বাংলাদেশে ক্যাথলিক মিশন ও খ্রিস্টানদের ওপর বাড়ছে চাপ

দারিদ্র্য বিমোচন, পথশিশু সহায়তা ও শিক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনাকারী ক্যাথলিক মিশনগুলো ইসলামপন্থী উগ্রবাদের উত্থানের পর নতুন সংকটের মুখে পড়েছে বলে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

বাংলাদেশে ক্যাথলিক চার্চ পরিচালিত বিভিন্ন রকম সামাজিক উদ্যোগ, সেবা কর্মসূচী, পথশিশু সহায়তা কার্যক্রম এবং খ্রিস্টান মিশনারিদের কর্মকাণ্ড ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব বাড়ার প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ক্যাথলিক সাময়িকী আমেরিকা ম্যাগাজিন-এ প্রকাশিত এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের খ্রিস্টান সম্প্রদায় এখন আগের চেয়ে বেশি নজরদারি, ভয়ভীতি, হামলা এবং প্রশাসনিক বাধার মুখোমুখি হচ্ছে।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে ক্যাথলিক চার্চ দরিদ্র মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পথশিশু পুনর্বাসন ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এসব কার্যক্রমকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে ধর্মান্তরের অভিযোগ তোলা হচ্ছে।

সুইজারল্যান্ডভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ক্রিশ্চিয়ান সলিডারিটি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, অতীতে বাংলাদেশের সরকারগুলো খ্রিস্টান প্রতিষ্ঠান, মিশন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি তুলনামূলক সহনশীল ছিল। সংগঠনটির দাবি, ধর্মনিরপেক্ষ আওয়ামী লীগ সরকার ইসলামপন্থী উগ্রবাদী শক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখত এবং সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা দিত।

তবে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে খ্রিস্টানদের সামাজিক কর্মকাণ্ড ও শিক্ষা কার্যক্রম কঠোর নজরদারির মুখে পড়েছে। নতুন স্কুল বা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ কিংবা সম্প্রসারণের অনুমোদন পেতেও বেসরকারি খ্রিস্টান সংগঠনগুলোকে নানা জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

খ্রিস্টান নির্যাতন পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা ওপেন ডোরস ইন্টারন্যাশনাল দাবি করেছে, বাংলাদেশে খ্রিস্টানরা এখন আদালতে ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা খুব কমই করতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার মনগড়া অভিযোগ আনা হচ্ছে এবং হামলাকারীরা শাস্তি ছাড়াই পার পেয়ে যাচ্ছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিভিন্ন এলাকায় গির্জা ও খ্রিস্টান অধ্যুষিত গ্রামে ধর্মীয় উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হামলার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বিদেশি মিশনারিদের ভিসা নবায়ন বিলম্বিত করা হচ্ছে, কোথাও কোথাও ভিসা বাতিলও করা হয়েছে। বিশেষ করে পাহাড়ি ও আদিবাসী খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষ ভূমি দখল ও উচ্ছেদের শিকার হচ্ছেন।

ঢাকার বস্তি এলাকায় প্রায় ২২ বছর ধরে পথশিশুদের নিয়ে কাজ করছেন ইতালীয় ধর্মযাজক ব্রাদার লুসিও বেনিনাতি। তিনি পন্টিফিক্যাল ইনস্টিটিউট ফর ফরেন মিশনসের সদস্য। দীর্ঘদিন ধরে তিনি পথশিশুদের জন্য অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা, খেলাধুলা ও স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

কিন্তু বর্তমানে নিরাপত্তাজনিত কারণে তাকে আর বস্তির ভেতরে বসবাস করতে দেওয়া হচ্ছে না। এখন তিনি নিজের কমিউনিটি হাউস থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

লুসিও বেনিনাতি আমেরিকা ম্যাগাজিনকে বলেন, “আমি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই শিশুদের জন্য কাজ করতে চাই। গত ২২ বছর যেমন নির্ভয়ে কাজ করেছি, তেমনি কাজ চালিয়ে যেতে চাই।”

তিনি জানান, পথশিশুদের নিয়ে কাজ করার সময় ইসলামপন্থীদের হামলার শিকার হয়েছেন। এমনকি পুলিশ তাকে একাধিকবার আটক ও জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। তার বিরুদ্ধে ধর্মান্তরকরণ ও শিশু পাচারের অভিযোগও আনা হয়েছিল।

তিনি বলেন, “পুলিশ আমাকে নানা উপায়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। কিন্তু কোনো অভিযোগ প্রমাণ করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে।”

ব্রাদার বেনিনাতির মতে, ঢাকার পথশিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর একটি। তাদের অনেকেই যৌন নির্যাতন, সহিংসতা ও অপরাধচক্রের শিকার হয়। তিনি বলেন, তার কাজ তখনই সফল হবে যখন ঢাকার রাস্তায় আর একটি শিশুও অবহেলিত অবস্থায় থাকবে না।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে সহিংসতা নতুন নয়। ২০০১ সালে গোপালগঞ্জের একটি ক্যাথলিক গির্জায় বোমা হামলায় ১০ জন নিহত হন। বহু বছর পেরিয়ে গেলেও সেই হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি।

২০১৬ সালেও কয়েকটি এলাকায় খ্রিস্টান আদিবাসীদের জমি দখলের উদ্দেশ্যে অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার অভিযোগ ওঠে। একই বছরে সুনীল গোমেজ নামে এক ক্যাথলিক মুদি দোকানিকে রোববারের প্রার্থনা শেষে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

এখন খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে আবারও সেই ধরনের সহিংসতা ফিরে আসার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত বছরের নভেম্বরে ঢাকার অন্তত তিনটি গির্জা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হাতবোমা নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এসব হামলার উদ্দেশ্য ছিল খ্রিস্টানদের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করা এবং ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ নিরুৎসাহিত করা।

গত ডিসেম্বরে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী নটর ডেম কলেজ এবং হলি ক্রস কলেজ-এ “তাওহিদী মুসলিম জনতা” নামে একটি সংগঠনের পক্ষ থেকে বাংলা ভাষায় চিঠি পাঠানো হয়।

চিঠিতে ক্যাথলিক চার্চের শিক্ষা কার্যক্রমের প্রশংসা করা হলেও অভিযোগ তোলা হয় যে, এসব প্রতিষ্ঠান শিক্ষা কার্যক্রমের আড়ালে মুসলিম ও আদিবাসীদের খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তর করার চেষ্টা করছে।

চিঠিতে বলা হয়, “৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশে আপনারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে মানুষকে ধর্মান্তর করার চেষ্টা করছেন।”

বাংলাদেশে ধর্মান্তর বা ইসলাম অবমাননার অভিযোগ অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। এমন অভিযোগের কারণে অতীতে বহু মানুষ সহিংসতা, গ্রেপ্তার ও সামাজিক বয়কটের শিকার হয়েছেন।

বাংলাদেশের প্রায় চার লাখ ক্যাথলিকের অর্ধেকের বেশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সদস্য। চার্চ পরিচালিত স্কুল, স্বাস্থ্যসেবা ও মানবিক সহায়তা কর্মসূচি সব ধর্মের মানুষের জন্য উন্মুক্ত হলেও ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর একটি অংশ এসব কার্যক্রমকে গোপন ধর্মপ্রচারের মাধ্যম হিসেবে সন্দেহ করে।

উত্তরাঞ্চলে কর্মরত কলম্বিয়ান ধর্মযাজক ফাদার বেলিসারিও সিরো দে জেসুস মন্তোয়া বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্ম পালনের স্বাধীনতা থাকলেও বাস্তবে সামাজিক ও পারিবারিক চাপের কারণে খোলামেলা ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে।

আমেরিকা ম্যাগাজিনকে হোয়াটসঅ্যাপে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমার মতো বিদেশি মিশনারিরাও নজরদারির মধ্যে থাকেন। ভিসা জটিলতা, নানা সন্দেহ এবং প্রকাশ্যে ধর্মীয় প্রচারের সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে হয়।”

তবে তিনি বলেন, স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক তাকে অনেক ক্ষেত্রে সহনশীল পরিবেশ তৈরি করতে সাহায্য করেছে।

ফাদার মন্তোয়া বলেন, “আমি আক্রমণাত্মক প্রচারের চেয়ে জীবনযাপনের মাধ্যমে সুসমাচারের বার্তা পৌঁছে দিতে বিশ্বাস করি। যিশু যেমন মানুষের প্রয়োজনের পাশে দাঁড়িয়েছেন, আমরাও তেমনটাই করার চেষ্টা করি।”

ময়মনসিংহ অঞ্চলে কর্মরত আরেক ইতালীয় ধর্মযাজক ফাদার জিওভান্নি গারগোনা জানান, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে শিল্পাঞ্চলে কাজ করতে আসা খ্রিস্টান শ্রমিকদের ধর্মীয় শিক্ষা ও সামাজিক সহায়তা দেওয়া এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এখানে কাজ করতে আসা খ্রিস্টানদের জন্য ধর্মীয় সহায়তা ও তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করাই এখন আমার প্রধান দায়িত্ব।”

স্থানীয় খ্রিস্টানরা তাকে নিরাপত্তার কারণে সতর্ক থাকতে বললেও তিনি গ্রামাঞ্চলে যাওয়া বন্ধ করেননি।

মানবাধিকারকর্মীদের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা আরও অনিরাপদ হয়ে পড়ছেন। তাদের আশঙ্কা, জবাবদিহিহীনতা ও উগ্রবাদের বিস্তার অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles