ঢাকার মগবাজারে অবস্থিত আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে উদ্বেগ ও শোকের সৃষ্টি হয়েছে। বুধবার ভোরে হাসপাতালটির পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে থাকা নবজাতকরা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) নেওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে শেষ পর্যন্ত ছয় শিশুই মারা যায়।
ঘটনার পরপরই স্বজনদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই অভিযোগ করেন, হাসপাতালের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের গ্যাস লিকেজ বা বদ্ধ পরিবেশের কারণেই শিশুদের মৃত্যু হতে পারে। যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করেনি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে এবং ৭২ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দিয়েছে।
হাসপাতালের মহাপরিচালক (হসপিটালস অ্যান্ড নার্সিং) অধ্যাপক ডা. নাহিদা ইয়াসমিন বুধবার দুপুরে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে জানান, যে ওয়ার্ডে ঘটনাটি ঘটেছে সেখানে ১১ জন মা ও ছয় নবজাতক ছিল। এটি হাসপাতালের পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ড, যেখানে সন্তান জন্মের পর মা, নবজাতক এবং একজন স্বজন একসঙ্গে অবস্থান করেন।
তিনি বলেন, “রাতে মায়েরা দায়িত্বে থাকা নার্সদের ডেকে বলেছিলেন যে খুব ঠান্ডা লাগছে, তাই এসি বন্ধ করতে হবে। এরপর রাত ৩টার দিকে দুটি শিশু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। তখন তাদের এনআইসিইউতে নেওয়া হয়। চিকিৎসকরা পরীক্ষা করে বলেছিলেন তারা স্থিতিশীল আছে। পরে আবার ওয়ার্ডে ফিরিয়ে আনা হয়।”
ডা. নাহিদা আরও বলেন, ভোর ৬টার দিকে পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হতে শুরু করে। “মায়েরা আবার নার্সদের জানান যে বাচ্চাদের অসুস্থ মনে হচ্ছে। তখন ছয়জন শিশুকেই এনআইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানে নেওয়ার সময়ই দুই শিশু মারা যায়। অন্য চারজনের অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন ছিল। তাদের ভেন্টিলেটর সাপোর্ট দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাউকেই বাঁচানো সম্ভব হয়নি।”
একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মৃত্যু কী কারণে হতে পারে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো কারণ নিশ্চিত করতে চায়নি।
তবে হাসপাতালের বাইরে অপেক্ষমাণ স্বজনদের বক্তব্যে উঠে এসেছে ভয়াবহ আতঙ্কের চিত্র। তাদের অভিযোগ, রাতে ওয়ার্ডের ভেতরে অস্বাভাবিক গরম ও দমবন্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। অনেকে ধারণা করছেন, এসি বন্ধ করার পর বা যন্ত্রে কোনো ত্রুটি দেখা দেওয়ার কারণে গ্যাস লিক হতে পারে। কিছু স্বজন দাবি করেন, শিশুদের শরীর দ্রুত নীলচে হয়ে যাচ্ছিল।
ঘটনার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “ভোরের দিকে ওয়ার্ডে দমবন্ধ পরিস্থিতি ছিল বলে আমরা জেনেছি। এসি সিস্টেমে কোনো জটিলতা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—সিস্টেমটি এমনভাবে করা ছিল যে এসি বন্ধ হয়ে গেলে বিকল্প বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা ছিল না।”
তিনি আরও বলেন, যদি অবহেলা, ত্রুটি বা নিরাপত্তা ঘাটতির প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। বুধবার স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা-১ শাখার উপসচিব ডা. মো. মোস্তাফিজুর রহমান স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে তিন সদস্যের কমিটির কথা জানানো হয়।
কমিটির প্রধান করা হয়েছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা শাখার একজন যুগ্ম সচিবকে। এছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আইন শাখার সহকারী পরিচালক এবং হাসপাতাল-১ শাখার উপপরিচালককে সদস্য করা হয়েছে। তদন্ত কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান করে প্রয়োজনীয় সুপারিশসহ প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল বৃহস্পতিবার সকালে নরসিংদীর মনোহরদীতে ঈদের নামাজ শেষে সাংবাদিকদের বলেন, “আজকের আনন্দের দিনে আদ-দ্বীন হাসপাতালের শিশু মৃত্যুর খবর অত্যন্ত বেদনাদায়ক। আমরা জানতে পেরেছি, এক মায়ের অনুরোধে ওয়ার্ডের এসি বন্ধ করা হয়েছিল। পরে সম্ভবত গ্যাস লিকেজ বা অন্য কোনো প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।”
মন্ত্রী বলেন, “৭২ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। তদন্তে হাসপাতালের গাফিলতি বা ত্রুটি পাওয়া গেলে সব ধরনের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন বাংলাদেশ শিশুস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় বাড়তি চাপের মধ্যে রয়েছে। দেশে সম্প্রতি হামের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে হাজার হাজার শিশু হাম আক্রান্ত হয়েছে এবং অনেক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ফলে শিশু ওয়ার্ড ও এনআইসিইউগুলোতে চাপও বেড়েছে।
ঈদের নামাজ শেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাম পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন। তিনি বলেন, “আমরা যদি হাম নিয়ন্ত্রণ করতে না পারতাম, তাহলে হাজার হাজার শিশু মারা যেত। আমাদের কাছে পর্যাপ্ত টিকা আছে। প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনা হবে।”
আদ-দ্বীন হাসপাতালের এই ঘটনা নতুন করে দেশের বেসরকারি হাসপাতালগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, নবজাতক পরিচর্যা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে নবজাতক ও প্রসূতি ওয়ার্ডে বায়ু চলাচল, অক্সিজেন সরবরাহ, বিদ্যুৎ ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মান নিয়ে এখন নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
পুলিশ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং সিআইডির সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। হাসপাতালের এসি ও বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা পরীক্ষা করা হচ্ছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তবে একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মৃত্যু দেশের স্বাস্থ্যখাতে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে। স্বজনদের কান্না, চিকিৎসকদের ব্যর্থ চেষ্টা এবং হাসপাতালের ভেতরের বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি—সব মিলিয়ে ঘটনাটি ঈদের আনন্দের মধ্যেও গভীর শোকের আবহ তৈরি করেছে।

