বাংলাদেশে ঢুকতে সীমান্তে জড়ো হয়েছে শত শত অভিবাসী

‘হোল্ডিং সেন্টার’ চালু ও প্রত্যর্পণ আতঙ্কে নারী-শিশুসহ শত শত মানুষ সীমান্তে অপেক্ষা করছেন দেশে ফেরার আশায়

ভারতে অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক তৎপরতা জোরদার হওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত এলাকায় নতুন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। রাজ্যজুড়ে ‘হোল্ডিং সেন্টার’ চালুর ঘোষণার পর উত্তর ২৪ পরগনার সীমান্ত এলাকায় বাংলাদেশে ফেরার উদ্দেশ্যে শত শত মানুষের ভিড় দেখা গেছে। নারী, শিশু ও ব্যাগপত্র নিয়ে সীমান্ত চেকপোস্টের সামনে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে বহু বাংলাদেশিকে।

মঙ্গলবার সকাল থেকে উত্তর ২৪ পরগনার স্বরূপনগরের হাকিমপুর সীমান্ত চেকপোস্টে অস্বাভাবিক ভিড় চোখে পড়ে। কেউ প্লাস্টিক পেতে বসে আছেন, কেউ আবার দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে সীমান্ত পার হওয়ার অপেক্ষা করছেন। স্থানীয় প্রশাসনিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, তাদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে ভারতে বৈধ কাগজপত্র ছাড়া বসবাস করছিলেন এবং সাম্প্রতিক প্রশাসনিক পদক্ষেপের পর আতঙ্কে দেশে ফিরতে চাইছেন।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ও প্রশাসনিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নতুন নির্দেশনায় প্রতিটি জেলায় ‘হোল্ডিং সেন্টার’ গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছে। এসব কেন্দ্রে বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা সন্দেহে আটক ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ ৩০ দিন পর্যন্ত রাখা যাবে। এই সময়ের মধ্যে তাদের পরিচয় ও নাগরিকত্ব যাচাই করা হবে। এরপর প্রয়োজন হলে বিএসএফের মাধ্যমে প্রত্যর্পণের ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

মালদা ও মুর্শিদাবাদে ইতোমধ্যে কয়েকটি হোল্ডিং সেন্টার চালু হয়েছে। প্রশাসনিক তথ্য অনুযায়ী, মালদার ইংরেজবাজারের চন্দনপার্কে তৈরি একটি কেন্দ্রে নয়জনকে রাখা হয়েছে। তাদের মধ্যে তিনজন নারী এবং ছয়জন শিশু ও কিশোর-কিশোরী রয়েছে। অন্যদিকে মুর্শিদাবাদের লালগোলায় আরেকটি কেন্দ্রে আরও কয়েকজনকে আটক রাখা হয়েছে।

সীমান্তে অপেক্ষমাণ ব্যক্তিদের অনেকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের কাছে স্বীকার করেছেন যে তারা দালালের সহায়তায় কাজের খোঁজে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন। পরে কলকাতা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিক, দোকানকর্মী কিংবা গৃহপরিচারিকার কাজ করতেন। কিন্তু ‘হোল্ডিং সেন্টার’ চালুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তারা দ্রুত বাংলাদেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন।

লাইনে দাঁড়ানো এক ব্যক্তি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “সরকার আর রাখবে না, কী করব বলুন। সরকার চাইছে আমরা দেশে ফিরে যাই।”

এই পরিস্থিতির পেছনে রাজনৈতিক বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে প্রচারণার সময় ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের “ডিটেক্ট, ডিলিট ও ডিপোর্ট” করার কথা বলেছিলেন। পরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক নেতারাও রাজ্যে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেন।

বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে এখন যে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, তা মূলত গত বছর ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারি করা নির্দেশিকার ধারাবাহিকতা। ওই নির্দেশনায় বিভিন্ন রাজ্যকে সন্দেহভাজন অবৈধ বিদেশি নাগরিকদের শনাক্ত ও প্রত্যর্পণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। এর আগে গুজরাট, মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা, দিল্লি ও ওড়িশাসহ বিভিন্ন রাজ্যে একই ধরনের অভিযান চালানো হয়।

তবে এসব অভিযান নিয়ে মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে উদ্বেগও রয়েছে। কারণ, আগের বিভিন্ন অভিযানে বহু প্রকৃত ভারতীয় নাগরিকও ‘বাংলাদেশি সন্দেহে’ আটক হয়েছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। বিশেষ করে বাংলাভাষী মুসলিম শ্রমজীবী মানুষেরা হয়রানির শিকার হন বলে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন দাবি করেছে।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নির্দেশনায় হোল্ডিং সেন্টারগুলোর অবকাঠামো সম্পর্কেও বিস্তারিত বলা হয়েছে। নারী ও পুরুষদের জন্য আলাদা কক্ষ, শৌচাগার, খাবার, চিকিৎসা, বিদ্যুৎ, সিসিটিভি নজরদারি এবং পুলিশ ও সিভিল ডিফেন্স মোতায়েনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ভারতের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, অবৈধভাবে দেশে প্রবেশ বা বসবাসের অভিযোগে বিদেশি নাগরিকদের আটক করে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করার কথা। তবে সাম্প্রতিক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, রাজ্য প্রশাসনকে নিজ উদ্যোগে সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করতে হবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। যদি ওই সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট রাজ্য পুলিশের প্রতিবেদন না আসে, তাহলে ফরেনার্স রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার বা এফআরআরও প্রত্যর্পণের ব্যবস্থা নিতে পারবেন।

এদিকে সীমান্তে অবস্থানরত ব্যক্তিদের বিষয়ে বিএসএফ বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক কোনো বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে অভিবাসন, নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তা ইস্যু দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নতুন করে মানবাধিকার, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক বক্তব্যের প্রভাব নিয়ে আলোচনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে যেসব মানুষ বছরের পর বছর ভারতে অনিয়মিতভাবে কাজ করছিলেন, তাদের অনেকেই এখন অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে পড়েছেন।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles