শিক্ষাঙ্গনে মব সন্ত্রাস: সাড়ে চার লাখ শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতি ও শিক্ষকদের লাঞ্ছনা

সাবেক উপাচার্য ড. আবদুল আউয়ালের নিবন্ধে উঠে এলো ক্যাম্পাস সহিংসতা, জোরপূর্বক পদত্যাগ এবং শিক্ষা ব্যবস্থার চরম সংকটের চিত্র।

শিক্ষাঙ্গনে মব সন্ত্রাস

দুই বছর আগে নিবন্ধন করেও এসএসসি পরীক্ষা দিতে পারছে না সাড়ে চার লাখ শিক্ষার্থী-

ড. আবদুল আউয়াল
সাবেক উপাচার্য, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয়েছে ২১ এপ্রিল ২০২৬ থেকে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম থেকে জানা যায়, দুই বছর আগে নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে নিবন্ধন করেও প্রায় সাড়ে চার লাখ শিক্ষার্থী ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না অথবা নিতে পারছে না। নিবন্ধন করার পরও এত বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করাটা রাষ্ট্রের জন্য নিশ্চয়ই চিন্তার বিষয়। কিন্তু এ ব্যাপারে কারও কোনো মাথাব্যথা আছে বলে এ পর্যন্ত কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

মোহাম্মদ ইউনুসের অবৈধ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিকল্পিত মব সন্ত্রাসের কারণে শিক্ষাঙ্গন পুরোপুরি ধ্বংসের শেষ সীমায়। পত্রিকার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর প্রথম তিন মাসেই কমপক্ষে তিন হাজার শিক্ষক মবের শিকার হয়েছেন।

২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট বরিশালের গৌরনদীতে মাহিলারা এ এন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের স্টাফ কোয়ার্টারে প্রধান শিক্ষক প্রণয় অধিকারীর বাসায় বাইরে থেকে দরজায় সজোরে একের পর এক আঘাত করা হচ্ছিল। ধারালো অস্ত্রের কোপে ফেটে যাচ্ছিল দরজার কাঠ। বদ্ধ ঘরের ভেতর থেকে প্রাণভিক্ষা চেয়ে বুকফাটা আর্তনাদ করছিলেন পরিবারের সদস্যরা। মবের লক্ষ্য ছিল প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া, নতুবা পদত্যাগে বাধ্য করা।

২০২৩ সালে ঢাকার ধামরাই উপজেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান নির্বাচিত হন সূয়াপুর নান্নার স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আনোয়ারুল ইসলাম তালুকদার। অথচ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এই অধ্যক্ষকেও ন্যাক্কারজনকভাবে মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। এমন বিভীষিকাময় উদাহরণ সারা দেশেই রয়েছে।

পদবঞ্চিত প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষক জোটের তথ্য মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মব সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন প্রায় সাড়ে চার হাজার শিক্ষক। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ কেকা রায় চৌধুরীকে তাঁরই সহকর্মীর নেতৃত্বে মব সন্ত্রাস করে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। মন্ত্রণালয়সহ তিনি প্রায় দেড়শ জায়গায় আবেদন এবং অনেক দৌড়ঝাঁপ করেছেন। অবশেষে দুই মাস আগে তাঁর পক্ষে রায় এলেও এখনও যোগদান করতে পারেননি সেই মব সন্ত্রাসের কারণেই।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও ভয়াবহ পরিস্থিতি

স্কুল-কলেজ ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা আরও ভয়াবহ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের বিকেলেই কয়েকজন উপাচার্যকে টেনে-হিঁচড়ে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেওয়া হয়। একজন উপাচার্য ওই দিন বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় বিএনপিপন্থী কর্মকর্তার নেতৃত্বে সংগঠিত তাণ্ডবের ফলে বাসভবনের পেছন দিয়ে পরিবারসহ কোনোমতে বের হয়ে পাশের নদীতে পাওয়া একটি নৌকায় করে ওপারে গিয়ে প্রাণে রক্ষা পান।

একই ক্যাম্পাসে দীর্ঘদিন একসঙ্গে বসবাস করা অবস্থায় নিজ প্রতিষ্ঠানের কিছু কর্মকর্তার আচরণ এতটা নিষ্ঠুর ও অমানবিক হয় কীভাবে?

টিআইবির তথ্য মতে, প্রায় ৪৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে পদত্যাগে বাধ্য করে বিএনপি-জামায়াতে ইসলামী সমর্থক শিক্ষকবৃন্দকে দিয়ে সেই পদগুলোতে ভাগাভাগি করে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শিক্ষক, ছাত্র, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য যেন নরকের দরজা খুলে দেওয়া হলো। অনেকেই ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত হয়েছেন। প্রাণ বাঁচাতে অনেকে আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হয়েছেন। হাজার হাজার ছাত্রকে বহিষ্কার করা হয়েছে। যারা ডিগ্রি নিয়েছে, তাদের অনেকের ডিগ্রি সনদ বাতিল করা হয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি কালো অধ্যায়।

উল্লেখ্য, ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর ও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আবদুল মোনায়েম খানের কাছ থেকে ডিগ্রি সনদ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে সরকারের গণবিরোধী শিক্ষানীতির প্রতিবাদে ছাত্ররা সমাবর্তন বর্জনের ডাক দেয়। আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য শেখ ফজলুল হক মণিসহ কয়েকজনের ডিগ্রি সার্টিফিকেট প্রত্যাহার করা হয়েছিল। পরবর্তীতে অবশ্য সুপ্রিম কোর্টের রায়ে সবাই সার্টিফিকেট ফিরে পান। সেই কালো অধ্যায়ের যুগ বাংলাদেশেও ফিরে এলো।

ক্যাম্পাসে সহিংসতা ও মব সন্ত্রাস

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য নিরাপদ জায়গা বিবেচিত হলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের, বিশেষ করে ছাত্রলীগের ন্যূনতম সমর্থকদের জন্য ক্যাম্পাস যেন নরকের জায়গায় পরিণত হয়।

২০২৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ নেতা আবদুল্লাহ আল মাসুদকে যেভাবে প্রকাশ্যে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়, তা মনে হলে গা শিউরে ওঠে। এর কিছুদিন পর ১৮ সেপ্টেম্বর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ নেতা শামীম আহমেদকেও প্রকাশ্যে একই কায়দায় মব সন্ত্রাস করে হত্যা করা হয়।

একই দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তোফাজ্জল হোসেনকে যেভাবে থেমে থেমে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়, তা সারা দুনিয়াকে নাড়া দিয়েছে। সারা দেশে মব সন্ত্রাস করে হত্যার তালিকা অনেক দীর্ঘ।

ছাত্র-ছাত্রী ছাড়াও শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও মব সন্ত্রাস থেকে রেহাই পাননি। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ ক্যাম্পাসে এক শিক্ষককে মোটরসাইকেল থেকে নামিয়ে বেধড়ক পিটিয়ে অর্ধমৃত অবস্থায় ফেলে রেখে যায় মব সন্ত্রাসীরা। এভাবে কয়েকজন কর্মচারীকেও পিটিয়ে আহত করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের এক অধ্যাপককে ক্যাম্পাসে জনসম্মুখে ঢাকসুর সমাজকল্যাণ সম্পাদক শিবির নেতা এ বি জুবায়েরের নেতৃত্বে যেভাবে শারীরিকভাবে আক্রমণ ও লাঞ্ছিত করা হয়েছে, তা এক কথায় নজিরবিহীন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাটি আরও নির্মম। কর্তৃপক্ষের অনুরোধে প্রথম বর্ষের ছাত্রদের ভর্তি পরীক্ষায় দায়িত্ব পালন শেষে হল থেকে বের হতেই চাকসুর দপ্তর সম্পাদক শিবির নেতা আবদুল্লাহ আল মামুনের নেতৃত্বে আইন বিভাগের একজন শিক্ষককে ঘেরাও করে জোর করে ধাক্কাতে ধাক্কাতে প্রক্টর অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। শুধু তাই নয়, ওই শিক্ষকের ভাষ্যমতে তাঁকে সেখানে মারধরও করা হয়। একপর্যায়ে তিনি পানি খেতে চাইলে তাঁকে অপমানজনক আচরণের শিকার হতে হয়।

শিক্ষক সমাজে বিভাজন ও আতঙ্ক

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের জিএস সালাউদ্দিন আম্মার ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে তথাকথিত গণভোটের পক্ষে প্রচারণার জন্য আয়োজিত সভায় সরকারের উপদেষ্টা, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, শিক্ষক, ছাত্র, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অতিথিবৃন্দের উপস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধ ও আওয়ামী লীগপন্থী ১৬১ জন শিক্ষকের নাম ঘোষণা করে তাঁদের চাকরিচ্যুত ও ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়নের আল্টিমেটাম দেন।

এর কিছুদিন আগে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামী লীগপন্থী ছয়জন সম্মানিত ডীনকে জোরপূর্বক পদত্যাগ করানোর লক্ষ্যে সালাউদ্দিন আম্মার নিজেই পদত্যাগপত্র লিখে স্বাক্ষরের জন্য তাঁদের ডেকে পাঠান। পরে ডীনরা উপাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পদত্যাগপত্র জমা দেন।

২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষককে কথিত ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মব সন্ত্রাসের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। একইভাবে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে প্রায় ১২০ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের বিরুদ্ধে হত্যা-সহ বিভিন্ন মামলা রুজু করা হয়েছে।

এর মধ্যে অন্তত সাবেক উপাচার্যসহ ১০ জন অধ্যাপককে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রায় ১৫০ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে চাকরিচ্যুত, সাময়িক বহিষ্কার অথবা বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেওয়া হয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতি ও উদ্বেগ

মোহাম্মদ ইউনুসের ইন্টারিম সরকার বিদায় নিলেও বর্তমান বিএনপি সরকারের সময়েও পরিস্থিতির তেমন উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না; বরং কিছু ক্ষেত্রে আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন শিক্ষককে নিয়মবহির্ভূতভাবে চাকরি থেকে বরখাস্তসহ ৫৯ জন শিক্ষককে পদাবনমন ও বিভিন্ন শাস্তি দেওয়া হয়। পরে বিএনপি সরকারের সময় একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও ছয়জন অধ্যাপক, ছয়জন কর্মকর্তা এবং দুইজন কর্মচারীকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।

২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্যসহ তিনজন শিক্ষককে আবু সাঈদ হত্যা মামলায় ১০ বছরের এবং সাবেক প্রক্টরকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। অথচ আবু সাঈদের হত্যার ঘটনা ঘটেছে ক্যাম্পাসের বাইরে। তাঁর মৃত্যুর কারণ নিয়েও ভিন্ন ভিন্ন তথ্য রয়েছে।

বিএনপি সরকার দায়িত্ব নিয়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় সমর্থক উপাচার্য নিয়োগের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করেছে বলেও খবরে প্রকাশ।

উপসংহার

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতির কারণে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বিভাজন ও ঐক্যের ঘাটতি থাকলেও ব্যক্তিগত ও সামাজিক সম্পর্ক একটি সহনীয় পর্যায়ে ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর হঠাৎ করেই সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়।

বিএনপি-জামায়াতপন্থী অনেক উপাচার্য এবং শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী এতটাই বেপরোয়া হয়ে ওঠেন যে তাঁরা ছাত্রদের মব সন্ত্রাস প্রতিরোধ না করে অনেক ক্ষেত্রে নিজেরাই মবকে উসকে দিচ্ছেন। দু-এক ক্ষেত্রে শিক্ষক দ্বারা শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনাও ঘটেছে, যা ছিল কল্পনাতীত। এগুলো শিক্ষক সমাজ ও শিক্ষাঙ্গনের জন্য কলঙ্ক।

শিক্ষাঙ্গনকে কলঙ্কমুক্ত করার জন্য বর্তমান সরকার এবং সকল বিবেকবান শিক্ষক সমাজের প্রতি একজন শিক্ষক হিসেবে বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।

পরিশেষে, নিবন্ধন করার পরও যে সাড়ে চার লাখ শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষা দিতে পারল না, তারা যেন শিক্ষা জীবন থেকে হারিয়ে না যায়—এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর প্রতি সবিনয় অনুরোধ জানাচ্ছি।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles