আওয়ামী লীগের ফিরে আসার অপেক্ষায় বাংলাদেশ

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা, আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং দলটির ক্রমবর্ধমান গ্রহণযোগ্যতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে বিষয়টি নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে সেটি হচ্ছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন এবং সেই সাথে রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের আবার ফিরে আসা। রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে টিভি টকশো, সামাজিক মাধ্যম প্রতিটি জায়গায় এই বিষয়টি নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে জমজমাট আলোচনা চলছে। বলতে গেলে এই বিষয়টি এখন “টক অফ দ্য কান্ট্রি”। শুধুমাত্র দেশেই নয় বিদেশেও প্রবাসী বাংলাদেশী কমিউনিটির মধ্যে আলোচনার টেবিলে বিষয়টি প্রাধান্য পাচ্ছে।

বাংলাদেশের ইতিহাস, জন্ম ও স্বাধীনতার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে যে রাজনৈতিক দলটির নাম সেটি হচ্ছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। দেশের সবচেয়ে প্রাচীন ও জনপ্রিয় এবং দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দেয়া এই ঐতিহ্যবাহি রাজনৈতিক দলটিকে গত দুই বছর যাবত অনেকটা গায়ের জোরে নিষিদ্ধ করে রাখা হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের ১২ই মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করে আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সব সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল।

তারই ধারাবাহিকতায় গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সেই বিতর্কিত অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করার উদ্যোগ নেয় বিএনপি সরকার এবং পরবর্তীতে ৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদে এ সংক্রান্ত বিল যা ‘সন্ত্রাস বিরোধী (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ নামে পরিচিত পাস করা হয়।

ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর সবসময়ই দেশের এই সবচেয়ে প্রাচীন দলের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি নিয়ে কমবেশি আলোচনা হয়েছে।

তবে সাম্প্রতিককালে এই বিষয়টি জোরালো হয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া একটি সাক্ষাৎকারের পর।

গত ১৯ মে দেশি-বিদেশী বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারিত এই সাক্ষাৎকারে তিনি আশা প্রকাশ করে জানিয়েছেন, তিনি দ্রুতই বাংলাদেশে ফিরবেন এবং ‘মাথা উঁচু করে’ ফিরবেন। তিনি আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেছেন আনন্দবাজারের সাথে।

শেখ হাসিনা বলেন, অতীতে তাঁকে অনেকবার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু আওয়ামী লীগকে দমন করা যায়নি। সৃষ্টিকর্তা বাঁচিয়ে রেখেছেন বলেই তিনি আবারও দেশে ফিরে গণতান্ত্রিক পরিবেশ পুনঃপ্রতিষ্ঠায় কাজ করবেন।

আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরও দলকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু আওয়ামী লীগ আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে এসেছিল। তার দাবি, দেশে এখনো দলের বিপুলসংখ্যক সমর্থক ও নেতাকর্মী রয়েছেন এবং তারা বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে সক্রিয় রয়েছেন।

দেশে প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার এই ঘোষণার পর দেশে বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে দারুণ উজ্জীবিত ভাব লক্ষ্য করা গেছে। নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে দেশে প্রতিদিনই কোন না কোন জায়গায় ঝটিকা মিছিল বের হচ্ছে এবং এসকল মিছিলে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নেতাকর্মীদের উপস্থিতিও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ৫ আগস্টের পর যেসকল নেতাকর্মী এলাকা বা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন তারাও নিজ নিজ এলাকায় ফেরার প্রস্তুতি গ্রহণ করছেন বলে জানা যায়।

যেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছিল সেই সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেছেন আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফিরে আসবে এবং আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে।

বেসরকারী টিভি চ্যানেল যমুনা টিভির সাথে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে আউট হয়ে গেছে বা থাকবে বলে মনে করি না। “আমি বিশ্বাস করি আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফিরে আসবে এবং অনুমান করি আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে,” এই সাবেক কূটনীতিক মন্তব্য করেন।

সাবেক কূটনীতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. খলিলুর রহমান আওয়ামী লীগের প্রত‍্যাবর্তন নিয়ে কেন এত আলোচনা ও পর্যালোচনা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি কেন বিএনপির জন‍্যই সবচেয়ে বেশী দরকার এই বিষয় নিয়ে তার ফেসবুক পেজে একটি পোস্ট দিয়েছেন।

তিনি লিখেছেন জুলাই ২০২৪ সালের আন্দোলন এবং আগস্ট ২০২৪-এ সরকার পতনের পেছনে ভূমিকা রেখেছিল বলে যাদের ব্যাপকভাবে মনে করা হয়, তাদের অনেককেই এখন উচ্চকণ্ঠে আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের কথা বলতে এবং দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পক্ষে অবস্থান নিতে দেখা সত্যিই তাৎপর্যপূর্ণ।

সাজ্জাদ হোসেন সবুজ

সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ ও তথাকথিত সুশীল সমাজের অনেক ব্যক্তি — যাদের মধ্যে কেউ কেউ একটি নির্বাচিত সরকারকে অস্থিতিশীল করার প্রচেষ্টার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন এবং যারা দীর্ঘদিন ধরে ড. ইউনূসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায় ছিলেন বলে আলোচিত — তারাই এখন অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির পক্ষে এবং দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আওয়ামী লীগের মূলধারার রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের পক্ষে কথা বলছেন।

আগস্ট ২০২৪ থেকে এখন পর্যন্ত ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি এবং সাধারণ মানুষের মনোভাব বিশ্লেষণ করে আমার কাছে ক্রমেই স্পষ্ট হয়েছে যে, দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী — বিশেষ করে কৃষক, শ্রমিক, রিকশাচালক, পোশাকশ্রমিক এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ ও নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠী — আওয়ামী লীগ সরকারের উপস্থিতিকে অনুভব করছে। তাদের অনেকের মধ্যেই এই উপলব্ধি তৈরি হয়েছে যে, এই দলটিই তাদের ন্যূনতম অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা, জীবিকার স্থিতিশীলতা এবং কঠোর পরিশ্রমে অর্জিত আয়ের মূল্য রক্ষায় ভূমিকা রাখতে সক্ষম ছিল।

অন্যদিকে, দেশের একাংশের অভিজাত শ্রেণি, বিশেষ করে সেইসব বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদ যারা দীর্ঘদিন ধরে পূর্ববর্তী সরকারগুলোর কঠোর সমালোচক ছিলেন, তারাও এখন মনে করছেন যে, তাদের পেশাগত প্রভাব, সামাজিক মর্যাদা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, সম্মান ও প্রাসঙ্গিকতা টিকিয়ে রাখার জন্যও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রয়োজন যেখানে আওয়ামী লীগ সক্রিয় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উপস্থিত থাকবে। ফলে তাদের অনেকেই এখন প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের পক্ষে মত দিচ্ছেন।

এটিও সমানভাবে লক্ষণীয় যে, ড. ইউনূসের অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু উপদেষ্টাকেও এখন তার শাসনামলে সংঘটিত বলে সমালোচিত ব্যর্থতা, বিশৃঙ্খলা, অতিরঞ্জন এবং যাকে অনেকে “মব-নির্ভর রাজনীতি” বলে আখ্যায়িত করেন, সেসব থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিতে দেখা যাচ্ছে এবং আওয়ামী লীগের আশু প্রত‍্যাবর্তনের কথা বলছে। অথচ এরাই তিন/চার মাস আগেও আওয়ামী বিরোধীতায় মুখর ছিল এবং আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের উপর নিষেধাজ্ঞা প্রদানে ইউনুসের উপদেষ্টা পরিষদের সভায় ইউনুসের কথামতো ভোট দিয়েছে।

আমার বিশ্লেষণে, আজকের দিনে আওয়ামী লীগ অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সংখ্যক অ-আওয়ামী লীগ সমর্থক ভোটারদের কাছেও গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে — বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষ ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে।

তবে আমার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ এখনো রয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগবিরোধী কিছু উপাদান, দলটির ভেতরের কিছু সুবিধাবাদী নেতার সহযোগিতা বা প্রশ্রয়ে, সংগঠনের বিভিন্ন স্তরে অনুপ্রবেশ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই বিষয়টি নিয়ে দলীয় নেতৃত্ব, প্রকৃত সমর্থক, তৃণমূলের কর্মী এবং নিবেদিত নেতাদের অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে।

বর্তমানে সাধারণ জনগণ, এমনকি যারা ঐতিহ্যগতভাবে আওয়ামী লীগের সমর্থক ছিলেন না, তাদের কাছ থেকেও দলটি যে বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক সমর্থন পাচ্ছে, তা এসব অনুপ্রবেশকারী গোষ্ঠীর প্রভাবের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান। যদি এই ধরনের উপাদানগুলোকে আবারও অনিয়ম ও অপকর্মে জড়ানোর সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে তারা পুনরায় দলটির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং দলকে সমালোচনার মুখে ফেলতে পারে।

সবশেষে, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে বর্তমান ক্ষমতাসীনদের অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতিকে উৎসাহিত করা এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা উচিত। এর মাধ্যমে গণতন্ত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা আরও শক্তিশালী হবে এবং বর্তমান ক্ষমতাসীন দলটিও প্রকৃত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আওয়ামী লীগের একটি গ্রহণযোগ্য বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পারবে। অন্যথায়, ভবিষ্যতে তারা দেশের প্রধান বিরোধী বা বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবেও নিজেদের অবস্থান হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

সাবেক সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক গোলাম মাওলা রনি বলেছেন, আওয়ামী লীগ যখন রাজনীতিতে ফিরবে, তখন তারা পিঁপড়ার মতো ধীরে ধীরে আসবে না; বরং তারা আসবে সুনামির মতো বা প্রচণ্ড ঝড়ের গতিতে। তাঁর মতে, আওয়ামী লীগের এই প্রত্যাবর্তনের পেছনে ভারতের শক্তিশালী সমর্থন ও দলটির অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বড় ভূমিকা পালন করবে।

তার ইউটিউব চ্যানেলে রনি মন্তব্য করেছেন মানুষের মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রতি বিশ্বাস, আস্থা ও নির্ভরতা ফিরে এসেছে। তিনি বলেছেন আওয়ামী লীগ একটি অনুভূতির নাম। আওয়ামী লীগ ব্যাথা পেলে আওয়ামী লীগের কর্মীরা ব্যাথা পায়। অসংখ্য মানুষের রক্ত দানের মাধ্যমে আজকের আওয়ামী লীগ। পৃথিবীর কোন দেশের কোন সংগঠন এতো রক্ত দেয় নাই।

শেখ হাসিনা সম্পর্কে গোলাম মাওলা রনি মন্তব্য করেন যে, ক্ষমতা হারানোর পর তাঁর সাহস ও প্রখরতা যেন আরও বেড়েছে। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা যদি বাংলাদেশে ফিরে জেলখানাতেও যান, তবে সেই জেলখানাটি একটি ‘তীর্থকেন্দ্রে’ পরিণত হবে। ওয়ান-ইলেভেনের মতো হাজার হাজার নেতাকর্মী সেখানে ভিড় জমাবে, যা বর্তমান সরকারের জন্য হবে এক বড় অস্বস্তিকর পরিস্থিতি।

এর আগে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার বর্তমান বিএনপি সরকারের উদ্যোগ প্রসঙ্গে বরেণ্য অর্থনীতিবিদ প্রফেসর রেহমান সোবহান বলেছিলেন, দেশের দ্বিদলীয় রাজনীতির দুটি স্তম্ভের একটি আওয়ামী লীগ। প্রায় আট দশকের ইতিহাস ধারণ করা রাজনৈতিক শক্তি আওয়ামী লীগ এবং তাদের উল্লেখযোগ্য ভোটব্যাংক রয়েছে। নিষিদ্ধ করলেই রাজনীতি থেকে আওয়ামী শক্তি হঠাৎ করে বিলীন হয়ে যাবে—এমনটি ভাবার সুযোগ নেই। বিষয়টির সুরাহা সরকারকেই করতে হবে। আর সেটি করতে ব্যর্থ হলে আমাদের ‘সংস্কারকৃত’ রাজনৈতিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বের সাবেক সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের পেছনে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী গোষ্ঠীর চাপ ছিলো ইঙ্গিত করে রেহমান সোবহান বলেন, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি, যারা দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই উপস্থিত রয়েছে, তারা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানে সুযোগ নিয়েছে, এর ভেতরে ঢুকে পড়েছে এবং অভ্যুত্থানের গতিমুখ নির্ধারণের ক্ষেত্রেও তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এর একটি অংশের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর দল আওয়ামী লীগের প্রতি প্রবল বিরূপ মনোভাব বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বিরূপ মনোভাবে রূপান্তরিত হয়েছিল।

প্রফেসর রেহমান সোবহান মনে করেন, শেখ হাসিনার কঠোর অবস্থানের পেছনেও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। তিনি বলেন, “১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত যেসব সরকার ক্ষমতায় ছিল, তারা রাষ্ট্রীয় পরিসর থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগের ভূমিকা প্রায় সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলেছিল। এই ইতিহাস মুছে দেওয়ার প্রবণতার প্রতিক্রিয়াতেই শেখ হাসিনার অবস্থান কঠোর হয়ে ওঠে।”

আওয়ামী লীগের ইতিহাস, বাঙালি জাতির গৌরবোজ্জ্বল অর্জন ও সংগ্রামের ইতিহাস। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাসহ বাঙালি জাতির যা কিছু শ্রেষ্ঠ অর্জন, তার মূলে রয়েছে জনগণের এই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব। জন্মলগ্ন থেকে এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শক্তির উৎস জনগণ, শক্তির উৎস সংগঠনের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পুরনো ঢাকার ঐতিহ্যবাহী রোজ গার্ডেনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এই রাজনৈতিক দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার সময় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কারাগারে আটক ছিলেন। তাঁকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করা হয়। কেন্দ্রীয়ভাবে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ করা হলেও পরবর্তী সময়ে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক আদর্শের অধিকতর প্রতিফলন ঘটানোর জন্য এর নাম ‘আওয়ামী লীগ’ করা হয়।

দীর্ঘ আট দশকের অভিযাত্রায় আওয়ামী লীগের ওপর বারবার আঘাত এসেছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত দুইবার দলটিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা এবং পরবর্তীতে কারাগারের অভ্যন্তরে জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পর আওয়ামী লীগ বলতে গেলে এক প্রকার নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়েছিল। স্বাধীনতা বিরোধী খুনীচক্র ভেবেছিল আওয়ামী লীগ আর কখনও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না এবং ক্ষমতায় আসতে পারবে না। কিন্তু তাদের সেই ভাবনাকে মিথ্যা প্রমাণ করে মাত্র ৫ বছরেই বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সূযোগ্য নেতৃত্বে দল আবারও সুসংগঠিত হয়ে ঠিকই ঘুরে দাঁড়ায় এবং স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে স্বৈরাচারের পতন ঘটায়। দীর্ঘ ২১ বছরের সংগ্রাম ও লড়াইয়ের পর ১৯৯৬ সালে ১২ জুনের নির্বাচনের মাধ্যমে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে আবারও ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলটি। তারপরের ইতিহাসতো দেশ ও বিশ্ববাসি দেখেছেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের পর জনগনের সমর্থন নিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে টানা তিনটি নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত অত্যন্ত সফলভাবে দেশ পরিচালনা করে দেশকে পৃথিবীর বুকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করে। কিন্তু দেশি-বিদেশি যড়ষন্ত্র অর্থাৎ মেটিকুলাস ডিজাইনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম এক বিতর্কিত অধ্যাদেশের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করে। তারই ধারাবাহিকতায় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার সেই অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তরিত করেছে যাতে করে দেশের সবচেয়ে প্রাচীন ও জনপ্রিয় দলটি আর রাজনীতি করার সুযোগ না পায়।

বাঙালি জাতি, বাংলা ভাষা, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ অবিচ্ছেদ্য ও একই সূত্রে গাঁথা।এবং একে অপরের পরিপূরক। আওয়ামী লীগের প্রয়াত সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছিলেন আওয়ামী লীগ শুধু একটা রাজনৈতিক দল নয়। হাজারও শহীদের রক্ত, জাতির পিতার রক্ত, জাতীয় চার নেতার রক্ত, হাজার হাজার নেতাকর্মীর আত্মত্যাগ সব মিলিয়েই আওয়ামী লীগ। এই আওয়ামী লীগ শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়, এটা অনুভূতি। এই হাজারও বন্ধুর রক্ত, চার নেতার রক্ত, ভাষা আন্দোলনের রক্ত-সেই অনুভূতি। এই অনুভূতিতে সৃষ্টি হয়েছে আওয়ামী লীগ।

আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করার জন্য অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে, কিন্তু আওয়ামী লীগকে নিঃশেষ করতে পারেনি এবং কোনোদিনই পারবে না।আওয়ামী লীগ অজেয় রাজনৈতিক সংগঠন। আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকলে পৃথিবীর কোনো শক্তি নাই, এই আওয়ামী লীগকে স্তব্ধ করে দিতে পারে।

আওয়ামী লীগ হচ্ছে কিংবদন্তি রাজনীতিবিদ হুসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা ভাসানি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুল হক, তাজউদ্দীন আহমেদের মতো নেতাদের হাতে গড়া দল এবং এই দলের শিকড় দেশের প্রতিটি গ্রাম ও মহল্লায় বিস্তৃত রয়েছে। যেই দলটি দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫০ ভাগ প্রতিনিধিত্ব করে এবং যে দলে রয়েছে কোটি কোটি ত্যাগী নেতা-কর্মী সেই দলকে কোন আইন দিয়ে নিষিদ্ধ করে রাখা যায় না এবং সম্ভবও নয়। ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে সেটাই বারবার প্রমাণিত হয়েছে।

লেখক: সাজ্জাদ হোসেন সবুজ, সিনিয়র সাংবাদিক এবং ওয়াশিংটনস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের সাবেক প্রেস মিনিস্টার।

spot_img