যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কাঠামোতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যখন একের পর এক পদত্যাগ করেছেন জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ড এবং জ্যেষ্ঠ গোয়েন্দা কর্মকর্তা অ্যামারিলিস ফক্স কেনেডি।
এই ধারাবাহিক পদত্যাগ হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, ইরান নীতি নিয়ে মতপার্থক্য এবং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে তুলসি গ্যাবার্ডের পদত্যাগ
তুলসি গ্যাবার্ড ঘোষণা দেন, তিনি আগামী ৩০ জুন থেকে দায়িত্ব ছাড়বেন। তিনি জানান, তার স্বামী আব্রাহাম উইলিয়ামস গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ায় তিনি পরিবারকে সময় দিতে চান।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে “আমেরিকা ফার্স্ট প্যাট্রিয়ট” বলে প্রশংসা করেন এবং তার কাজের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান।
তবে একাধিক মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, পদত্যাগের পেছনে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত কারণ নয়। প্রশাসনের ভেতরের সূত্রের বরাতে বলা হয়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তুলসি গ্যাবার্ডের প্রভাব হোয়াইট হাউসে কমে যাচ্ছিল এবং গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী বৈঠকগুলোতে তাকে অনেক সময়ই বাদ দেওয়া হতো।
১৫ মাসের মেয়াদে বিতর্ক ও বিচ্ছিন্নতা
১৫ মাসের দায়িত্বকালজুড়ে তুলসি গ্যাবার্ড প্রশাসনের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগে সক্রিয় ছিলেন—বিশেষ করে নির্বাচন-সংক্রান্ত তদন্ত এবং বিভিন্ন গোপন নথি প্রকাশের উদ্যোগে।
তবে ইরান ও ভেনেজুয়েলা সম্পর্কিত বড় নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো থেকে তাকে দূরে রাখা হয় বলে জানা গেছে। তার দীর্ঘদিনের যুদ্ধবিরোধী অবস্থান প্রশাসনের কঠোর নীতি-সমর্থকদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব তৈরি করে।
হিরোশিমা ভিডিও ঘিরে উত্তেজনা
হিরোশিমা সফরের পর প্রকাশিত একটি ভিডিওতে তুলসি গ্যাবার্ড সতর্ক করেন, বিশ্ব “পারমাণবিক ধ্বংসের খুব কাছাকাছি” চলে এসেছে।
এই বক্তব্য প্রশাসনের একাংশকে ক্ষুব্ধ করে তোলে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশেষ করে যখন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা চলছিল।
অ্যামারিলিস ফক্স কেনেডির পদত্যাগ
তুলসি গ্যাবার্ডের পদত্যাগের কয়েকদিন আগেই পদত্যাগ করেন সাবেক সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি আন্ডারকভার কর্মকর্তা ও গ্যাবার্ডের ঘনিষ্ঠ সহযোগী অ্যামারিলিস ফক্স কেনেডি।
তিনি একাধিক দায়িত্বে ছিলেন—জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক দপ্তর, অফিস অব ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড বাজেট এবং প্রেসিডেন্টের ইন্টেলিজেন্স অ্যাডভাইজরি বোর্ডে।
আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি পরিবারকে সময় দেওয়া এবং বেসরকারি খাতে ফেরার কথা বলেছেন। তবে ওয়াশিংটন পোস্ট-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান নীতি নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে তার মতপার্থক্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে।
ইরান নীতি এখন কেন্দ্রীয় বিতর্ক
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ইস্যুই এই দুই পদত্যাগের অন্যতম প্রধান কারণ।
তুলসি গ্যাবার্ড দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের সমালোচক এবং “অন্তহীন যুদ্ধ” নীতির বিরোধী হিসেবে পরিচিত। প্রশাসনের ভেতরে ইরান নিয়ে কঠোর অবস্থানের সঙ্গে তার মতবিরোধ তৈরি হয়।
গোয়েন্দা কাঠামোয় বিতর্ক ও ফাঁসের অভিযোগ
তুলসি গ্যাবার্ডের নেতৃত্বে জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক দপ্তর একাধিক বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে রয়েছে:
* ২০২০ সালের নির্বাচন-সংক্রান্ত তদন্ত
* জর্জিয়া ও পুয়ের্তো রিকোর ভোট বিশ্লেষণ
* জন এফ কেনেডি, রবার্ট এফ কেনেডি এবং মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত নথি প্রকাশ
এক পর্যায়ে গোপন নথি প্রকাশ প্রক্রিয়ায় ভুলবশত সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য (যেমন সামাজিক নিরাপত্তা নম্বর) ফাঁস হয়ে যায় বলে অভিযোগ ওঠে।
নেতৃত্ব পরিবর্তন ও ভবিষ্যৎ প্রভাব
তুলসি গ্যাবার্ডের পদত্যাগের পর সাবেক সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি কর্মকর্তা অ্যারন লুকাস-কে অস্থায়ী জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। স্থায়ী পদে মাইকেল এলিস-এর নাম আলোচনায় রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তনের ফলে প্রশাসনে জন র্যাটক্লিফ-এর প্রভাব আরও বাড়তে পারে এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন আরও তীব্র হতে পারে।
প্রশাসনে আরও পদত্যাগের ঢেউ
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আরও কয়েকজন শীর্ষ নারী কর্মকর্তা—পাম বন্ডি, ক্রিস্টি নোম এবং লরি শ্যাভেজ-ডেরেমার—পদত্যাগ করেছেন বা দায়িত্ব হারিয়েছেন।
ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তুলসি গ্যাবার্ড ও অ্যামারিলিস ফক্স কেনেডির একযোগে পদত্যাগ শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়—বরং এটি মার্কিন গোয়েন্দা কাঠামোর ভেতরে গভীর বিভাজন, ইরান নীতি নিয়ে মতবিরোধ এবং ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত।

