বরগুনা জেলা পরিষদের ডাকবাংলোয় হিন্দু সম্প্রদায়ের এক নারী ও তাঁর দুই কন্যা সন্তানের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা ঘিরে ক্রমেই বাড়ছে ধোঁয়াশা। পরিবারের সদস্যরা এটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করলেও প্রশাসন তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চায় না। এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আংশিক সিসিটিভি ফুটেজ নতুন করে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
গত ৩ জুন বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে বরগুনা জেলা পরিষদের ডাকবাংলোর দুটি পৃথক কক্ষ থেকে ইতি রাণী এবং তাঁর দুই কন্যা অধরা বিশ্বাস ও অনুরাধা বিশ্বাসের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতরা বরগুনা পৌর শহরের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কালীবাড়ি এলাকার বাসিন্দা এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্য ছিলেন।
ঘটনার পর থেকেই স্থানীয় বাসিন্দা, স্বজন এবং মানবাধিকারকর্মীদের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন—এটি কি কেবল পারিবারিক ট্র্যাজেডি, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে? যদিও এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা তদন্ত সংশ্লিষ্ট কোনো সংস্থা ধর্মীয় বিদ্বেষ বা সাম্প্রদায়িক হামলার কোনো প্রমাণ পাওয়ার কথা জানায়নি, তবুও নিহতরা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের হওয়ায় ঘটনাটি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
পরিবারের অভিযোগ, শুরু থেকেই ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে। অন্যদিকে প্রশাসনের দাবি, সব দিক বিবেচনায় নিয়েই তদন্ত চলছে এবং প্রকৃত সত্য উদঘাটনের আগেই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হবে না।
ঘটনার দুই দিন পর, ৫ জুন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় ১১ মিনিট ৫০ সেকেন্ডের একটি সিসিটিভি ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু পুরো ভিডিওর পরিবর্তে কেবল আংশিক অংশ প্রকাশ করায় জনমনে নতুন করে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, যদি পুলিশ ও প্রশাসনের কাছে দীর্ঘ সময়ের ফুটেজ থাকে, তাহলে পুরো ভিডিও প্রকাশ করা হচ্ছে না কেন?
প্রকাশিত ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ক্যামেরায় প্রদর্শিত তারিখ ২ জুন এবং সময় রাত ১০টা ৫৪ মিনিট। যদিও ধারণা করা হচ্ছে, সিসিটিভির সময় ও তারিখ সঠিকভাবে সেট করা ছিল না। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অতিথিশালার নজরদারি ব্যবস্থায় এমন ত্রুটি কীভাবে থেকে গেল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ফুটেজে আরও দেখা যায়, ঘটনার দিন বিকেল ৩টা ১০ মিনিটে এক ব্যক্তি একটি কক্ষের দরজায় নক করে পাশের একটি খোলা কক্ষে প্রবেশ করেন। কিছুক্ষণ অবস্থান করার পর তিনি নিচে নেমে যান। প্রায় সাত মিনিট পর তিনি আবার ফিরে এসে একই এলাকায় প্রবেশ করেন। এরপর বিকেল ৩টা ২৯ মিনিটে আরেক ব্যক্তি এসে দরজায় নক করে নিচে চলে যান। তিন মিনিট পর তিনি আরেকজনকে সঙ্গে নিয়ে আবার ফিরে আসেন।
ফুটেজে দেখা যায়, প্রথম ব্যক্তি অন্তত দুইবার সেই কক্ষের আশপাশে প্রবেশ করে কিছু সময় অবস্থান করেন। তৃতীয়বার তিনি সরাসরি কক্ষে না গিয়ে নিচে যান এবং পরে আরেকজনকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে আসেন। এই চলাফেরা ঘিরেই এখন সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি লক্ষ্য করা হয়ে থাকে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে অন্যদের জানানো হয়নি কেন? দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি কেন? বারবার নিচে গিয়ে ওই ব্যক্তিরা কী করছিলেন? সেই অংশের ভিডিও কোথায়? আর যদি পুরো ফুটেজ থেকে কিছু অংশ বাদ দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে তা কেন?
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আরও একটি ২ মিনিট ৪৯ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, ইতি রাণী হাতে একটি ছোট কালো রঙের হ্যান্ডব্যাগ নিয়ে ৩০৩ নম্বর কক্ষে প্রবেশ করছেন। কিন্তু মরদেহ উদ্ধারের সময় ওই ব্যাগটি পাওয়া যায় ৩০৪ নম্বর কক্ষে, যেখানে অধরা বিশ্বাসের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। এই বিষয়টিও তদন্তের ক্ষেত্রে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
নিহত ইতি রাণীর স্বামী দুলাল বিশ্বাস শুরু থেকেই হত্যার অভিযোগ করে আসছেন। তিনি বলেন, “গলা চেপে ধরে শ্বাসনালী বন্ধ করে আমার বাচ্চাদের মারা হয়েছে। আমি গলায় দাগ দেখেছি। এটা কিভাবে আত্মহত্যা হয়? এটা হত্যা। আমার সবকিছু শেষ করে দিয়েছে। আমি হত্যাকারীদের বিচার চাই।”
দুলাল বিশ্বাসের এই বক্তব্য স্থানীয় মানুষের মধ্যেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকে মনে করছেন, ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত আত্মহত্যা কিংবা হত্যা—কোনো বিষয়েই নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়।
ঘটনার পর বরগুনার বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবাদ, মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। অংশগ্রহণকারীরা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, পূর্ণাঙ্গ সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ এবং প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে পুলিশ বলছে, তদন্ত এখনও চলমান রয়েছে এবং কোনো তথ্য গোপন করা হচ্ছে না।
ঘটনার দিনই বরগুনা পুলিশ সুপার মুহাম্মাদ কুদরাত-ই-খুদা সাংবাদিকদের জানান, ঘটনাস্থল থেকে ঘুমের ওষুধ এবং পানির বোতল উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি বলেন, “প্রাথমিকভাবে কিছু আলামত পাওয়া গেছে। তবে প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত চলছে। অন্য কোনো কারণ বা সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
পরবর্তীতে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি বলেন, “আমাদের থানা পুলিশের মাধ্যমে তদন্তকাজ চলমান রয়েছে। পাশাপাশি ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে প্রধান করে একটি ছায়া তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে। ইতি রাণী ও তাঁর দুই কন্যার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন করে তা জনসমক্ষে তুলে ধরা হবে। কোনো অসঙ্গতি পাওয়া গেলে অবশ্যই যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
পুলিশ সুপার আরও জানান, ঘটনার দিনের অন্তত ছয় ঘণ্টার সিসিটিভি ফুটেজ তাদের সংগ্রহে রয়েছে এবং সেগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
তবে তদন্তের এই আশ্বাসে এখনো পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন নিহতদের স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই। তাদের প্রশ্ন, যদি ছয় ঘণ্টার ফুটেজ সংগ্রহে থাকে, তাহলে কেন মাত্র কয়েক মিনিটের ভিডিও জনসমক্ষে এসেছে? বাকি অংশে এমন কিছু আছে কি, যা এখনো প্রকাশ করা হয়নি?
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, নিহতরা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের হওয়ায় তদন্তের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ প্রকৃত ঘটনা উদঘাটিত না হলে নানা গুজব ও জল্পনা-কল্পনা ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা সামাজিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে।
বর্তমানে এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ফরেনসিক পরীক্ষা, ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন, ডিজিটাল প্রমাণ বিশ্লেষণ এবং সম্পূর্ণ সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা। এসব তথ্য প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত ইতি রাণী ও তাঁর দুই কন্যার মৃত্যুর রহস্য কাটবে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বরগুনার এই ঘটনাকে ঘিরে প্রশ্নের সংখ্যা উত্তর অপেক্ষা অনেক বেশি। আর সেই কারণেই হিন্দু মা ও দুই কন্যার এই মৃত্যুর ঘটনা এখন দেশের অন্যতম আলোচিত ও রহস্যঘেরা তদন্তে পরিণত হয়েছে।

