ঢাকা: ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে এবার আরও দৃঢ় ও স্পষ্ট অবস্থান নিল বাংলাদেশ। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড, তিস্তার পানি বণ্টন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা—সবকিছু নিয়েই ভারতকে সরাসরি বার্তা দিয়েছে ঢাকা। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেছেন, “এই বাংলাদেশ আর আগের বাংলাদেশ নয়”, সীমান্তে কোনো উসকানিমূলক পরিস্থিতি তৈরি হলে বাংলাদেশ “বসে বসে দেখবে না”।
সোমবার বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। সাম্প্রতিক সময়ে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে নতুন করে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ এবং পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তার বক্তব্য বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
হুমায়ুন কবির বলেন, “বাংলাদেশকে কাঁটাতারের ভয় দেখানোর কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশের মানুষ কাঁটাতার ভয় পায় না। বাংলাদেশের সরকারও ভয় পায় না। যেখানে কথা বলা প্রয়োজন, সেখানে বাংলাদেশ কথা বলবে।”
তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে নানা চ্যালেঞ্জ থাকলেও আলোচনা ও কূটনৈতিক যোগাযোগের পথ এখনো খোলা রয়েছে। আর সেই কারণেই সমস্যাগুলোর সমাধানের সুযোগও রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিকে নজর ঢাকার
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সরকার গঠন করার পর নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছে বাংলাদেশ। নির্বাচনী প্রচারণার সময় পশ্চিমবঙ্গের কিছু নেতার বক্তব্যকে “উগ্র” ও “অশোভনীয়” বলে উল্লেখ করেন হুমায়ুন কবির।
তবে তিনি এটিও বলেন যে নির্বাচনী বক্তব্য আর সরকার পরিচালনা এক বিষয় নয়।
“অনেক সময় নির্বাচনে জয়ের জন্য রাজনৈতিক নেতারা নানা ধরনের ভাষা ব্যবহার করেন। কিন্তু সরকার পরিচালনা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। আমরা দেখতে চাই, নির্বাচনী বক্তব্য আর প্রশাসনিক আচরণের মধ্যে পার্থক্য থাকে কি না,” বলেন তিনি।
একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, বাংলাদেশের সম্পর্ক ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করার কোনো ইচ্ছা ঢাকার নেই।
সীমান্তে আগের পরিস্থিতি আর মেনে নেবে না বাংলাদেশ
হুমায়ুন কবিরের বক্তব্যে সবচেয়ে কঠোর বার্তা আসে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার আমলে সীমান্তে যেসব ঘটনা ঘটেছে, সেই “নমুনা” আর ফিরতে দেওয়া হবে না।
তার ভাষায়, “শেখ হাসিনার সময়ে সীমান্তে আমরা যে ধরনের পরিস্থিতি দেখেছি, সেই অবস্থা আর কোনোদিন হবে না। কেউ যদি আবার সেই পথে হাঁটতে চায়, তাহলে মনে রাখতে হবে—এই বাংলাদেশ আর সেই বাংলাদেশ নয়, যে বসে দেখবে।”
তবে বাংলাদেশ কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি তিনি। শুধু বলেন, “বাংলাদেশেরও পরিকল্পনা রয়েছে, কী করতে হবে।”
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত দীর্ঘদিন ধরেই দুই দেশের সম্পর্কে অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়। বিশেষ করে সীমান্তে গুলি, হত্যা এবং কাঁটাতারের বেড়া নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বহুবার উদ্বেগ জানিয়েছে। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগও বহুবার উঠেছে।
হুমায়ুন কবির বলেন, মানুষে মানুষে সম্পর্ক বাড়াতে চাইলে সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় ভারতকে আরও মানবিক হতে হবে।
শেখ হাসিনা ও ভারতের ভূমিকা নিয়ে মন্তব্য
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রসঙ্গ টেনে হুমায়ুন কবির বলেন, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে। এরপর অন্তর্বর্তী প্রশাসনের মাধ্যমে দেশ পরিচালিত হয়। পরে ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় আসে এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হয়। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারেনি, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী প্রধান বিরোধী দলে পরিণত হয়।
শেখ হাসিনাকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, “দেড় হাজার মানুষকে হত্যা করে শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারতে অবস্থান করছেন। ভারত থেকে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা হলে তা ভালো হবে না।” তবে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী অধিকাংশ হত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও বাড়াবাড়ির ঘটনা ঘটেছিল শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করার পরে অভ্যুত্থানকারীদের হাতে।
হুমায়ুন কবির দাবি করেন, ভারত সরকার বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করেছে যে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশবিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হবে না।
তিস্তা চুক্তিতে নতুন সম্ভাবনা দেখছে ঢাকা
দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তির বিষয়েও আশাবাদ ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ।
২০১১ সালে চুক্তিটি স্বাক্ষরের কথা থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির কারণে তা আটকে যায়। এরপর থেকে বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম অমীমাংসিত ইস্যু হয়ে আছে।
এখন পশ্চিমবঙ্গ এবং ভারতের কেন্দ্র—দুই জায়গাতেই বিজেপি সরকার ক্ষমতায় থাকায় বাংলাদেশ মনে করছে, আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বাধা কিছুটা কমতে পারে।
হুমায়ুন কবির বলেন, “ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এতদিন বলে এসেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কারণে তিস্তা চুক্তি সম্ভব হয়নি। এখন কেন্দ্র ও রাজ্য—দুই জায়গাতেই বিজেপি সরকার। আমরা আশা করছি, এখন আলোচনায় কম বাধার মুখে পড়তে হবে।”
তিস্তা নদী বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় কৃষকরা দীর্ঘদিন ধরে সংকটে রয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তিস্তা সমস্যার সমাধান না হওয়ায় দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাসও বেড়েছে।
তিস্তা প্রকল্পে চীনের অর্থায়নের ইঙ্গিত
চীনের সঙ্গে সাম্প্রতিক বৈঠকে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে বলেও জানান হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, তিস্তা প্রকল্পে চীনের এক্সিম ব্যাংক অর্থায়ন করবে।
“তিস্তা ইস্যুতে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। চীনের এক্সিম ব্যাংক এ প্রকল্পে অর্থায়ন করবে,” বলেন তিনি।
দক্ষিণ এশিয়ায় চীন ও ভারতের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্যে তিস্তা প্রকল্পে বেইজিংয়ের সম্পৃক্ততা নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে চীনের সহায়তায় তিস্তা পুনরুদ্ধার প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে।
হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক ঐতিহাসিক এবং নতুন সরকার সেই সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে চায়।
“নতুন সরকারের পক্ষ থেকে এটি হবে প্রথম বেইজিং সফর। বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে চীনও আগ্রহী। নতুন উচ্চতায় সম্পর্ক নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে,” বলেন তিনি।
তবে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময়সূচি এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলেও জানান তিনি।
ভারত-চীন ভারসাম্যের নতুন কূটনীতি
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলো থেকে স্পষ্ট হচ্ছে যে নতুন সরকার ভারত ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরও কৌশলগত ও আত্মবিশ্বাসী অবস্থান নিতে চাইছে।
একদিকে ভারতকে সীমান্ত ও তিস্তা ইস্যুতে চাপ দিচ্ছে ঢাকা, অন্যদিকে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতাও বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আগামী কয়েক মাস ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা সহযোগিতা, পানি বণ্টন এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতি—সবকিছু মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন এক সংবেদনশীল পর্যায়ে প্রবেশ করছে।

