ঢাকায় বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রথমবারের মতো সামরিক বিমানবাহিনীর উচ্চপর্যায়ের সংলাপ শুরু হওয়াকে ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ও নিরাপত্তা অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তদন্ত ও গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশের পর এই সফরকে ঘিরে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
ভারতীয় সংবাদ সংস্থা আইএএনএস এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণধর্মী গণমাধ্যম ‘নর্থইস্ট নিউজ’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তান বিমানবাহিনীর পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ১০ মে ঢাকায় পৌঁছায়। দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন পাকিস্তান বিমানবাহিনীর এয়ার ভাইস মার্শাল আওরঙ্গজেব আহমেদ। সফরটি পাঁচ দিনের এবং এই সময় দুই দেশের মধ্যে প্রথমবারের মতো ‘প্রথম বিমানবাহিনী স্টাফ সংলাপ’ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর মাত্র দুই সপ্তাহ আগে বাংলাদেশজুড়ে, বিশেষ করে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর তিনটি ঘাঁটি ও স্থাপনায় ব্যাপক অভিযান চালানো হয়। ওই অভিযানে অন্তত দুইজন স্কোয়াড্রন লিডার এবং কয়েকজন জুনিয়র সামরিক কর্মকর্তাকে আটক করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়েছে।
নর্থইস্ট নিউজের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আরও কয়েকজন বিমানবাহিনীর সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছিল এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সামরিক আদালতে বিচার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। যদিও বাংলাদেশ বিমানবাহিনী এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য দেয়নি।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই পাকিস্তানি সামরিক প্রতিনিধিদলের ঢাকা সফরকে ঘিরে ভারতের প্রতিরক্ষা মহলে বাড়তি নজরদারি শুরু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঢাকার সঙ্গে ইসলামাবাদের সম্পর্ক দ্রুত ঘনিষ্ঠ হওয়ার বিষয়টি দিল্লির কৌশলগত বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে সেনা ও ইসলামপন্থী গোষ্ঠী-সমর্থিত অন্তর্বর্তী প্রশাসন ক্ষমতায় আসে। নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস সেই প্রশাসনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। এরপর থেকেই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাকিস্তানের গোয়েন্দা ও কৌশলগত প্রভাব বাড়ছে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়।
বাংলাদেশি পত্রিকা ‘ব্লিটজ’-এর সম্পাদক সালাহ উদ্দিন শোয়েব চৌধুরী এ বিষয়ে প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, পাকিস্তানি প্রতিনিধিদলের সফরকে সাধারণ সামরিক কূটনীতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তিনি লিখেছেন, “এই সফরকে উদ্বেগজনক করে তুলেছে সফরকারী কর্মকর্তার পরিচয়। এয়ার ভাইস মার্শাল আহমেদ শুধু একজন নিয়মিত সামরিক কর্মকর্তা নন। তিনি বর্তমানে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর জনসংযোগ বিভাগের মহাপরিচালক, বিমান অপারেশন শাখার উপপ্রধান এবং কৌশলগত বিমান কমান্ডের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।”
চৌধুরী আরও বলেন, “ভারতের ‘অপারেশন সিন্দুর’-এর সময় এবং পরে পাকিস্তানের ভারতবিরোধী সামরিক প্রচারণার অন্যতম মুখ ছিলেন তিনি। ফলে তার ঢাকা সফরকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা যাবে না কিংবা এটিকে নিছক আনুষ্ঠানিক সফর বলেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।”
ভারতের সঙ্গে ২০২৫ সালে পাকিস্তানের সামরিক উত্তেজনার সময় ‘অপারেশন সিন্দুর’ ঘিরে দুই দেশের মধ্যে ব্যাপক তথ্যযুদ্ধ ও প্রচারণা চালানো হয়। সে সময় পাকিস্তান বিমানবাহিনীর মুখপাত্র হিসেবে এয়ার ভাইস মার্শাল আহমেদের ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছিল।
সালাহ উদ্দিন শোয়েব চৌধুরী আরও দাবি করেন, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশে তাদের তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব তৎপরতার মধ্যে রয়েছে ভারতবিরোধী প্রচারণা কাঠামো সম্প্রসারণ, লস্কর-ই-তইয়েবা এবং জইশ-ই-মোহাম্মদের মতো জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপারেটিভদের সহায়তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমন্বিত ভুয়া প্রচারণা নেটওয়ার্ক পরিচালনা এবং বাংলাদেশে পাকিস্তানপন্থী ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে আরও সুসংগঠিত করার চেষ্টা।
এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি আরও লেখেন, “ভারতের উদ্বেগ কেবল ঢাকা-ইসলামাবাদের সামরিক সহযোগিতা নিয়ে নয়। বরং বড় প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশকে কি ধীরে ধীরে ভারতের পূর্বাঞ্চলের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের দীর্ঘমেয়াদি অসম কৌশলগত পরিকল্পনার একটি ঘাঁটিতে পরিণত করা হচ্ছে?”
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতার কারণে দীর্ঘদিন বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল। শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সহযোগিতা গড়ে ওঠে এবং জঙ্গিবাদ দমনে দুই দেশের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানও জোরদার হয়।
তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করেছে বলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষক মনে করছেন। বিশেষ করে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস এবং পাকিস্তানের সঙ্গে বাড়তে থাকা যোগাযোগকে ঘিরে নতুন কৌশলগত সমীকরণের ইঙ্গিত দেখছেন অনেকে।
মানবাধিকার সংগঠন ও আওয়ামী লীগ-সমর্থক মহল অভিযোগ করেছে, অন্তর্বর্তী প্রশাসনের সময় দেশে ধর্মনিরপেক্ষ ও ভারতঘনিষ্ঠ শক্তিগুলোকে কোণঠাসা করা হয়েছে। একই সঙ্গে সাংবাদিক, শিক্ষক, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও বিরোধী মতের ব্যক্তিদের ওপর হামলা, গ্রেপ্তার এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগও উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
এমন এক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সামরিক যোগাযোগ বৃদ্ধি আঞ্চলিক নিরাপত্তা রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশেষ করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তকে ঘিরে দিল্লির দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।
তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, বাংলাদেশ বা পাকিস্তান—কোনো দেশই এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে এসব অভিযোগ স্বীকার করেনি। ফলে গোয়েন্দা তৎপরতা, জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা কিংবা কৌশলগত উদ্দেশ্য নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তার অনেকাংশই এখনও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
তারপরও বিমানবাহিনীতে কথিত তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ, পাকিস্তানি সামরিক প্রতিনিধিদলের উচ্চপর্যায়ের সফর এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তন—সব মিলিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ ও জল্পনা তৈরি হয়েছে।

