গোয়ার মারগাঁওয়ে জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ভারতের কাছে ৩-১ গোলে হেরে টানা তৃতীয়বার শিরোপা জয়ের স্বপ্ন ভেঙে গেছে বাংলাদেশের। রোমাঞ্চকর এই ম্যাচে লড়াই করেও শেষ পর্যন্ত স্বাগতিকদের কাছে হার মানতে হয়েছে পিটার বাটলারের শিষ্যদের।
এই জয়ের মাধ্যমে ষষ্ঠবারের মতো সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জিতল ভারত। অন্যদিকে ২০২২ ও ২০২৪ সালে টানা দুইবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর এবার ইতিহাস গড়ার সুযোগ হাতছাড়া করল বাংলাদেশ।
ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেছে। প্রথমার্ধে উভয় দল একাধিক সুযোগ তৈরি করলেও বিরতিতে যাওয়ার আগে স্কোরলাইন ছিল ১-১।
ম্যাচের ১২তম মিনিটেই এগিয়ে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিল বাংলাদেশ। বক্সের ভেতরে একেবারে গোলরক্ষকের মুখোমুখি হয়ে যান তাহুরা খাতুন। কিন্তু শট নেওয়ার আগেই ভারতীয় এক ডিফেন্ডার বিপদমুক্ত করেন।
৩০তম মিনিটে ভারতও গোলের খুব কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। অভিকা সিংয়ের হেড গোলরক্ষক মিলে আক্তারকে পরাস্ত করলেও বল ক্রসবারের সামান্য ওপর দিয়ে চলে যায়। কিছুক্ষণ পর মনীষা একক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের রক্ষণভাগ ভেঙে এগিয়ে এলেও দুর্দান্ত ডাইভ দিয়ে দলকে রক্ষা করেন মিলে আক্তার।
প্রথমার্ধের শেষ দিকে আবারও সুযোগ নষ্ট করেন তাহুরা। অন্যদিকে বিরতির ঠিক আগে আনিকা রানী সিদ্দিকীর দূরপাল্লার শট অসাধারণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন ভারতের গোলরক্ষক।
অবশেষে ৪২তম মিনিটে এগিয়ে যায় ভারত। মিডফিল্ড থেকে পাওয়া বল নিয়ে পিয়ারি জাক্সা বাংলাদেশের ডিফেন্ডার শামসুন্নাহারকে কাটিয়ে বক্সে ঢুকে পড়েন। পরে এগিয়ে আসা গোলরক্ষক মিলে আক্তারের ওপর দিয়ে চমৎকার চিপ শটে বল জালে জড়ান তিনি।
তবে পিছিয়ে পড়ার মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই ম্যাচে ফিরে আসে বাংলাদেশ। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে তাহুরা খাতুনের নিখুঁত থ্রু পাস ধরে রিতু পর্ণা চাকমা দারুণ দক্ষতায় বল জালে পাঠিয়ে সমতা ফেরান। তার এই গোল বাংলাদেশের সমর্থকদের নতুন আশায় বুক বাঁধতে সাহায্য করে।
কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হওয়ার পরই ম্যাচের মোড় ঘুরে যায়।
৪৬তম মিনিটে কর্নার থেকে আসা বলে মাথা ছুঁইয়ে ভারতকে আবারও এগিয়ে দেন সানফিদা নংরুম। মিলে আক্তার বলটি ঠেকানোর চেষ্টা করলেও তা পোস্টে লেগে জালে ঢুকে পড়ে।
দ্বিতীয়বার পিছিয়ে পড়ার পর বাংলাদেশ আক্রমণের গতি বাড়ায়। মিডফিল্ডে মারিয়া মান্দা, আফেইদা খন্দকার ও আনিকারা বলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন। রিতু পর্ণা ও তাহুরাও কয়েকবার ভারতীয় রক্ষণভাগে চাপ সৃষ্টি করেন। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সমতা আর ফেরানো যায়নি।
উল্টো ম্যাচের ৮২তম মিনিটে ভারতের তৃতীয় গোল বাংলাদেশের আশা শেষ করে দেয়। মালাভিকার বাড়ানো বল থেকে কাছ থেকে শট নিয়ে ব্যবধান ৩-১ করেন ল্যান্ডি কম।
ফাইনালের আগে বাংলাদেশ দলের প্রধান কোচ পিটার বাটলার আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বলেছিলেন, “আমরা ভারতকে যথেষ্ট সম্মান করি। কিন্তু আমরা কাউকেই ভয় পাই না।” গোয়ায় ফাইনালের আগে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই মন্তব্য করেছিলেন।
অন্যদিকে ভারতের প্রধান কোচ ক্রিসপিন চেত্রীও ম্যাচের আগে নিজের খেলোয়াড়দের ওপর বাড়তি চাপ না দেওয়ার কথা বলেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা খেলোয়াড়দের ওপর কোনো চাপ দিচ্ছি না। তারা যেন নিজেদের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে পারে, সেটাই চাই।”
ম্যাচের আগে বাংলাদেশ দলে দুটি পরিবর্তন আনেন পিটার বাটলার। আক্রমণভাগে উমেলা মারজিয়ার পরিবর্তে সুযোগ পান তাহুরা খাতুন। আর সৌরভী আক্তার প্রীতির জায়গায় একাদশে আসেন শামসুন্নাহার জুনিয়র।
ফাইনালে বাংলাদেশের শুরুর একাদশ ছিল—মিলে আক্তার, মারিয়া মান্দা, শামসুন্নাহার, আফেইদা খন্দকার, কহাতি কিস্কু, মমিতা খাতুন, আনিকা রানী সিদ্দিকী, তাহুরা খাতুন, সুরভি আক্তার আফরিন, রিতু পর্ণা চাকমা এবং শামসুন্নাহার জুনিয়র।
পরাজয় সত্ত্বেও এবারের টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স আবারও প্রমাণ করেছে যে দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবলে তারা এখন অন্যতম শক্তিশালী দল। কয়েক বছর আগেও যেখানে ভারত একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করত, সেখানে বাংলাদেশ এখন নিয়মিত শিরোপার দাবিদার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তবে ইতিহাস গড়ার হাতছানি থাকা এই ফাইনালে সুযোগ নষ্ট এবং দ্বিতীয়ার্ধে রক্ষণভাগের কিছু ভুল শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য বড় মূল্য হয়ে দাঁড়ায়। ফলে টানা তৃতীয় শিরোপা জয়ের স্বপ্ন অধরাই থেকে গেল।
অন্যদিকে স্বাগতিক দর্শকদের সামনে জয় তুলে নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবলে নিজেদের হারানো শ্রেষ্ঠত্ব পুনরুদ্ধার করল ভারত। ষষ্ঠ শিরোপা জয়ের মাধ্যমে তারা আবারও জানিয়ে দিল, আঞ্চলিক ফুটবলে তাদের চ্যালেঞ্জ জানাতে হলে প্রতিপক্ষকে নিখুঁত ফুটবল খেলতেই হবে।

