ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ইরান চুক্তি, খুলতে পারে হরমুজ

যুদ্ধবিরতি বাড়ানো, হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য একটি সমঝোতা চুক্তি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। এই চুক্তি হলে চলমান যুদ্ধবিরতি আরও ৬০ দিনের জন্য বাড়ানো হতে পারে, পুনরায় খুলে যেতে পারে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী, এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন সমঝোতার পথ তৈরি হতে পারে।

বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন থেকে দেওয়া এক বক্তব্যে ট্রাম্প জানান, তিনি হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।

ট্রাম্প বলেন, “আমি এখন সিচুয়েশন রুমে বৈঠকে যাচ্ছি, যেখানে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”

মার্কিন ও ইরানি সূত্রের বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, এপ্রিলের শুরু থেকে কার্যকর থাকা যুদ্ধবিরতি আরও ৬০ দিনের জন্য বাড়ানোর বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছে। এই সময়ে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল ও গ্যাস পরিবহন স্বাভাবিক করার পাশাপাশি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ জটিল বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

হরমুজ প্রণালী নিয়ে ট্রাম্পের শর্ত

ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেছেন, যেকোনো চুক্তির জন্য দুটি বিষয় অপরিহার্য। প্রথমত, ইরানকে স্থায়ীভাবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনা ত্যাগ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, হরমুজ প্রণালী আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য সম্পূর্ণভাবে খুলে দিতে হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, “ইরানকে সম্মত হতে হবে যে তারা কখনও পারমাণবিক অস্ত্র বা বোমা তৈরি করবে না। হরমুজ প্রণালী অবিলম্বে খুলে দিতে হবে এবং দুই দিকেই কোনো টোল বা বাধা ছাড়া জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে হবে।”

তিনি আরও দাবি করেন, ইরানের পারমাণবিক উপকরণ যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে আনা হবে।

ইরানের ভিন্ন অবস্থান

তবে ট্রাম্পের বক্তব্যের সব অংশের সঙ্গে একমত নয় তেহরান।

একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, যুদ্ধ-সংক্রান্ত একটি রাজনৈতিক সমঝোতা মূলত হয়ে গেছে, তবে তা এখনও চূড়ান্ত নয়।

এদিকে ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজ এজেন্সি ট্রাম্পের বক্তব্যকে “সত্য ও অসত্যের মিশ্রণ” বলে উল্লেখ করেছে। সংস্থাটি দাবি করেছে, ওয়াশিংটন আলোচনার বাস্তবতার চেয়ে বড় একটি কূটনৈতিক সাফল্যের চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করছে।

ফার্সের দাবি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইরানি জাহাজের ওপর আরোপিত অবরোধ প্রত্যাহার করলে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া হতে পারে। তবে আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক উপাদান ধ্বংস করার কোনো শর্ত নেই। বরং ইরানের প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে তারা জানিয়েছে।

হাজারো প্রাণহানি, বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান দিয়ে যে যুদ্ধ শুরু হয়, তা দ্রুত মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত সংঘাতে রূপ নেয়।

এই সংঘাতে প্রধানত ইরান ও লেবাননে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতিতেও এর বড় প্রভাব পড়েছে।

বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে যায়। সংঘাতের জেরে এই জলপথ কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। অনেক দেশ জ্বালানি সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায় পড়ে।

তবে সম্ভাব্য সমঝোতার খবর ছড়িয়ে পড়তেই আন্তর্জাতিক বাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। শুক্রবার তেলের দাম কমেছে এবং বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে।

ট্রাম্পের আশাবাদী বার্তা

ট্রাম্প তাঁর পোস্টে আরও বলেন, হরমুজ প্রণালীতে পাতা মাইন অপসারণ করা হবে এবং দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা জাহাজগুলো তাদের গন্তব্যে ফিরতে পারবে।

তিনি রসিকতার সুরে লেখেন, “আপনারা সবাই আপনাদের স্ত্রী, স্বামী, বাবা-মা ও পরিবারের কাছে ফিরে যেতে পারবেন। আমার পক্ষ থেকে তাদের শুভেচ্ছা জানাবেন।”

তবে একই পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, “পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কোনো অর্থ লেনদেন হবে না।”

পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি ইরানের দাবি করা টোল, যুদ্ধক্ষতির ক্ষতিপূরণ বা বিদেশে জব্দ থাকা ইরানি সম্পদ মুক্তির প্রসঙ্গের প্রতি ইঙ্গিত হতে পারে।

পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন সমাধানের চেষ্টা

আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত।

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সংঘাত শুরুর আগে ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা কয়েকশ কিলোগ্রাম ইউরেনিয়াম ছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি অস্ত্রমানের ইউরেনিয়ামে রূপান্তরের প্রযুক্তিগত সীমার খুব কাছাকাছি।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আইএইএর মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চুক্তি হলে কাজাখস্তান ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম গ্রহণ করতে আগ্রহ দেখিয়েছে।

গ্রোসি বলেন, “কাজাখস্তান ইঙ্গিত দিয়েছে যে, চুক্তি হলে তারা তেহরানের অস্ত্রমানের কাছাকাছি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত গ্রহণ করতে প্রস্তুত।”

কাজাখস্তান বর্তমানে আইএইএর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক নিম্ন-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যাংকের স্বাগতিক দেশ।

এখনও বাকি বহু জটিলতা

যদিও দুই পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারকের খসড়া নিয়ে আলোচনা চলছে, তবুও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনও অমীমাংসিত রয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদ মুক্ত করা, পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ভবিষ্যৎ এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক দিনের সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করবে যুদ্ধবিরতি সাময়িকভাবে বাড়ানো হবে নাকি এটি মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদি শান্তি আলোচনার ভিত্তি হয়ে উঠবে।

হোয়াইট হাউসের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে এখন তাকিয়ে রয়েছে শুধু ওয়াশিংটন ও তেহরান নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলও।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles