কোরবানি থেকে রক্ষা পেল ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নামের বিরল সাদা মহিষ

স্বর্ণালি চুলের কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া অ্যালবিনো মহিষটিকে শেষ মুহূর্তে সরকারি হস্তক্ষেপে জাতীয় চিড়িয়াখানায় সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত

ঢাকা — ঈদুল আজহায় কোরবানির জন্য কেনা বিরল প্রজাতির একটি সাদা মহিষকে শেষ মুহূর্তে সরকারি হস্তক্ষেপে কোরবানি থেকে রক্ষা করা হয়েছে। “ডোনাল্ড ট্রাম্প” নামে পরিচিত মহিষটি এখন রাজধানীর জাতীয় চিড়িয়াখানায় সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বর্ণালি রঙের দীর্ঘ চুলের কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় আসা এই মহিষকে ঘিরে দেশজুড়ে কৌতূহল তৈরি হওয়ার পরই সরকার এ সিদ্ধান্ত নেয়।

প্রায় ৭০০ কেজি ওজনের বিরল অ্যালবিনো মহিষটি ঈদুল আজহার কোরবানির জন্য কেনা হয়েছিল। ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জে ক্রেতার বাড়িতেও সেটিকে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু বুধবার, ২৭ মে, ঈদের আগের দিন বিকেলে প্রশাসনের কর্মকর্তারা সেখানে গিয়ে মহিষটিকে সরকারি হেফাজতে নেন। পরে সেটিকে ঢাকার জাতীয় চিড়িয়াখানায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

মহিষটির গায়ের রং ছিল হালকা ক্রিম বর্ণের। নাক ছিল গোলাপি আভাযুক্ত। তবে সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে তার কপালের ওপর ঝুলে থাকা লম্বা স্বর্ণালি চুল। অনেকে সেই চুলের ধরনকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিচিত হেয়ারস্টাইলের সঙ্গে তুলনা করেন। সেখান থেকেই মহিষটির নামকরণ করা হয় “ডোনাল্ড ট্রাম্প”। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সেটির ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ঈদের আগে বহু মানুষ শুধু এক নজর দেখার জন্য ভিড় জমাতে শুরু করেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বুধবার ঢাকায় সাংবাদিকদের বলেন, প্রাণীটিকে ঘিরে অস্বাভাবিক জনআগ্রহ ও নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় শেষ মুহূর্তে সরকার কোরবানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। তিনি বলেন, “প্রাণীটিকে ঘিরে মানুষের ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। নিরাপত্তা পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হয়েছে। তাই শেষ মুহূর্তে কোরবানি থেকে বিরত রেখে সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।”

মহিষটির ক্রেতা মনিরুজ্জামান জানান, পুলিশ বিকেলে তার বাড়িতে গিয়ে জানায়, সরকার প্রাণীটিকে নিয়ে যাবে। ২৭ মে কেরানীগঞ্জে তিনি দি ভয়েসকে বলেন, প্রশাসনের সঙ্গে কোনো ধরনের বিরোধে যেতে চাননি বলেই তারা মহিষটি হস্তান্তর করেছেন।

মনিরুজ্জামান বলেন, “ঈদুল ফিতরের প্রায় ১০ দিন পর আমি মহিষটি কিনি। তিন দিন আগে খামার থেকে বাড়িতে নিয়ে আসি। বিকেলে থানা থেকে লোকজন এসে জানাল সরকার এটি নিয়ে যাবে। আমরা কোনো ঝামেলা চাইনি। সরকার চেয়েছে, তাই দিয়ে দিয়েছি।”

তিনি আরও বলেন, সরকার তাকে ক্ষতিপূরণ অথবা বিকল্প পশু দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। তার ভাষায়, “সরকার বলেছে, যে দামে এটি কেনা হয়েছে সেই মূল্য পরিশোধ করবে, না হলে কোরবানির জন্য আরেকটি গরু বা পশু দেবে।”

এই ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন বাংলাদেশ ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে বছরের সবচেয়ে বড় পশু বাণিজ্যের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহায় গরু, ছাগল, ভেড়া, মহিষসহ বিভিন্ন পশু কোরবানি দেওয়া হয়। কোরবানির মাংস আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হয়। অনেক নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য এই সময়টিই বছরে মাংস খাওয়ার অন্যতম বড় সুযোগ।

সরকারি হিসাবে, চলতি বছর দেশে কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা ছিল চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি। ৩ মে সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ জানান, দেশে কোরবানির জন্য পর্যাপ্ত পশু রয়েছে এবং আমদানির প্রয়োজন হবে না।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছিল প্রায় ১ কোটি ১ লাখ পশু। এর মধ্যে গরু ও মহিষের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫৬ লাখ ৯০ হাজার, আর ছাগল ও ভেড়ার সংখ্যা ছিল ৬৬ লাখের বেশি। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় প্রায় ২২ লাখের বেশি পশু উদ্বৃত্ত ছিল।

এই বিশাল পশুর বাজারে “ডোনাল্ড ট্রাম্প” ছিল এক ব্যতিক্রমী উপস্থিতি। বাংলাদেশে সাধারণত মহিষের গায়ের রং কালচে হয়। ফলে অ্যালবিনো বা সাদা মহিষ অত্যন্ত বিরল। প্রাণীটির হালকা গায়ের রং, স্বর্ণালি চুল এবং ভিন্নধর্মী চেহারা একে অন্য সব পশুর থেকে আলাদা করে তুলেছিল।

মহিষটি নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় অবস্থিত রাবেয়া অ্যাগ্রো ফার্মে লালন-পালন করা হয়েছিল। খামারের মালিক জিয়াউদ্দিন মৃধা জানান, তার ছোট ভাই মজা করেই মহিষটির নাম “ডোনাল্ড ট্রাম্প” রাখেন। কারণ, প্রাণীটির কপালের চুল দেখতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের চুলের মতো লাগছিল।

ঈদের আগে নারায়ণগঞ্জে দি ভয়েসকে জিয়াউদ্দিন মৃধা বলেন, “আমার ছোট ভাই নামটা দিয়েছিল। কপালের সামনের চুল ডোনাল্ড ট্রাম্পের চুলের মতো দেখাত বলেই এই নাম রাখা হয়।”

তিনি আরও বলেন, মহিষটি স্বভাবগতভাবে অত্যন্ত শান্ত। “দেখতে আলাদা হলেও এটি খুব শান্ত প্রকৃতির। অ্যালবিনো প্রাণীগুলো সাধারণত আক্রমণাত্মক হয় না, যদি না তাদের উসকানি দেওয়া হয়,” বলেন তিনি।

খামার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মহিষটিকে বিশেষ যত্নে রাখা হতো। প্রতিদিন চারবার গোসল করানো হতো এবং চারবার খাবার দেওয়া হতো। প্রাণীটির বিরল বৈশিষ্ট্য ও জনআগ্রহের কারণে বাড়তি যত্ন নেওয়া প্রয়োজন ছিল বলে তারা জানান।

মহিষটি কেরানীগঞ্জে পৌঁছানোর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর ভিডিও আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কৌতূহলী মানুষ দল বেঁধে সেটিকে দেখতে ক্রেতার বাড়িতে যেতে শুরু করেন। ভিড় সামাল দিতে পরিবারটিকে মহিষটিকে ঘরের ভেতরে রাখতে হয়েছিল। এমনকি পরে যখন পুলিশ সেটিকে থানায় নিয়ে যায়, তখনও অনেকে বাড়িতে এসে জানতে পারেন যে মহিষটি আর সেখানে নেই।

কেরানীগঞ্জ থানা পুলিশ পরে জানায়, বিরল প্রাণী হিসেবে বিবেচনা করেই মহিষটিকে সরকারি তত্ত্বাবধানে নেওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হবে। জাতীয় চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রাণীটির জন্য আলাদা শেড ও নির্দিষ্ট পরিচর্যাকারীর ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

এই ঘটনা বাংলাদেশের ঈদের পশুর বাজারে নতুন এক প্রবণতার দিকও তুলে ধরেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অস্বাভাবিক আকার, রং বা বৈশিষ্ট্যের পশু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। অনেক সময় এসব পশুর নামও রাখা হয় আন্তর্জাতিক তারকা, রাজনীতিক বা চলচ্চিত্র চরিত্রের নামে। ফলে পশুর বাজার শুধু বেচাকেনার জায়গা নয়, জনআলোচনারও অংশ হয়ে উঠছে।

তবে “ডোনাল্ড ট্রাম্প” নামের এই মহিষটি কেবল একটি ভাইরাল আকর্ষণ হয়েই থাকেনি। এর জনপ্রিয়তা সরকারকে সরাসরি হস্তক্ষেপে বাধ্য করেছে। কোরবানির জন্য আইনসম্মতভাবে কেনা একটি প্রাণীকে জনস্বার্থে সংরক্ষণ করা উচিত কি না—তা নিয়েও সামাজিক মাধ্যমে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

ক্রেতার জন্য এটি ছিল ঈদের কোরবানির পশু হারানোর ঘটনা। সরকারের জন্য এটি ছিল জনআগ্রহ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার বিষয়। আর খামার মালিকের কাছে এটি ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের শক্তির এক বড় উদাহরণ—যেখানে একটি সাধারণ পশু বিক্রির ঘটনা আন্তর্জাতিক সংবাদে পরিণত হতে পারে।

বাংলাদেশে প্রতি বছর কোটি কোটি পশু কোরবানি হয়। সেই বিশাল আয়োজনের মধ্যে একটি বিরল সাদা মহিষ বেঁচে গেল শুধু তার অদ্ভুত চেহারা ও মানুষের কৌতূহলের কারণে। এ বছরের ঈদুল আজহায় “ডোনাল্ড ট্রাম্প” তাই কেবল একটি পশুর নাম নয়, বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, জনআগ্রহ ও রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের এক ব্যতিক্রমী ঘটনার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles