যমুনা সেতুর কাছে ট্রাক উল্টে নিহত ১৫, ঈদযাত্রায় শোক

লোহার রডবোঝাই ট্রাকে বাড়ি ফিরছিলেন হকার ও শ্রমজীবীরা; ভোরের দুর্ঘটনায় টাঙ্গাইলে প্রাণহানি, আহত অনেকে

সকাল তখনও পুরোপুরি নামেনি। ঈদকে সামনে রেখে বাড়ি ফেরার তাড়ায় উত্তরবঙ্গমুখী মহাসড়কে ছুটছিল একটি ট্রাক। ট্রাকটির পেছনে বোঝাই ছিল লোহার রড, আর তার ওপর গাদাগাদি করে বসেছিলেন কয়েক ডজন শ্রমজীবী মানুষ। কেউ ফেরি করে প্লাস্টিকের পণ্য বিক্রি করেন, কেউ দিনমজুর। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পরিবারের সঙ্গে ঈদ কাটানোর আশায় তারা ফিরছিলেন বাড়ি। কিন্তু টাঙ্গাইলের যমুনা সেতুর পূর্বপ্রান্তে পৌঁছানোর আগেই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় থেমে যায় তাদের যাত্রা।

সোমবার ভোরে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার সরাতৈল দক্ষিণপাড়া এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে লোহার রডবোঝাই একটি ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাশের খাদে উল্টে পড়ে। এতে অন্তত ১৫ জন নিহত হন এবং আহত হন আরও অন্তত ৯ থেকে ১০ জন।

পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, নিহতদের বেশিরভাগই ছিলেন ভ্রাম্যমাণ হকার ও দিনমজুর। তারা নোয়াখালীর চৌমুহনী এলাকায় প্লাস্টিক সামগ্রীর ব্যবসা বা ফেরির কাজ করতেন। ঈদুল আজহার ছুটি উপলক্ষে তারা ফেনী ও চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় ফিরছিলেন।

টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার মুহাম্মদ শামসুল আলম সরকার ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের বলেন, “নিহতদের অধিকাংশই প্লাস্টিক পণ্যের হকার। তারা ফেনী ও চট্টগ্রাম থেকে ট্রাকে উঠে নিজ নিজ এলাকায় ফিরছিলেন ঈদ করার জন্য।”

তিনি জানান, ট্রাকটি চাপাইনবাবগঞ্জের দিকে যাচ্ছিল। যমুনা সেতুর পূর্বপ্রান্তে পৌঁছানোর পর চালক নিয়ন্ত্রণ হারালে সেটি সড়কের পাশের খাদে পড়ে যায়।

দুর্ঘটনার ভয়াবহতা প্রথমে পুরোপুরি বোঝা যায়নি। ভোর ৪টা ৫ মিনিটের দিকে খবর পেয়ে এলেঙ্গা ফায়ার সার্ভিসের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।

এলেঙ্গা ফায়ার সার্ভিসের ইনচার্জ আতাউর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রথমে চারটি মরদেহ পাই এবং কয়েকজন আহতকে জীবিত উদ্ধার করি। পরে পুলিশ রেকার দিয়ে ট্রাকটি তোলার পর আরও ১১টি মরদেহ লোহার রডের নিচে চাপা অবস্থায় পাওয়া যায়।”

উদ্ধারকাজে স্থানীয় লোকজনও অংশ নেন। প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে লোহার রড সরিয়ে হতাহতদের বের করে আনা হয়। উদ্ধার হওয়া আহতদের দ্রুত টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়।

টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. সাদিকুর রহমান জানান, আহত সবাইকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, তবে কয়েকজন এখনও চিকিৎসাধীন।

দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে অন্তত ছয়জনের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে। তারা হলেন—নওগাঁর মান্দা উপজেলার রাজেন্দ্রবাড়ির সাগর মিয়া (২০) ও রবিউল ইসলাম (২৫), নওগাঁর নিয়ামতপুরের সারিকুল (২৫), রাজশাহীর তানোর উপজেলার ইসমাইল হোসেন (১৯), চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার নজরুল ইসলাম (৬০) এবং একই জেলার মামুন (৪৫)।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহতদের একজন আলমগীর হোসেন দুর্ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, “আমরা ১৭-১৮ জন একসঙ্গে ট্রাকে উঠেছিলাম। গাড়ি খুব দ্রুত যাচ্ছিল। কয়েকজন চালককে ধীরে চালাতে বলেছিল। কিন্তু যমুনা সেতুর কাছে আসতেই হঠাৎ জোরে ব্রেক করে গাড়িটা খাদে পড়ে যায়।”

তিনি আরও বলেন, দুর্ঘটনার পর দীর্ঘ সময় তারা আটকা পড়ে ছিলেন। পরে ফায়ার সার্ভিস এসে উদ্ধার করে।

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের যমুনা সেতু সাইট অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ রিয়াজ উদ্দিন জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে চালক ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ফলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ট্রাকটি উল্টে যায়।

দুর্ঘটনার কারণে ভোর থেকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। উদ্ধার অভিযান চলাকালে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। পরে সকাল নাগাদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয় বলে জানান এলেঙ্গা হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শরীফ।

ঈদের আগে বাংলাদেশে এ ধরনের দুর্ঘটনা নতুন নয়। প্রতি বছর ঈদযাত্রার সময় অতিরিক্ত যাত্রী বহন, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, চালকদের ক্লান্তি এবং ট্রাফিক আইন অমান্যের কারণে প্রাণহানির ঘটনা বেড়ে যায়। বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষ কম খরচে যাতায়াতের জন্য পণ্যবাহী ট্রাক বা কাভার্ডভ্যানে যাতায়াত করতে বাধ্য হন, যা প্রায়ই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, মহাসড়কে পণ্যবাহী যানবাহনে যাত্রী পরিবহন পুরোপুরি বন্ধ না করলে এ ধরনের দুর্ঘটনা কমানো কঠিন হবে। একইসঙ্গে চালকদের কর্মঘণ্টা নিয়ন্ত্রণ, বিশ্রামের বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা, যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা এবং মহাসড়কে নজরদারি বাড়ানোর ওপরও জোর দিচ্ছেন তারা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। অনিয়ন্ত্রিত গতি, দুর্বল আইন প্রয়োগ, অদক্ষ চালক এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবহন ব্যবস্থাকে এসব দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

যমুনা সেতুর পূর্বপ্রান্তের সোমবারের এই দুর্ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা এখনও কতটা অনিরাপদ। পরিবারের সঙ্গে উৎসব উদযাপনের স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করা অন্তত ১৫ জন মানুষের জীবন শেষ হয়ে গেল মহাসড়কের পাশে লোহার রডের নিচে চাপা পড়ে।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles