নিহতের হিসাব জাতিসংঘে চ্যালেঞ্জ করলেন শেখ হাসিনা

জাতিসংঘের ১,৪০০ মৃত্যুর অনুমানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ওএইচসিএইচআরের কাছে পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে চিঠি দিয়েছেন শেখ হাসিনার আইনজীবীরা

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সহিংস আন্দোলনের সময় নিহতের সংখ্যা নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের (ওএইচসিএইচআর) প্রকাশিত হিসাব পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। লন্ডনে নিয়োজিত আইনজীবীদের মাধ্যমে পাঠানো তাঁর উকিল নোটিশে বাংলাদেশের সরকারি নথিতে প্রকাশিত তথ্যের সঙ্গে জাতিসংঘের প্রকাশিত বহুল আলোচিত নিহতের সংখ্যার মারাত্মক অসঙ্গতি তুলে ধরা হয়েছে।

গতকাল (২৮ মে) জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টুর্কের কাছে পাঠানো চিঠিতে শেখ হাসিনার পক্ষে যুক্তরাজ্যের বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার স্টিভেন পাওলস কিংস কাউন্সেল (কেসি) ওএইচসিএইচআরের ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত তদন্ত প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

চিঠিতে পাওলস বলেন, “এটি গভীর উদ্বেগের বিষয় যে জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদন প্রকৃত সত্য থেকে এতটাই বিচ্যুত।” তিনি প্রতিবেদনটিতে উল্লেখিত নিহতের সংখ্যা সংশোধন এবং তা প্রত্যাহারের আহ্বান জানান।

সংবাদ সংস্থাগুলোর খবরে বলা হয়েছে, ওই চিঠিতে অভিযোগ করা হয়েছে যে ভুল বা অতিরঞ্জিত হতাহতের সংখ্যা ব্যবহার করে শেখ হাসিনা ও তার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বর্ণনাকে শক্তিশালী করা হয়েছে।

এই আইনি পদক্ষেপ এমন এক সময়ে এসেছে, যখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। বর্তমানে দেশ পরিচালনা করছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে তারা ক্ষমতায় আসে। ওই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী প্রশাসনের অধীনে, যেখানে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপি সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং জামায়াতে ইসলামী প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়।

নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক

২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত ওএইচসিএইচআরের প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সংঘটিত সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা পর্যালোচনা করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণের ভিত্তিতেই জাতিসংঘ এই তদন্ত করেছিল।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি সংস্থা, নাগরিক সমাজ, প্রত্যক্ষদর্শী, চিকিৎসা নথি এবং উন্মুক্ত উৎস থেকে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে ওএইচসিএইচআর এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে বিক্ষোভ চলাকালে “সর্বোচ্চ ১,৪০০ জন পর্যন্ত নিহত হয়ে থাকতে পারেন।” এই সিদ্ধান্ত ছিল অনুমাননির্ভর এবং সম্পূর্ণরূপে তৎকালীন ইউনূস সরকারের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বানানো রিপোর্ট।

জাতিসংঘের ঐ প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, চূড়ান্তকরণের সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নথিতে ৮৪১ জন নিহতের তথ্য ছিল। তবে ওএইচসিএইচআরের দাবি, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) আরও ৩১৪ জনের তথ্য সরবরাহ করেছিল, যাদের নাম স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তালিকায় ছিল না। বিভিন্ন তালিকা পর্যালোচনা ও পুনরাবৃত্ত নাম বাদ দেওয়ার পর তারা ১,৪০০ জন পর্যন্ত নিহত হওয়ার সম্ভাব্য হিসাব প্রকাশ করে।

শেখ হাসিনার আইনজীবীরা এই পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের বক্তব্য, তদন্তে ব্যবহৃত তথ্যের তুলনায় পরবর্তীকালে প্রকাশিত সরকারি নথি সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে।

২০২৫ সালের ১৬ জানুয়ারি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে নিহত ৮৩৪ জনকে ‘শহীদ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে প্রথম গেজেট প্রকাশ করে। উপসচিব হরিদাস ঠাকুর স্বাক্ষরিত ওই গেজেটে নিহতদের নাম, ঠিকানা ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত পরিচিতি নম্বর অন্তর্ভুক্ত ছিল।

পরবর্তীকালে তালিকাটিতে পরিবর্তন আনা হয়। ২০২৫ সালের আগস্টে প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জুন মাসে আরও ১০ জনের নাম যুক্ত হয়ে সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৪৪। পরে যাচাই-বাছাইয়ের সময় আটটি নাম বাদ দেওয়া হয়, কারণ কিছু ক্ষেত্রে একই ব্যক্তির নাম একাধিকবার অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল এবং কিছু ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। ফলে স্বীকৃত “শহীদের” সংখ্যা তখন দাঁড়ায় ৮৩৬।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে পরবর্তীকালে আরও কয়েকটি গেজেট প্রকাশিত হয়েছে, যার মধ্যে ২০২৬ সালের ১৬ মার্চের একটি গেজেটও রয়েছে। এতে বোঝা যায়, তাদের কথিত শহীদদের চূড়ান্ত তালিকা প্রণয়নের কাজ দীর্ঘ সময় ধরে চলমান ছিল।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। জাতিসংঘের ১,৪০০ সংখ্যাটি ছিল সরকারের বিভিন্ন উৎসের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তৈরিকৃত একটি সম্ভাব্য হিসাব, অন্যদিকে সরকারি গেজেট ছিল রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও ক্ষতিপূরণের আওতায় অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিদের তালিকা। ফলে দুটি তালিকার উদ্দেশ্য এবং প্রণয়ন-পদ্ধতি এক ছিল না।

আওয়ামী লীগ, পুলিশ ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার কথাও বলেছে জাতিসংঘ

ওএইচসিএইচআরের প্রতিবেদনটি শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করলেও সেখানে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী, পুলিশ সদস্য এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর সংঘটিত সহিংসতার ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের কার্যালয় ও নেতাকর্মীদের বাড়িঘরে হামলা, পুলিশ স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ এবং ব্যক্তি পর্যায়ে হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটে।

তৎকালীন সরকারের দেওয়া তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে ৪৪ জন পুলিশ সদস্য নিহত এবং ২,৩০৮ জন আহত হন।

একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ জাতিসংঘকে একটি তালিকা দেয়, যেখানে দাবি করা হয় যে ওই সময়কালে দল ও এর সহযোগী সংগঠনের ১৪৪ জন নেতা-কর্মী নিহত হয়েছেন।

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, ৫ আগস্ট থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে হিন্দু, আহমদিয়া, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের উপাসনালয় ও সম্পত্তির ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া তদন্তের সময়সীমা শেষ হওয়ার পরও সংখ্যালঘু ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগ জাতিসংঘের কাছে আসতে থাকে।

শেখ হাসিনার আইনজীবীদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো আলোচিত হলেও অন্তর্বর্তী সরকার ও তাদের সমর্থনপুষ্ট নির্যাতক গোষ্ঠীর অপরাধ কর্মের তথ্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রায় আড়ালে থেকে গেছে। তদন্তের সময়সীমা সীমিত থাকায় ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী প্রশাসন দায়িত্ব গ্রহণের পর আওয়ামী লীগ সমর্থক ও সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত সহিংসতার পূর্ণাঙ্গ চিত্র উঠে আসেনি।

অন্তর্বর্তী প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

যে প্রশাসনের আমন্ত্রণে তদন্ত শুরু হয়েছিল, সেই প্রশাসনের রাজনৈতিক স্বার্থ বা ক্ষমতা পরিবর্তনের সময়কার ঘটনাগুলো যথেষ্ট নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শেখ হাসিনার আইনজীবীরা।

ওএইচসিএইচআর তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট ভলকার টুর্কের সঙ্গে টেলিফোন আলাপের সময় ড. ইউনূস তদন্তের বিষয়টি উত্থাপন করেন। পরে একই মাসে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়।

জাতিসংঘ তদন্তকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বলে বর্ণনা করলেও শেখ হাসিনার পক্ষে পাঠানো চিঠিতে দাবি করা হয়েছে যে অন্তর্বর্তী প্রশাসনের রাজনৈতিক ভূমিকা এবং তাদের মিত্রদের জন্য কাজ করেছে সংস্থাটি।

এই বিতর্ক আরও তীব্র হয় ২০২৫ সালের ৫ মার্চ বিবিসির ‘হার্ডটক’ অনুষ্ঠানে ভলকার টুর্কের দেওয়া এক সাক্ষাৎকারের পর।

সেখানে তিনি বলেন, বিক্ষোভ দমনে সেনাবাহিনী সরাসরি অংশ নিলে বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সৈন্য প্রেরণকারী দেশ হিসেবে তার অবস্থান হারাতে পারে—এমন সতর্কবার্তা জাতিসংঘ দিয়েছিল।

টুর্ক বলেন, “আমরা প্রকৃতপক্ষে সেনাবাহিনীকে সতর্ক করেছিলাম… তারা হয়তো আর শান্তিরক্ষা মিশনে সৈন্য পাঠানো দেশ হিসেবে থাকতে পারবে না। এর ফলেই আমরা পরিবর্তন দেখতে পেয়েছি।”

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পরে এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে। ২০২৫ সালের ১০ মার্চ আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক বিবৃতিতে জানায়, জাতিসংঘের পক্ষ থেকে কোনো উদ্বেগ জানানো হয়ে থাকলে তা তৎকালীন সরকারের কাছেই পাঠানো হয়েছিল, সেনাবাহিনীর কাছে নয়। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, টুর্কের মন্তব্য সেনাবাহিনীর ভূমিকা সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে এবং বাহিনীর সুনাম ক্ষুণ্ন করতে পারে।

বিতর্কের কেন্দ্রে নিহতের সংখ্যা

আইনজীবী স্টিভেন পাওলসের চিঠির মূল বিষয় হলো নিহতের সংখ্যা। যদিও ওএইচসিএইচআর কখনও বলেনি যে ঠিক ১,৪০০ জন নিহত হয়েছেন, তবে “সর্বোচ্চ ১,৪০০ জন পর্যন্ত নিহত হতে পারেন” — এই মূল্যায়নই পরবর্তীকালে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যম, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং আইনি আলোচনায় সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত হয়েছে।

শেখ হাসিনার আইনজীবীরা বলছেন, পরবর্তী সরকারি নথি এবং স্বীকৃত তালিকা এই হিসাবের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতি তুলে ধরেছে। তাদের মতে, এই পার্থক্য যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

নিহতের সংখ্যা নিয়ে এই বিতর্ক শুধু পরিসংখ্যানগত নয়; এটি ২০২৪ সালের রাজনৈতিক সংকট, পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়া, আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন এবং বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের ব্যাখ্যার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

এই প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর স্টিভেন পাওলসের ২৮ মে তারিখের চিঠির বিষয়ে কোনো প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া জানায়নি। একই সঙ্গে, তারা প্রতিবেদনটির কোনো অংশ পুনর্বিবেচনা বা সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে কি না, সে সম্পর্কেও কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যায়নি।

শেখ হাসিনার আইনজীবীর দেয়া চিঠির পিডিএফ

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles