প্রবীণ রাজনীতিক ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন আর নেই

মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, সংবিধান প্রণেতা ও সাতবারের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন শেখ হাসিনা; তার মৃত্যুতে “একটি রাজনৈতিক যুগের অবসান” হয়েছে বলে মন্তব্য সাবেক প্রধানমন্ত্রীর।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এবং প্রবীণ রাজনীতিক ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন আর নেই। বুধবার সকালে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।

তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক শোকবার্তায় তিনি ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের মৃত্যুতে “রাজনীতির একটি যুগের অবসান” হয়েছে বলে উল্লেখ করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, “প্রবীণ রাজনীতিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের মৃত্যুতে রাজনীতির একটি যুগের অবসান হলো।”

ভারতে অবস্থানরত সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী তার শোকবার্তায় বলেন, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ ছিলেন জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান-এর ঘনিষ্ঠ সহচর এবং তিনি সারাজীবন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি অবিচল ছিলেন। তিনি চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ভিত শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন বলেও উল্লেখ করেন।

শেখ হাসিনা তার বার্তায় আরও অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনকে “মিথ্যা মামলায়” কারাবন্দি করা হয়েছিল এবং বয়সজনিত নানা জটিলতা থাকা সত্ত্বেও তাকে যথাযথ চিকিৎসা ও মানবিক সহায়তা দেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, “যে মানুষ মহান মুক্তিযুদ্ধে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছিলেন এবং গত ৫৪ বছর রাজনীতি ও জনসেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন, জীবনের সবচেয়ে দুর্বল সময়ে তাকেই মানবিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।”

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন। পরবর্তীতে সেনাসমর্থিত ও ইসলামপন্থী শক্তির সমর্থনপুষ্ট অন্তর্বর্তী প্রশাসনের অধীনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আমূল পরিবর্তিত হয়। এরপর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে অংশগ্রহণ করতে না দিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি ক্ষমতায় আসে এবং জামায়াতে ইসলামী প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার এবং রাজনৈতিক হয়রানির অভিযোগ এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে উঠে আসছে।

ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনীতির অন্যতম পরিচিত মুখ। ১৯৪৩ সালের ১২ জানুয়ারি চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ধুম গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বাবা এস ডব্লিউ হোসেন ছিলেন স্থানীয়ভাবে পরিচিত ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক।

স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি পাকিস্তানের লাহোর ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজিতে ভর্তি হন এবং ১৯৬৬ সালে মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। সেখান থেকেই তার নামের সঙ্গে “ইঞ্জিনিয়ার” উপাধিটি স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়।

ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৭০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রতিরোধ সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি সেক্টর-১-এর অধীনে সাব-সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং কুমিল্লা-চট্টগ্রাম যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে শুভপুর সেতু উড়িয়ে দেওয়ার অভিযানে অংশ নেন।

স্বাধীনতার পর তিনি টানা কয়েক দশক আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসন থেকে সাতবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তুলতে এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলে দলকে সুসংগঠিত করতে তার অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের ছেলে ও সাবেক সংসদ সদস্য মাহবুব রহমান রুহেল জানান, দীর্ঘদিন ধরে তার বাবা নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন এবং কয়েকদিন ধরে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

পারিবারিক সূত্র জানায়, বুধবার আসরের নামাজের পর রাজধানীর গুলশান আজাদ মসজিদে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। বৃহস্পতিবার সকালে চট্টগ্রামের জামেয়াতুল ফালাহ মসজিদে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। পরে মিরসরাইয়ের মহাজনহাট স্কুল মাঠে তৃতীয় জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হবে।

ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের মৃত্যুতে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা শোক জানিয়েছেন। অনেকেই তাকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী, অভিজ্ঞ এবং সংগঠকসুলভ রাজনীতিক হিসেবে স্মরণ করেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর রাজনীতির যে প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ, সংবিধান রচনা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ছিলেন সেই প্রজন্মের অন্যতম প্রতিনিধিত্বশীল নেতা। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles