানীয় পর্যায়ে এনসিপির একজন দায়িত্বশীল কর্মী ছিলেন।
এনসিপি বগুড়া জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক শওকত ইমরান বলেন, অভিযোগ সামনে আসার পর দল দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে।
তিনি বলেন, “অভিযোগ আমাদের দৃষ্টিগোচর হওয়ার পরপরই আলী আজম সাব্বিরকে সংগঠনের সব দায়িত্ব ও কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “পাশাপাশি তাকে তিন দিনের সময় দিয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। কেন তার বিরুদ্ধে স্থায়ী সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, সে বিষয়ে তাকে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।”
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব এবং অভিযোগের প্রকৃতি পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকে নারী প্রশিক্ষণার্থীদের অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন। আবার কেউ কেউ অভিযোগের তদন্ত ও বিচার প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতিতে হওয়া উচিত বলে মত দিয়েছেন।
এদিকে, নারী হয়রানি ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
তদন্ত ও পরবর্তী পদক্ষেপ
এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো ফৌজদারি মামলা বা থানায় অভিযোগ দায়েরের তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, একাডেমি কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, এনসিপিও বিষয়টি নিয়ে নিজস্ব সাংগঠনিক তদন্ত ও শৃঙ্খলাবিষয়ক প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে।
ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর শুরু হওয়া বিতর্কের মধ্যে এখন নজর রয়েছে দুটি বিষয়ে—প্রশিক্ষণ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নেয় এবং এনসিপি তাদের দলীয় তদন্ত শেষে আলী আজম সাব্বিরের বিরুদ্ধে কী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

