ছেলে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট, এজন্য এক বৃদ্ধ পিতাকে গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার চরমোন্তাজ ইউনিয়নের বাসিন্দা আবদুল মালেক হাওলাদারের উপর এই নির্যাতন করা হয়েছে বলে এলাকাবাসী জানিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্যাতনের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর শুরু হয়েছে ব্যাপক সমালোচনা। ফলে এলাকায় ক্ষোভ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জেরেই প্রকাশ্যে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ অনুযায়ী, ভুক্তভোগী ব্যক্তির ছেলে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে তাকে বাড়ি থেকে জোর করে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে সারাদিন শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছে, চরমোন্তাজ ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নজরুল মুন্সীর নেতৃত্বে এবং ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি কামালের উপস্থিতিতে এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয়রা দাবি করেন, নির্যাতনের পুরো সময়জুড়ে ভুক্তভোগী ব্যক্তি অসহায় অবস্থায় ছিলেন এবং আশপাশের মানুষ আতঙ্কে কেউ প্রকাশ্যে বাধা দেওয়ার সাহস পাননি।
স্থানীয় রবিউল ইসলাম বলেন, “লোকটাকে সকাল থেকে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছিল। অনেকে কান্নাকাটি করেছে, অনুরোধ করেছে, কিন্তু কেউ কথা শোনেনি। শুধু ছেলের রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে একজন বৃদ্ধ মানুষকে এভাবে অপমান করা হয়েছে।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “তিনি নিজে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় নন। কিন্তু তার ছেলে ছাত্রলীগ করায় পুরো পরিবারকে টার্গেট করা হচ্ছে। এখন সাধারণ মানুষও ভয়ে আছে—কাকে কখন কী অভিযোগে তুলে নিয়ে যায় কেউ জানে না।”
ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়তে থাকে। ভিডিওতে দেখা যায়, ভুক্তভোগী ব্যক্তি একটি গাছের সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় রয়েছেন এবং আশপাশে কয়েকজন লোক অবস্থান করছেন। যদিও ভিডিওটির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবে স্থানীয়রা দাবি করেছেন ভিডিওটি ওই ঘটনারই।
এ ঘটনায় অভিযুক্ত ইউনিয়ন বিএনপি সভাপতি নজরুল মুন্সী ও ওয়ার্ড বিএনপি সভাপতি কামালের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানিয়েছেন, ঘটনার পর অভিযুক্তদের অনেকে প্রকাশ্যে এলাকায় দেখা যাচ্ছেন না।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় প্রশাসনের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে বলে জানা গেছে। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়েছে কি না বা কাউকে আটক করা হয়েছে কি না—সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে এভাবে একজন নিরীহ মানুষকে প্রকাশ্যে শাস্তি দেওয়া কোনো সভ্য সমাজের চিত্র হতে পারে না। তারা ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত দাবি করেছেন।
একজন শিক্ষক নেতা বলেন, “রাজনৈতিক প্রতিহিংসা যদি পরিবার পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তাহলে সমাজে নিরাপত্তাবোধ বলে কিছু থাকবে না। এটা শুধু একজন মানুষের ওপর নির্যাতন নয়, পুরো সমাজের জন্য ভয়াবহ বার্তা।”
বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক সহিংসতা ও প্রতিশোধমূলক হামলার অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও তাদের সমর্থকদের বিরুদ্ধে হামলা, হয়রানি, মারধর এবং সামাজিকভাবে অপদস্থ করার বহু অভিযোগ ওঠে।
অধিকারকর্মী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, রাজনৈতিক বিভাজন যত গভীর হচ্ছে, ততই সাধারণ মানুষ সংঘাতের শিকার হচ্ছেন। বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে ভয়ভীতি, হামলা ও প্রতিশোধমূলক আচরণের প্রবণতা বাড়ছে বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, চরমোন্তাজের ঘটনাটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন নির্যাতনের ঘটনা নয়; এটি গ্রামীণ জনপদে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতারও একটি প্রতিচ্ছবি। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা না নিলে এ ধরনের ঘটনা আরও বাড়তে পারে।
এলাকার সাধারণ মানুষ প্রশাসনের প্রতি জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একইসঙ্গে তারা দাবি করেছেন, রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, কোনো নাগরিক যেন আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কাউকে এভাবে প্রকাশ্যে নির্যাতন করতে না পারে—সেটি নিশ্চিত করতে হবে রাষ্ট্রকেই।

