যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সমঝোতা অনিশ্চিত, নতুন করে হামলার হুমকি

যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর আলোচনা চললেও পারমাণবিক কর্মসূচি ও হরমুজ প্রণালি নিয়ে বিরোধ কাটছে না

ওয়াশিংটন/সিঙ্গাপুর — যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতি আরও ৬০ দিনের জন্য বাড়ানোর লক্ষ্যে একটি সম্ভাব্য সমঝোতা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালেও এখনো কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। শুক্রবার হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার শীর্ষ উপদেষ্টাদের নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন। তবে বৈঠক শেষে পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট ঘোষণা আসেনি।

মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, উভয় পক্ষের আলোচকদের মধ্যে একটি সমঝোতা কাঠামো বা সমঝোতা স্মারক (মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং) নিয়ে নীতিগত ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। তবে সেটি কার্যকর করতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের অনুমোদন প্রয়োজন।

প্রস্তাবিত এই চুক্তির আওতায় গত ৮ এপ্রিল কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি আরও ৬০ দিনের জন্য বাড়ানো হবে এবং একই সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হবে।

ট্রাম্পের শর্ত

শুক্রবার বৈঠকের আগে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প কয়েকটি কঠোর শর্ত তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, ইরানকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে তারা কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। পাশাপাশি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি নৌপথ হরমুজ প্রণালি উভয় দিকের জাহাজ চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করতে হবে এবং সেখানে পাতা সব মাইন অপসারণ করতে হবে।

ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ইরানকে তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করতে হবে, যাতে তা ধ্বংস করা যায়।

তিনি লিখেছেন, “ইরানকে অবশ্যই মেনে নিতে হবে যে তারা কখনো পারমাণবিক অস্ত্র বা বোমার মালিক হবে না।”

একই পোস্টে তিনি ইঙ্গিত দেন যে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে আরোপিত নৌ অবরোধ শিথিল করতে প্রস্তুত এবং সেখানে আটকে থাকা জাহাজগুলোকে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হতে পারে।

তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কোনো অর্থের লেনদেন হবে না। অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে।”

হোয়াইট হাউসের অবস্থান

একজন হোয়াইট হাউস কর্মকর্তা সিবিএস নিউজকে বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এমন কোনো চুক্তি করবেন না যা আমেরিকার স্বার্থ রক্ষা করে না। ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হতে পারবে না।”

শুক্রবারের বৈঠকটি হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সাধারণত জাতীয় নিরাপত্তা ও বড় ধরনের আন্তর্জাতিক সংকট নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

তবে বৈঠক শেষে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া

ট্রাম্পের বক্তব্যের পরপরই ইরানের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া আসে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা মোহসেন রেজায়ি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, “যেমনটি আমরা আগেই আশঙ্কা করেছিলাম, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট তৃতীয়বারের মতো কূটনীতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন।”

তিনি আরও বলেন, “নৌ অবরোধ বজায় রাখা এবং আলোচনায় অতিরিক্ত শর্ত আরোপের মাধ্যমে তিনি আবারও প্রমাণ করেছেন যে তিনি প্রকৃত অর্থে আলোচনায় আগ্রহী নন; বরং অন্য উদ্দেশ্য অনুসরণ করছেন।”

ইরানের আধা-সরকারি তাসনিম সংবাদ সংস্থাও জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানি জাহাজ চলাচলের ওপর আরোপিত মার্কিন অবরোধ এখনো বহাল রয়েছে। তাদের দাবি, ইরানি জাহাজগুলো এখনো মার্কিন বাহিনীর সতর্কবার্তার মুখোমুখি হচ্ছে এবং অবরোধরেখা অতিক্রম করতে পারছে না।

এদিকে ফার্স নিউজ এজেন্সি ‘অবগত সূত্রের’ বরাত দিয়ে জানায়, ট্রাম্পের বক্তব্যে “সত্য ও অসত্যের মিশ্রণ” রয়েছে।

সংস্থাটি দাবি করে, আলোচিত সমঝোতা স্মারকে ইরানের পারমাণবিক উপাদান ধ্বংস করার কোনো শর্ত নেই।

পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অচলাবস্থা

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেন, “আমাদের মূল মনোযোগ যুদ্ধের অবসান ঘটানো। পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো আলোচনা চলছে না।”

তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে ইরানকে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উৎপাদন বন্ধ করতে হবে এবং বিদ্যমান মজুতও সরিয়ে ফেলতে হবে। ওয়াশিংটনের আশঙ্কা, এই ইউরেনিয়াম ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে।

ইরান অবশ্য বারবার এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

‘প্রয়োজনে আবার হামলা’

আলোচনার পাশাপাশি সামরিক হুমকিও অব্যাহত রয়েছে।

শনিবার সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত শাংরি-লা ডায়ালগে বক্তব্য দিতে গিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করতে প্রস্তুত।

তিনি বলেন, “প্রয়োজন হলে আমরা আবার অভিযান শুরু করতে পারি। সে সক্ষমতা আমাদের রয়েছে।”

হেগসেথ আরও বলেন, “বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে আমাদের যে অস্ত্রভাণ্ডার রয়েছে, তা এ ধরনের অভিযান পরিচালনার জন্য যথেষ্টেরও বেশি। আমরা খুবই শক্ত অবস্থানে আছি।”

তবে তিনি একই সঙ্গে বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখনো একটি “ভালো চুক্তি” চান, যা নিশ্চিত করবে যে ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারবে না।

যুদ্ধের পটভূমি

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা শুরু করে। এর জবাবে ইরান ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর বিরুদ্ধে হামলা চালায়।

পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে হরমুজ প্রণালিতে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ এই নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরানের কার্যত অবরোধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয় এবং তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়।

যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে, যাদের অধিকাংশই ইরান ও লেবাননের বাসিন্দা।

‘খুব কাছাকাছি, কিন্তু এখনো নয়’

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বৃহস্পতিবার বলেন, আলোচকরা এখনো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষাগত বিষয় নিয়ে আলোচনা করছেন, বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রশ্নে।

তিনি বলেন, “আমরা এখনো সেখানে পৌঁছাইনি, কিন্তু খুব কাছাকাছি আছি। আমরা কাজ চালিয়ে যাব।”

অন্যদিকে ইরানের প্রধান আলোচক ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ বলেন, “আমরা কোনো গ্যারান্টি বা কথার ওপর বিশ্বাস করি না, আমরা বিশ্বাস করি কাজে।”

তিনি আরও বলেন, “অন্য পক্ষ পদক্ষেপ নেওয়ার আগে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে না। যে পক্ষ চুক্তির পরদিন যুদ্ধের জন্য বেশি প্রস্তুত থাকবে, প্রকৃত বিজয়ী হবে সেই পক্ষ।”

যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে উভয় পক্ষই একে অপরকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ করেছে।

বৃহস্পতিবার ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করে, তারা কুয়েতে অবস্থিত একটি মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে, যেখান থেকে এর আগে ইরানের বন্দর শহর বান্দার আব্বাসে হামলা পরিচালিত হয়েছিল।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এ হামলাকে “যুদ্ধবিরতির জঘন্য লঙ্ঘন” বলে অভিহিত করেছে।

অনিশ্চয়তা কাটছে না

সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই একদিকে আলোচনার পথ খোলা রাখছে, অন্যদিকে সামরিক প্রস্তুতি ও কঠোর অবস্থান বজায় রাখছে।

যুদ্ধবিরতি আরও ৬০ দিন বাড়ানো এবং পারমাণবিক ইস্যুতে আলোচনার নতুন পর্ব শুরু হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও এখনো বেশ কিছু মৌলিক মতপার্থক্য রয়ে গেছে।

ফলে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট কূটনৈতিক সমাধানের দিকে এগোবে, নাকি আবারও সামরিক সংঘাতে রূপ নেবে—তা এখনো স্পষ্ট নয়।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles