জামিন পেয়েও মুক্তি মিলল না সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের

নতুন হত্যা মামলায় আবার গ্রেপ্তার দেখানো হলো সাবেক প্রধান বিচারপতিকে; বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও আইনের শাসন নিয়ে নতুন বিতর্ক

পৃথক সাতটি মামলায় জামিন পাওয়ার পরও মুক্তি দেওয়া হয়নি সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে। এবার তাকে নতুন করে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানার একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়েছে আদালত। এ ঘটনায় দেশের বিচার ব্যবস্থা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং “শোন অ্যারেস্ট” প্রক্রিয়ার অপব্যবহার নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

শনিবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সারাহ্ ফারজানা হকের আদালত এ আদেশ দেন। এর ফলে সাবেক এই প্রধান বিচারপতির কারামুক্তি আবারও আটকে গেল বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবীরা।

৮২ বছর বয়সী খায়রুল হক ২০০৯ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ১৯তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি আইন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। গত বছরের জুলাই মাসে রাজধানীর ধানমন্ডির বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এরপর থেকে একের পর এক বিভিন্ন মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে।

বিশেষ করে ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সহিংসতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার ঘটনায় দায়ের হওয়া একাধিক মামলায় তাকে জড়ানো হয়েছে।

একই ব্যক্তি একই সময়ে দুই জায়গায় থাকতে পারেন না।

শনিবারের আদালত কার্যক্রম বিশেষভাবে আলোচনায় আসে, কারণ কয়েকদিন আগেই হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন—সুনির্দিষ্ট মামলা ছাড়া খায়রুল হককে নতুন কোনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো যাবে না। বিচারপতি রাজিক-আল-জলিল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর হাইকোর্ট বেঞ্চ আগের কয়েকটি গ্রেপ্তার দেখানোর বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

আদালত সূত্র ও গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল ১১টার দিকে খায়রুল হককে হুইলচেয়ারে করে আদালতে আনা হয়। এ সময় তার হাতে হাতকড়া, গায়ে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট এবং মাথায় হেলমেট ছিল। পরে আদালতকক্ষে কিছু নিরাপত্তা সরঞ্জাম খুলে নেয় পুলিশ। পুরো শুনানি চলাকালে তিনি নীরব ছিলেন।

রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি ওমর ফারুক ফারুকী আদালতে দাবি করেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার “কর্তৃত্ববাদী শাসন” প্রতিষ্ঠায় খায়রুল হক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি বলেন, “শেখ হাসিনাকে কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠতে আইনিভাবে সহযোগিতা করেছেন খায়রুল হক।”

রাষ্ট্রপক্ষ আরও দাবি করে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যাত্রাবাড়ীতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় খোয়াইব নামে এক আন্দোলনকারী নিহত হওয়ার ঘটনায় তদন্তে খায়রুল হকের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে।

আদালতে ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, “ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থেকেও অনলাইনে, জুম মিটিংয়ে বা বার্তার মাধ্যমে নির্দেশ দেওয়া সম্ভব। এই মামলায় তেমন সংশ্লিষ্টতার তথ্য তদন্ত কর্মকর্তা পেয়েছেন।”

তবে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও আইনগতভাবে অসঙ্গত বলে দাবি করেন।

খায়রুল হকের আইনজীবী মোস্তাফিজুর রহমান আদালতে বলেন, একই সময়ে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত পৃথক ঘটনায় তার মক্কেলকে জড়ানো হচ্ছে, যা বাস্তবসম্মত নয়।

তিনি বলেন, “একই ব্যক্তি একই সময়ে দুই জায়গায় থাকতে পারেন না।” পাশাপাশি তিনি খায়রুল হকের বয়স ও শারীরিক অবস্থার বিষয়টিও আদালতের সামনে তুলে ধরেন।

শুনানি শেষে আরেক আইনজীবী মোনায়েম নবী শাহিন সাংবাদিকদের বলেন, “আজকের এই আদেশ আদালত অবমাননার শামিল। হাইকোর্ট আগেই নির্দেশ দিয়েছিলেন, সুনির্দিষ্ট মামলা ছাড়া খায়রুল হককে গ্রেপ্তার দেখানো যাবে না। কিন্তু সেই নির্দেশ অমান্য করে তাকে অষ্টম মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হলো।”

মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সকালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিতে যাত্রাবাড়ী পদচারী সেতুর নিচে জড়ো হন আন্দোলনকারীরা। পরে মিছিল নিয়ে তারা যাত্রাবাড়ী মোড়ের দিকে অগ্রসর হলে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। এতে খোয়াইব গুরুতর আহত হন। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

নিহত খোয়াইবের ভাই জোবায়ের আহম্মেদ ওই ঘটনায় ২০২৪ সালের ১৬ নভেম্বর যাত্রাবাড়ী থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় শেখ হাসিনাসহ ৮০ জনকে আসামি করা হয়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশে বড় ধরনের রাজনৈতিক পালাবদল ঘটে। পরবর্তী সময়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসন দায়িত্ব নেয়। পরে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারেনি। একইসঙ্গে জামায়াতে ইসলামী জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়।

এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশজুড়ে সহিংসতা, প্রতিশোধমূলক হামলা এবং রাজনৈতিক হয়রানির নানা অভিযোগ সামনে আসে।

আওয়ামী লীগ সমর্থক, মানবাধিকারকর্মী এবং বিভিন্ন পর্যবেক্ষকের অভিযোগ, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বিচারক, সাংবাদিক, শিক্ষক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা করা হচ্ছে।

বিশেষ করে “শোন অ্যারেস্ট” প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আইনজীবী ও মানবাধিকার বিশ্লেষকদের মতে, একটি মামলায় জামিন পাওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর মাধ্যমে কার্যত আদালতের জামিন আদেশকে অকার্যকর করে দেওয়া হচ্ছে।

হাইকোর্টও সম্প্রতি প্রশ্ন তুলেছেন, খায়রুল হকের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া “অবৈধ, খামখেয়ালি ও অসৎ উদ্দেশ্যে হয়রানি” হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না।

সাবেক প্রধান বিচারপতির এই মামলা এখন বাংলাদেশের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রশ্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

দেশের আইন ও রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, খায়রুল হকের বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলো কেবল একজন সাবেক প্রধান বিচারপতির বিচার নয়; বরং এটি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং বিচার ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles