ঢাকা, ৫ জুন ২০২৬ — বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে তুরস্ক। একই সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, জাহাজ নির্মাণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও অন্যান্য কৌশলগত খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে একমত হয়েছে ঢাকা ও আঙ্কারা। দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ককে আরও গভীর করে কৌশলগত অংশীদারিত্বে উন্নীত করার কথাও আলোচনায় এসেছে।
শুক্রবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে দুই মন্ত্রী বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য দেন।
বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল প্রতিরক্ষা শিল্পে সম্ভাব্য সহযোগিতা। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেন, দুই দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়নে যৌথ উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে এবং এ বিষয়ে উভয় পক্ষ ইতোমধ্যে আলোচনা করেছে।
তিনি বলেন, “দুই দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। আমরা এ বিষয়ে আলোচনা করেছি এবং ভবিষ্যতে সহযোগিতার যথেষ্ট সম্ভাবনা দেখছি।”
তবে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হলেও কোনো নির্দিষ্ট চুক্তি, যৌথ উৎপাদন প্রকল্প, প্রযুক্তি হস্তান্তর কিংবা সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়সংক্রান্ত ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তুরস্ক বিশ্বের দ্রুত বিকাশমান প্রতিরক্ষা রপ্তানিকারক দেশগুলোর অন্যতম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ড্রোন, সাঁজোয়া যান, নৌযান ও সামরিক প্রযুক্তি রপ্তানির মাধ্যমে দেশটি মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে নিজেদের উপস্থিতি বাড়িয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশও দীর্ঘমেয়াদি সামরিক আধুনিকায়ন কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্র বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করছে।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই প্রেক্ষাপটে ঢাকা-আঙ্কারা প্রতিরক্ষা সহযোগিতার আলোচনা দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাণিজ্য ২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য
বৈঠকে দুই দেশের বার্ষিক বাণিজ্য ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার থেকে ২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার বিষয়েও আলোচনা হয়। এ লক্ষ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) নিয়ে আলোচনার কথা জানান দুই মন্ত্রী।
ড. খলিলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে তিনি তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে অবহিত করেছেন এবং তুর্কি বিনিয়োগকারীদের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, “আমি তুরস্কের সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের আমন্ত্রণ জানিয়েছি। এমনকি তুরস্কের জন্য একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও দিয়েছি।”
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বস্ত্র ও পোশাক শিল্প, প্রতিরক্ষা সামগ্রী উৎপাদন, জাহাজ নির্মাণ, ওষুধশিল্প, অবকাঠামো উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, স্মার্ট প্রযুক্তি এবং বেসামরিক বিমান চলাচল খাতে সহযোগিতার বিস্তৃত সুযোগ রয়েছে।
তিনি আরও জানান, ঢাকায় আন্তর্জাতিক মানের একটি হাসপাতাল এবং নার্সিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও তুরস্ককে দেওয়া হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের গুরুত্ব
সংবাদ সম্মেলনে হাকান ফিদান বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত দেশ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অবস্থানে রয়েছে। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও মানবিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে দেশটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
বিশ্লেষকদের মতে, বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের কৌশলগত প্রতিযোগিতার মধ্যে বাংলাদেশ তার ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখার চেষ্টা করছে। এই প্রেক্ষাপটে তুরস্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
তবে পর্যবেক্ষকদের একটি অংশ মনে করেন, প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাস্তব অগ্রগতি নির্ভর করবে প্রযুক্তি স্থানান্তর, স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্প সহযোগিতার ওপর। শুধুমাত্র অস্ত্র বা সরঞ্জাম ক্রয় সম্পর্ককে কৌশলগত অংশীদারিত্বে রূপান্তরিত করতে যথেষ্ট নয়।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে তুরস্কের সমর্থন
রোহিঙ্গা সংকটও বৈঠকে গুরুত্ব পায়।
হাকান ফিদান বলেন, বাংলাদেশ ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে মানবতার জন্য একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করছে।
তিনি বলেন, “রোহিঙ্গা সংকটের নিরাপদ, স্বেচ্ছাপ্রণোদিত ও মর্যাদাপূর্ণ সমাধানের পক্ষে তুরস্কের অবস্থান অব্যাহত থাকবে।”
তিনি জানান, সফরের অংশ হিসেবে তিনি কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করবেন এবং সেখানে তুরস্কের বিভিন্ন সংস্থা পরিচালিত কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবেন।
তুরস্কের সরকারি সহযোগিতা সংস্থা টিকা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা আফাদ, তুর্কি রেড ক্রিসেন্ট এবং দিয়ানেত ফাউন্ডেশন বর্তমানে রোহিঙ্গা শিবিরে বিভিন্ন মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তুরস্ক পরিচালিত ফিল্ড হাসপাতালটিও শরণার্থীদের স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
ড. খলিলুর রহমান তুরস্কের মানবিক ও কূটনৈতিক সহায়তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং কক্সবাজারে পরিচালিত হাসপাতালটিকে রোহিঙ্গাদের জন্য অন্যতম সেরা স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করেন।
হরমুজ প্রণালি, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংলাপ ও মধ্যপ্রাচ্য
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতেও মতবিনিময় করেন দুই মন্ত্রী।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংলাপ প্রসঙ্গে হাকান ফিদান বলেন, আলোচনায় অগ্রগতি হওয়াকে তুরস্ক স্বাগত জানায় এবং এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার আশা করে।
তিনি হরমুজ প্রণালিতে অবাধ নৌ চলাচলের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এই নৌপথ উন্মুক্ত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বের একটি বড় অংশের জ্বালানি সরবরাহ এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় হরমুজ প্রণালিতে যেকোনো অস্থিরতা দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্ব অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
গাজা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরায়েলের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, চলমান সংঘাত দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান বাস্তবায়নের পথকে আরও কঠিন করে তুলছে।
সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নেওয়ার প্রত্যাশা
ড. খলিলুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ দর্শনের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব এবং পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, “এই সফর বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্কের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। এটি আমাদের সহযোগিতা আরও গভীর করার এবং দ্বিপক্ষীয় অংশীদারিত্বকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার অভিন্ন অঙ্গীকারের প্রতিফলন।”
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও বলেন, গত মার্চে খলিলুর রহমানের আঙ্কারা সফর এবং বর্তমান ঢাকা সফর দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর করার যৌথ আগ্রহের প্রতিফলন।
এছাড়া সাংস্কৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে বলেও তিনি জানান।
দুই দেশের কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করেছেন যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা, সংস্কৃতি, প্রতিরক্ষা শিল্প এবং মানবিক সহযোগিতার মতো ক্ষেত্রগুলোতে আগামী বছরগুলোতে আরও দৃশ্যমান অগ্রগতি হবে।
তবে শুক্রবারের আলোচনায় যেসব উদ্যোগ সামনে এসেছে, সেগুলোর অধিকাংশই এখনও প্রস্তাব বা আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কিংবা বড় আকারের বিনিয়োগ—এসব পরিকল্পনা কতটা বাস্তবায়িত হয়, সেটিই আগামী দিনে ঢাকা-আঙ্কারা সম্পর্কের প্রকৃত অগ্রগতির মাপকাঠি হয়ে উঠবে।

