উপদেষ্টারা দায় নিচ্ছে না, ইউনূস আমলে বাংলাদেশ চালিয়েছে কে?

সাবেক উপদেষ্টাদের বক্তব্যে অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া, গোপন ক্ষমতাকেন্দ্র, যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ চুক্তি ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের দায় অস্বীকার করে কথা বলছেন ঐ সরকারের বিভিন্ন উপদেষ্টা। সকল অপকর্মের দায় ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তার পরিষদের কয়েকজন সদস্যের উপর চাপাচ্ছেন তারা। এমন কি কেউ কেউ সেসময পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন বলেও মিডিয়াকে জানিয়েছেন। কিন্তু নানাকারণে তারা পদত্যাগ করতে পারেননি।

তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসছে একটি বড় প্রশ্ন—বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম অস্থির রাজনৈতিক রূপান্তরকালে আসলে দেশটি কে চালিয়েছে?

ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর ভাঙচুর ও ধ্বংস থেকে শুরু করে ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর—এসব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে এখন সাবেক উপদেষ্টাদের ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য সামনে আসছে। তাঁদের কেউ বলছেন, সিদ্ধান্তগুলো আনুষ্ঠানিক উপদেষ্টা পরিষদে নেওয়া হয়নি। কেউ বলছেন, তাঁরা আলোচনায় ছিলেন না। কেউ বলছেন, তাঁরা আপত্তি জানিয়েছিলেন, কিন্তু তা আমলে নেওয়া হয়নি। আবার কেউ সরাসরি বলছেন, সরকারের ভেতরে একটি অনানুষ্ঠানিক “কিচেন ক্যাবিনেট” ছিল, যেখানে মূল সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো।

এই বক্তব্যগুলো এমন সময়ে সামনে আসছে, যখন বিএনপি নতুন সরকার গঠনের পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বিতর্কিত বাণিজ্য চুক্তির দায় আগের অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর চাপানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু সেই অন্তর্বর্তী সরকারেরই একাধিক সাবেক উপদেষ্টা এখন বলছেন, তাঁরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ার বাইরে ছিলেন। ফলে প্রশ্ন উঠছে, ইউনূস-প্রশাসনের নামে যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর প্রকৃত দায় কার?

সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেছেন, তিনি তিনবার পদত্যাগের কথা ভেবেছিলেন। সাবেক উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, বড় সিদ্ধান্তগুলো আনুষ্ঠানিক মন্ত্রিসভা বা উপদেষ্টা পরিষদে নেওয়া হতো না। সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে আলোচনায় তাঁকে ডাকা হয়নি।

সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেছেন, তিনি চুক্তির কিছু অংশের বিরোধিতা করেছিলেন, কিন্তু তা ঠেকাতে পারেননি। আর জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখপাত্র ও সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরে “কিচেন ক্যাবিনেট” ছিল, তবে তিনি তার অংশ ছিলেন না।

এসব বক্তব্য মিলিয়ে এখন একটি বড় রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ কি আনুষ্ঠানিক ও জবাবদিহিমূলক উপদেষ্টা পরিষদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছিল, নাকি ইউনূসের চারপাশে থাকা একটি ছোট, অনির্বাচিত ও অপ্রকাশ্য বলয় রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল?

বিতর্কের কেন্দ্রে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য চুক্তি

নতুন বিতর্কের তাৎক্ষণিক কারণ হলো ৯ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি। জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে এই চুক্তি হয়। হোয়াইট হাউস তখন বলেছিল, এই চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের রপ্তানিকারকেরা একে অন্যের বাজারে “অভূতপূর্ব প্রবেশাধিকার” পাবে।

অথচ এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের ওপর বিস্তৃত বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর নির্দিষ্ট শুল্কনীতি অনুসরণ করবে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা পণ্যের ওপর কোটা আরোপ করবে না—যদি না অন্যভাবে সম্মত হয়। বেশ কিছু ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের মানদণ্ড বা সনদ গ্রহণের বিষয়ও এতে অন্তর্ভুক্ত আছে।

চুক্তিতে ডিজিটাল বাণিজ্য, নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, প্রতিরক্ষা বাণিজ্য, পারমাণবিক-সম্পর্কিত ক্রয় এবং অ-বাজার অর্থনীতির দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি নিয়ে চলার ধারা রয়েছে। সমালোচকেরা বলছেন, একটি নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে এমন বিস্তৃত ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষর জাতীয় সংসদীয় পর্যালোচনা ছাড়া হওয়া উচিত ছিল না।

বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, যিনি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন, চুক্তিটির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ৪ মার্চ তিনি দাবি করেন, চুক্তিটি তড়িঘড়ি করে হয়নি; আলোচনা অনেক আগে থেকেই চলছিল। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের আগে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের বিষয়টি জানানো হয়েছিল এবং তাঁরা সম্মতি দিয়েছিলেন।

কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ৬ মার্চ ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আন্তর্জাতিক চুক্তি নিয়ে তাঁর দলের সঙ্গে কোনো পরামর্শ করা হয়নি।

আসিফ মাহমুদের বক্তব্যে নতুন মাত্রা

জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। ২৬ মে রাজধানীর বাংলামোটরে দলটির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি স্বীকার করেন যে অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরে একটি “কিচেন ক্যাবিনেট” ছিল। তবে তিনি দাবি করেন, তিনি সেই বলয়ের অংশ ছিলেন না।

তাঁকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল—তিনি কি ওই কিচেন ক্যাবিনেটের সদস্য ছিলেন? জবাবে তিনি বলেন, কিচেন ক্যাবিনেট ছিল, কিন্তু তাঁকে সেখানে রাখা হয়নি।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির দায় এড়াতে বিএনপি এখন অন্তর্বর্তী সরকারকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। তাঁর ভাষায়, “আমরা মনে করি, সংসদ নির্বাচনের তিন দিন আগে এই চুক্তির পেছনে বিএনপি ছিল।” তিনি বলেন, বিএনপি তাদের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে ব্যবহার করে দায় অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর চাপাতে চাইছে।

আসিফ মাহমুদের বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জাতীয় নাগরিক পার্টি তৈরি হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের ছত্রছায়ায়। এখন সেই দলের মুখপাত্র যখন বিতর্কিত চুক্তি থেকে নিজেকে ও দলকে দূরে রাখছেন, তখন বিষয়টি আর শুধু আওয়ামী লীগপন্থী সমালোচনা বা ইউনূস প্রশাসনের বিরোধীদের অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন আগস্ট-পরবর্তী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যকার জবাবদিহির প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।

তৌহিদ হোসেনের দাবি: সাত সদস্যের বলয় সিদ্ধান্ত নিত

সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন আরও স্পষ্ট অভিযোগ করেছেন। ২৫ মে যমুনা টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের বড় সিদ্ধান্তগুলো কার্যত সাত সদস্যের একটি “কিচেন ক্যাবিনেট” নিয়ন্ত্রণ করত। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই অনানুষ্ঠানিক বলয় প্রতি মঙ্গলবার বৈঠক করত।

তৌহিদ হোসেন বলেন, প্রথমে তিনি এ ধরনের একটি কাঠামোবদ্ধ অনানুষ্ঠানিক গ্রুপের কথা জানতেন না, যদিও সরকারের ভেতরে এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা ছিল।

তৌহিদ আরও বলেন, কয়েকজন উপদেষ্টা তাঁর মন্ত্রণালয়ের ওপরও প্রভাব বিস্তার করতেন। তিনি তিনবার পদত্যাগের কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু তাঁকে থাকতে অনুরোধ করা হয়, কারণ তাঁর পদত্যাগ সরকারকে “গুরুতর অস্বস্তিতে” ফেলতে পারত।

যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য চুক্তি প্রসঙ্গেও তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে দায়মুক্ত করার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, বিষয়টি তাঁর দপ্তর নয়, বরং বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (খলিলুর রহমান) দেখেছেন।

কিন্তু এই বক্তব্য নিজেই নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য চুক্তির কূটনৈতিক প্রভাব থাকা স্বাভাবিক। এমন একটি চুক্তিতে যদি পররাষ্ট্র উপদেষ্টা কার্যকরভাবে যুক্ত না থাকেন, তাহলে স্বাভাবিক প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না?

সাখাওয়াত হোসেন: বড় সিদ্ধান্ত উপদেষ্টা পরিষদে হতো না

সাবেক উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন অন্তর্বর্তী সরকারের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া নিয়ে সবচেয়ে পরিষ্কার বক্তব্যগুলোর একটি দিয়েছেন। দায়িত্ব ছাড়ার পর চ্যানেল ওয়ানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বড় সিদ্ধান্তগুলো আনুষ্ঠানিক মন্ত্রিসভা বা উপদেষ্টা পরিষদে নেওয়া হতো না।

তিনি বলেন, “দুর্ভাগ্যজনকভাবে বড় সিদ্ধান্তগুলো মন্ত্রিসভায় নেওয়া হতো না। সেগুলো বাইরে আলোচনা হতো।”

তাঁকে যখন “কিচেন ক্যাবিনেট” সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়, তিনি বলেন, সেখানে কারা ছিলেন, তা তিনি জানেন না। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, “আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই, আমি সেখানে ছিলাম না।”

সাখাওয়াত আরও জানান, অন্তর্বর্তী প্রশাসনে যোগ দেওয়ার সাত-আট দিনের মধ্যেই তিনি পদত্যাগের কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু ইউনূস তাঁকে থাকতে বলেন, কারণ এত দ্রুত পদত্যাগ করলে ভুল বার্তা যেতে পারে।

আইনশৃঙ্খলা, অস্ত্র লুট, বিদেশি চাপ ও নীতি-নির্ধারণ নিয়ে তাঁর মন্তব্যগুলো এই ধারণাকে আরও জোরদার করেছে যে অন্তর্বর্তী সরকারের আনুষ্ঠানিক কাঠামো হয়তো প্রকৃত ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল না।

আসিফ নজরুল: যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি আলোচনায় ডাকেনি

সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি প্রক্রিয়ায় নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন। বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারের পর প্রকাশিত প্রতিবেদনে তিনি বলেন, বাংলাদেশ যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করে, তখন তাঁকে ডাকা হয়নি। কারণ বিষয়গুলো তাঁর দায়িত্বক্ষেত্র হিসেবে ধরা হয়নি।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশ যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করে, তখন আমাকে ডাকা হয়নি।” তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অর্থনীতি, ব্যাংকিং ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-সংক্রান্ত বিষয়ে ইউনূস কয়েকজন উপদেষ্টার সঙ্গে বসতেন।

এই বক্তব্য চুক্তির আইনগত পর্যালোচনা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। প্রশ্ন, আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং ছাড়া এমন চুক্তি কিভাবে হল? আন্তর্জাতিক চুক্তিতে যখন বাণিজ্য, বিনিয়োগ, নিয়ন্ত্রক ক্ষমতা, নিষেধাজ্ঞা সহযোগিতা এবং সার্বভৌম নীতিনির্ধারণের মতো বিষয় থাকে, তখন আইনগত বিশ্লেষণ জরুরি। যদি আইন উপদেষ্টাকে সেই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা না হয়ে থাকে, তাহলে আইনি পরীক্ষা ছাড়া চুক্তি স্বাক্ষর কীভাবে হল?

ফরিদা আখতার: আপত্তি ছিল, কিন্তু ঠেকাতে পারেননি

সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার কিছুটা ভিন্ন কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা করেছিল। তাঁর মতে, চুক্তিটি সংশোধন বা বাতিল করা সম্ভব।

১২ মে জাতীয় প্রেস ক্লাবে নয়াকৃষি আন্দোলন ও উবিনীগ আয়োজিত এক আলোচনায় তিনি বলেন, চুক্তিটি সংসদে উত্থাপন করা উচিত এবং জনগণের সম্মতির ভিত্তিতে তা বাস্তবায়ন করা উচিত। তিনি বলেন, “সবাইকে দাবি জানাতে হবে, এই চুক্তি সংসদে উপস্থাপন করা হোক।”

তবে একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, সরকারের ভেতর থেকেই তিনি চুক্তির কিছু অংশের বিরোধিতা করেছিলেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সস্তা মাংস, মুরগি ও অন্যান্য প্রাণিজ পণ্য আমদানির সম্ভাবনা নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর আশঙ্কা, এতে দেশের খামারি ও কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়েও তিনি সতর্ক করেছিলেন।

ফরিদা আখতারের অবস্থান অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরের একটি বড় দ্বন্দ্বকে সামনে আনে। কিছু উপদেষ্টা এখন বলছেন, তাঁরা আপত্তি করেছিলেন; কিন্তু সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত তাঁদের আপত্তি সত্ত্বেও বাস্তবায়িত হয়েছে।

অর্থনীতিবিদরাও চুক্তিটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম চুক্তিটিকে “অত্যন্ত বৈষম্যমূলক” বলেছেন। তিনি বলেছেন, কোনো সরকার এমন চুক্তিতে যেতে পারে—এতে তিনি “স্তম্ভিত ও বিস্মিত”।

আওয়ামী লীগ সরকার পতন ঘটিয়ে ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের অন্যতম নেতা অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ বলেছেন, চুক্তিটি বাংলাদেশের স্বার্থ বিরোধী এবং “যুক্তরাষ্ট্রকে আগে” রাখার নীতিতে তৈরি। তাঁর মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশকে একটি বিপজ্জনক অবস্থায় ঠেলে দেওয়া হয়েছে।

রাজনৈতিক বর্জনের বৃহত্তর প্রেক্ষাপট

সাবেক উপদেষ্টাদের বক্তব্যগুলোকে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের বাইরে দেখা যায় না। আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরোনো বড় রাজনৈতিক দল এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী দল, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। অন্তর্বর্তী সরকার দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে এবং নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত করে।

ব্যালটে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক না থাকায় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনের প্রধান শক্তি হিসেবে উঠে আসে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি বিপুল বিজয় পায় এবং জামায়াত ও তার মিত্ররা ৭৭টি আসন লাভ করে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দুর্বলতা দেখিয়েছে এবং প্রতিশ্রুত মানবাধিকার সংস্কার পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারেনি। সংস্থাটি আরও বলেছে, হাজারো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্বিচারে আটক করা হয়েছে, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, এবং আওয়ামী লীগের শত শত নেতা-কর্মীকে হত্যা মামলায় আটক রেখে বিচার ছাড়াই কারাগারে রাখা হয়েছে। তাঁদের অনেকের জামিন নিয়মিতভাবে নাকচ করা হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে সাবেক উপদেষ্টাদের দায় এড়ানোর বক্তব্য আরও গভীর অর্থ পায়। প্রশ্নটি শুধু কে একটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করল, বা কে সাপ্তাহিক কোনো বৈঠকে ছিল—তা নয়। মূল প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি একটি স্বচ্ছ প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক রূপান্তর সম্পন্ন করেছে, নাকি অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতাকেন্দ্র, নির্বাচনী বর্জন, রাজনৈতিক দমন এবং পরে দায় এড়ানোর সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়েছে?

সাবেক উপদেষ্টাদের সাম্প্রতিক বক্তব্য দেখাচ্ছে, আগস্ট-পরবর্তী রাজনৈতিক ব্যবস্থা এখন নিজের ভেতরের দ্বন্দ্বে ফেটে পড়ছে। যারা একসময় অন্তর্বর্তী সরকারকে সমর্থন করেছিলেন বা তার অংশ ছিলেন, তাঁরাই এখন বলছেন—তাঁদের পরামর্শ নেওয়া হয়নি, তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, তাঁরা দায়ী নন, অথবা তাঁরা সিদ্ধান্ত ঠেকানোর মতো ক্ষমতাবান ছিলেন না।

এতে ব্যক্তিগত সুনাম কিছুটা রক্ষা পেতে পারে। কিন্তু জাতীয় প্রশ্নের উত্তর মেলে না।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যখন দুর্বল ছিল, একটি প্রধান রাজনৈতিক দল নির্বাচনের বাইরে রাখা হয়েছিল, একটি ঐতিহাসিক জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ ধ্বংস হয়েছিল, এবং নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল—তখন আসলে দেশ চালাচ্ছিল কে?

বর্তমান বিএনপি সরকারের সামনে এখন কঠিন পরীক্ষা। তারা একদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের অস্বচ্ছ সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ার সমালোচনা করছে, অন্যদিকে সেই সরকারের করা কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্তের সুবিধাও রাখছে। এই দুই অবস্থান একসঙ্গে ধরে রাখা বাস্তবসম্মত কিনা তা বড় প্রশ্ন।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles