শোক যেন মহাশক্তিতে সংঘবদ্ধ করেছিল জনতাকে। লাখো মানুষের গগনবিদারী স্লোগান “বীর চট্টলার মোশাররফ ভাই, আমরা তোমায় ভুলি নাই”, “জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু”, “শেখ হাসিনা ফিরবে, বাংলাদেশ হাসবে”! কে রুখতে পারে ভালবাসার প্লাবন? নিপীড়ক রাজনৈতিক শক্তির সকল বাধা ও ভীতি পদদলিত করে বৃহস্পতিবার মহাজনতা নেমে এসেছিল চট্টগ্রামের জামেয়াতুল ফালাহ জাতীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে। তারা তাদের প্রিয় নেতাকে শেষ বিদায় জানিয়েছে, জানাজা পাঠ করেছে। সাথে “জয় বাংলা” স্লোগানে জানান দিয়েছে, বাংলাদেশ অজেয়।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের জানাজায় মানুষের ঢল মসজিদ প্রাঙ্গণ ছাপিয়ে বন্দরনগরী জুড়ে প্লাবন ছড়িয়েছিল। রাজনৈতিক সহযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধা, বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মী এবং সাধারণ মানুষের উপস্থিতিতে বিস্তির্ণ এলাকা পরিণত হয় এক আবেগঘন জনসমুদ্রে।
নামাজে জানাজা শেষে যখন তাঁর মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি মসজিদ প্রাঙ্গণ থেকে বের হতে শুরু করে, তখন চারদিক থেকে ধ্বনিত হতে থাকে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিকন্যা শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর স্লোগান। হাজারো কণ্ঠের সেই স্লোগানে ভারী হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ।
জানাজার পর নেতাকর্মীরা মরদেহবাহী গাড়ির পেছনে মিছিল নিয়ে এগিয়ে যান। এ সময় জামেয়াতুল ফালাহ মসজিদ থেকে ওয়াসা মোড় পর্যন্ত পুরো সড়কজুড়ে ছিল মানুষের ঢল। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হলেও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
এর আগে সকাল থেকেই বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জানাজার স্থানে জড়ো হতে থাকেন। বেলা ১১টার দিকে অনুষ্ঠিত জানাজায় অংশ নেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ও বিএনপি নেতা ডা. শাহাদাত হোসেন, জাতীয় পার্টির নেতা ও সাবেক মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, সিপিবি, বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, মুক্তিযোদ্ধা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।
জানাজার আগে বক্তব্যে বিএনপি নেতা ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, “সাবেক মন্ত্রী মোশাররফ হোসেনের রাজনৈতিক জীবন ছিল বর্ণাঢ্য। বৃহত্তর চট্টগ্রামের উন্নয়নে তাঁর অবদান অনেক। তিনি মিরসরাইয়ের সন্তান হলেও পুরো চট্টগ্রামের জন্য কাজ করেছেন। দেশের উন্নয়নে তাঁর অবদান মানুষ স্মরণ করবে।”
“তিনি ছিলেন একজন ভদ্র রাজনীতিবিদ। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের উন্নয়নে তাঁর অবদান মূল্যায়ন করতে হবে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক জানাচ্ছি।”
উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ আতাউর রহমান বলেন, “একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ভূমিকা চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমরা তাঁকে হারালাম। সারাজীবন তাঁর সঙ্গে রাজনীতি করেছি।”
সাবেক মেয়র ও জাতীয় পার্টির নেতা মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “পাকিস্তান আমল থেকেই তাঁর সঙ্গে আমার স্মৃতি রয়েছে। চট্টগ্রামের উন্নয়নে তিনি বহু উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি মানুষের কথা শুনতেন। চট্টগ্রামের ইতিহাসে মোশাররফ হোসেন এক অবিস্মরণীয় নাম হয়ে থাকবেন।”
মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার মোহাম্মদ ইদ্রিস বলেন, “মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। ভারতে প্রশিক্ষণ ক্যাম্পগুলোতে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্নভাবে সহায়তা ও উৎসাহ দিয়েছেন। স্বাধীনতার পরও চট্টগ্রামের উন্নয়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।”
ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের বড় ছেলে সাবেদুর রহমান সামু বলেন, “দীর্ঘদিন আইসিইউতে থাকার পর তিনি মারা গেছেন। তিনি ছিলেন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা। দেশের উন্নয়নের জন্য কাজ করেছেন। সবাই আমার বাবার জন্য দোয়া করবেন।”

জানাজার আগে মরদেহ জামেয়াতুল ফালাহ মসজিদ প্রাঙ্গণে পৌঁছালে শেষবারের মতো তাঁকে এক নজর দেখার জন্য মানুষের ভিড় জমে যায়। ফুলে ফুলে ঢেকে দেওয়া হয় তাঁর কফিন।
পরবর্তীতে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় তাঁর নিজ এলাকা মিরসরাইয়ের ধুম গ্রামে। সেখানে ফজলুর রহমান স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে আরেক দফা জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
১৯৪৩ সালের ১২ জানুয়ারি চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ধুম গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। তাঁর বাবা এস রহমান ষাটের দশকে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ছিলেন। দেশভাগের পর কলকাতা থেকে চট্টগ্রামে এসে তিনি ‘ওরিয়েন্ট বিল্ডার্স করপোরেশন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।
চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং স্যার আশুতোষ সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর লাহোরে প্রকৌশলবিদ্যা অধ্যয়নের সময় তিনি ছয় দফা আন্দোলনে যুক্ত হন। সেই সময় তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র পরিষদের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।
লাহোর থেকে ফিরে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যোগ দেন এবং ১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে নেতৃত্ব দেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণেতাদের অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি।
আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে চট্টগ্রাম-১ আসন থেকে ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন।
১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ছিলেন। পরে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্তও তিনি একই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। চট্টগ্রামের অবকাঠামো উন্নয়ন, সড়ক যোগাযোগ ও আবাসন খাতে তাঁর উল্লেখযোগ্য ভূমিকার কথা বিভিন্ন বক্তা স্মরণ করেন।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তনের মধ্যেই ২৭ অক্টোবর রাজধানীর ভাটারা এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।
পরিবার ও দলীয় নেতাদের অভিযোগ, বার্ধক্যজনিত নানা রোগে আক্রান্ত থাকা সত্ত্বেও কারাগারে তিনি যথাযথ চিকিৎসা পাননি। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। পরে ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট তাঁকে কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে নেওয়া হয়। ১৪ আগস্ট জামিনে মুক্তি পেলেও তিনি আর সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি।
বুধবার রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।
ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন তিন ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন। তাঁর ছেলে মাহবুব রহমান রুহেল দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে চট্টগ্রাম-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
তাঁর মৃত্যুতে শুধু চট্টগ্রাম নয়, দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের মানুষের কাছে তিনি দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং তৃণমূল রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

