আদ-দ্বীন হাসপাতালে সাংবাদিকদের উপর হামলা, তদন্তে নতুন প্রশ্ন

ছয় নবজাতকের মৃত্যুর তদন্ত চলাকালে হাসপাতাল ভবনের ভেতরে রুটি তৈরির কারখানার সন্ধান; ছবি তুলতে গেলে গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ

ঢাকার আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছয় নবজাতকের রহস্যজনক মৃত্যুর তদন্তে নতুন মোড় নিয়েছে হাসপাতাল ভবনের ভেতরে একটি ‘রুটির কারখানা’ থাকার তথ্য। এ তথ্য প্রকাশের পর ঘটনাস্থলে ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে গেলে সাংবাদিকদের ওপর হামলা করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের লোকজন।

শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত হাসপাতালটির প্রধান ফটকের সামনে এ ঘটনা ঘটে বলে একাধিক সংবাদকর্মী জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, তদন্তের স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য সামনে আসার পর সেটির দৃশ্য ধারণ করতে গেলে হাসপাতালের কর্মী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সংঘবদ্ধভাবে তাদের ওপর চড়াও হন।

এর কয়েক ঘণ্টা আগে বিকেলে হাসপাতালটি পরিদর্শনে যান স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল। তার সঙ্গে ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও। ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং হাসপাতালের পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখতে তারা সেখানে যান।

পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মন্ত্রী জানান, তদন্তের সময় হাসপাতাল ভবনের ওপরের একটি তলায় একটি রুটি তৈরির কারখানার সন্ধান পাওয়া গেছে।

মন্ত্রী বলেন, “আমরা তদন্ত কমিটির সঙ্গে বৈঠক করেছি। তাদের পর্যবেক্ষণ দেখেছি। তবে যেসব পরিবারের শিশু মারা গেছে, তাদের সবার সঙ্গে এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে কথা বলতে পারেনি তদন্ত কমিটি। সে কারণে তারা আরও সময় চেয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা একটি তলায় রুটির কারখানা পেয়েছি। সেখানে বৈদ্যুতিক ওভেন ব্যবহার করে রুটি তৈরি হতো। কিন্তু সেখানে কোনো ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার পাওয়া যায়নি।”

এই কারখানার কার্যক্রমের সঙ্গে নবজাতকদের মৃত্যুর কোনো সম্ভাব্য সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে বলেও জানান তিনি।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ভাষ্য, “এই কারখানা থেকে এমন কোনো গ্যাস উৎপন্ন হতে পারে কি না, যা শিশুদের সহ্যক্ষমতার বাইরে ছিল, সেটিও পরীক্ষা করে দেখা হবে। বিষয়টি ভালোভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য আগামীকাল বিশেষজ্ঞদের একটি দল আবার হাসপাতালে আসবে।”

ব্রিফিংয়ের পরই উত্তেজনা

সংবাদকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মন্ত্রীর সফরের সময় একটি টেলিভিশন চ্যানেল ছাড়া অন্য কোনো গণমাধ্যমকে তার সঙ্গে হাসপাতালের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। ফলে অধিকাংশ সাংবাদিক বাইরে থেকেই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন।

সন্ধ্যা ৬টার দিকে হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে ব্রিফিংয়ে যখন ‘রুটির কারখানার’ বিষয়টি প্রকাশ করা হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই সাংবাদিকদের মধ্যে সেটি সরেজমিনে দেখার আগ্রহ তৈরি হয়। পরে তারা হাসপাতালের ভেতরে গিয়ে ছবি ও ভিডিও ধারণের চেষ্টা করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

এখন টিভির প্রতিবেদক মো. রিপন বলেন, “আমরা মন্ত্রীর সঙ্গে ভেতরে ঢুকতে পারিনি। কিন্তু ব্রিফিংয়ের পর যখন ভেতরের কিছু ফুটেজ নেওয়ার চেষ্টা করি, তখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের লোকজন আমাদের ওপর চড়াও হয়। এক পর্যায়ে তারা গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলা চালায়।”

তিনি জানান, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। হামলাকারীদের হাত থেকে বাঁচতে সাংবাদিকরা হাসপাতালের সামনের একটি বাসায় আশ্রয় নেন।

রিপন বলেন, “তারা আমাদের ধাওয়া করে। আমরা যে বাসায় আশ্রয় নিয়েছিলাম, সেখানেও ডাব, ইটপাটকেল ছুড়ে মারে। এমনকি আমরা যে কক্ষে ছিলাম, সেই কক্ষের দরজা ভেঙে ফেলারও চেষ্টা করা হয়। পরে স্থানীয় লোকজন এসে পরিস্থিতি শান্ত করে।”

‘মানবঢাল’ তৈরি করে বাধা দেওয়ার অভিযোগ

স্টার নিউজের প্রতিবেদক নিবিড় সাহা বলেন, সাংবাদিকদের শুরু থেকেই হাসপাতালের ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।

তার ভাষ্য, “আমরা মগবাজারের দিকের গেটের পাশে অবস্থান করছিলাম। কিছুক্ষণ পর দেখি হাসপাতালের কর্মীদের এনে প্রধান ফটকের সামনে মানবঢাল তৈরি করা হয়েছে। হাসপাতালের এক ব্যবস্থাপকের সঙ্গে কথা বলার সময় হঠাৎ করেই কয়েকজন আমাদের দিকে তেড়ে আসে।”

নিবিড় সাহা জানান, ঘটনাস্থলে বিভিন্ন গণমাধ্যমের ২০ জনেরও বেশি সাংবাদিক ও ক্যামেরাপার্সন উপস্থিত ছিলেন।

তিনি বলেন, “কেউ ক্যামেরা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে, কেউ আবার ক্যামেরা ভাঙার চেষ্টা করেছে। আমরা অনেকেই পাশের গলি দিয়ে মগবাজার মোড়ের দিকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। এ সময় কয়েকজন শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হন এবং আহত হন।”

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য মেলেনি

ঘটনার বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক এবং একজন সহকারী পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একাধিকবার ফোন করা হলেও তারা সাড়া দেননি।

অন্যদিকে, রমনা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আশিক ইকবাল বলেন, “এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষের কাছ থেকে লিখিত অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

ছয় নবজাতকের মৃত্যুর তদন্তে বাড়ছে রহস্য

কোরবানির ঈদের আগের দিন ঢাকার এই হাসপাতালটিতে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ছয় নবজাতকের মৃত্যু দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। বুধবার ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে একে একে ছয়টি শিশু শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় বলে তাদের পরিবারের অভিযোগ।

কেন একই ওয়ার্ডে থাকা একাধিক নবজাতক প্রায় একই সময়ে অসুস্থ হয়ে পড়ল এবং মারা গেল, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও পৃথকভাবে বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন।

প্রাথমিকভাবে হাসপাতালের পরিবেশ, বায়ু চলাচল ব্যবস্থা, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর বিভিন্ন দিক তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। এর মধ্যেই হাসপাতাল ভবনের ভেতরে একটি রুটি তৈরির কারখানার অস্তিত্ব প্রকাশ্যে আসায় তদন্তে নতুন প্রশ্ন যুক্ত হয়েছে।

এখন সবার নজর তদন্ত কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনের দিকে। নবজাতকদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী ছিল, হাসপাতালের ভেতরের কারখানার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে অপেক্ষা করতে হবে তদন্তের ফলাফলের জন্য।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles