বিচারহীনতা ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতায় বাংলাদেশে ধর্ষণের বিস্তার ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে

বাংলাদেশ পার্সপেক্টিভের গবেষণায় উঠে এসেছে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে বাড়তে থাকা যৌন সহিংসতা, দুর্বল বিচারব্যবস্থা এবং নিরাপত্তাহীনতার গভীর চিত্র

বাংলাদেশে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার ঘটনা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে বলে সতর্ক করেছে সামাজিক প্ল্যাটফর্ম ‘বাংলাদেশ পার্সপেক্টিভ’। সম্প্রতি প্রকাশিত তাদের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ক্রমশ ব্যর্থ হচ্ছে এবং ধর্ষণ, গণধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা এখন জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে।

“বাংলাদেশ’স রেপ এপিডেমিক: এ গভর্নমেন্ট ফেইল্ড ইটস উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন অ্যামিড সোয়ারিং রেপ ক্রাইসিস” শীর্ষক এই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের শহর, গ্রাম, এমনকি ঘরবাড়িও এখন অনেক নারী ও শিশুর কাছে নিরাপদ নয়। প্রায় প্রতিদিনই ধর্ষণ, গণধর্ষণ, যৌন নির্যাতন ও নির্যাতনের পর হত্যার খবর সামনে আসছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এটি আর বিচ্ছিন্ন অপরাধের বিষয় নয়; বরং বিচারহীনতা, দুর্বল আইন প্রয়োগ এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের সংকটে রূপ নিয়েছে।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), পুলিশ সদর দপ্তর এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ৭৮৬টি ধর্ষণ ও গণধর্ষণের ঘটনার তথ্য নথিভুক্ত করেছে। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৫১৬। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঘটনাগুলো ৫২ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হচ্ছে, ২০২৫ সালের ভুক্তভোগীদের মধ্যে ৫৪৩ জনই ছিল ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী। অর্থাৎ প্রায় ৭০ শতাংশ ভুক্তভোগীই অপ্রাপ্তবয়স্ক। একই বছরে গণধর্ষণের ঘটনা ছিল ১৭৯টি। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার এই প্রবণতা বাংলাদেশের সামাজিক ও নৈতিক কাঠামোর গভীর সংকটের প্রতিফলন।

ঢাকা ট্রিবিউন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছিল, শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার এই বৃদ্ধি “ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক।” প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, কিশোরী ও শিশুদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যও একই ধরনের উদ্বেগ তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে দেশে ৭ হাজার ৬৮টি ধর্ষণ মামলা দায়ের হয়েছে। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ৫৭০। অর্থাৎ এক বছরে মামলা বেড়েছে ২৭ শতাংশেরও বেশি। একই সঙ্গে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে দায়ের হওয়া মামলার সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

গবেষণাটি বলছে, ২০২৬ সালেও পরিস্থিতির উন্নতির কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসেই ৩৫টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২৫টি একক ধর্ষণ এবং ১০টি গণধর্ষণের ঘটনা। ওই মাসে ১২ বছর বা তার কম বয়সী ১৩ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণের পর অন্তত দুইজনকে হত্যা করা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

বাংলাদেশ পার্সপেক্টিভ বলছে, বাস্তব পরিস্থিতি সরকারি বা নথিভুক্ত পরিসংখ্যানের চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে। কারণ সামাজিক লজ্জা, প্রতিশোধের ভয়, প্রভাবশালী মহলের চাপ, পুলিশের প্রতি অনাস্থা এবং বিচার না পাওয়ার আশঙ্কায় বহু পরিবার অভিযোগই করে না।

প্রতিবেদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, স্কুল, মাদ্রাসা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং আশ্রয়স্থল হিসেবে বিবেচিত জায়গাগুলোও অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের জন্য নিরাপদ থাকছে না।

২০২৫ সালের মার্চে ইউনিসেফ বাংলাদেশও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। ঢাকায় এক বিবৃতিতে ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেছিলেন, “বাংলাদেশে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার ঘটনায় যে উদ্বেগজনক বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে মেয়েশিশুদের ক্ষেত্রে, তা আমাকে গভীরভাবে আতঙ্কিত করেছে।” তিনি বলেন, “সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, যেসব প্রতিষ্ঠান শিশুদের নিরাপত্তা ও বিকাশের জন্য থাকা উচিত, সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও এ ধরনের ঘটনা ঘটছে।”

বাংলাদেশ পার্সপেক্টিভের প্রতিবেদনে বিচারব্যবস্থার ধীরগতির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, তদন্তে বিলম্ব, সাক্ষীদের ভয়ভীতি, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল অভিযোগপত্র এবং দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া ধর্ষকদের জন্য কার্যত নিরাপত্তা তৈরি করছে। যখন অপরাধের দ্রুত বিচার হয় না, তখন অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

দ্য ডেইলি স্টারের এক গোলটেবিল বৈঠকে ইউনিসেফ বাংলাদেশের শিশু সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ শাবনাজ জাহেরিন বলেন, বাংলাদেশে যৌন সহিংসতার মামলাগুলোর বিচারব্যবস্থায় ভয়াবহ দুর্বলতা রয়েছে। তিনি বলেন, “২০১৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৫ হাজার ৬০০-এর বেশি যৌন সহিংসতার মামলার মধ্যে মাত্র ২ শতাংশ মামলার রায় হয়েছে।” ঢাকায় আয়োজিত ওই গোলটেবিল বৈঠকে তিনি বলেন, শিশু সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এখনও কার্যকরভাবে গড়ে ওঠেনি।

নারীপক্ষের সদস্য কামরুন নাহার নিউ এজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “বিচারহীনতার সংস্কৃতি, নারীদের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং ভুক্তভোগীকেই দায়ী করার প্রবণতা এই পরিস্থিতির অন্যতম প্রধান কারণ।” তিনি বলেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বিচারব্যবস্থাকে কার্যকর না করলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনও শিশু নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ২০২৬ সালের মার্চে কুষ্টিয়ার একটি মাদ্রাসায় ১০ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ সামনে আসার পর সংগঠনটি বিবৃতি দেয়। সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, “অনেক অপরাধী প্রতিষ্ঠান ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আড়ালে থেকে যায়। শিশুরা ভয় ও সামাজিক চাপে মুখ খুলতে পারে না।”

বাংলাদেশ পার্সপেক্টিভের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকার প্রায়ই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়ার পর বিবৃতি দেয় বা কঠোর অবস্থানের কথা জানায়। কিন্তু বাস্তবে তদন্ত, বিচার ও ভুক্তভোগীদের সুরক্ষায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন দেখা যায় না। প্রতিবেদনে এই পরিস্থিতিকে “ইমেজ রক্ষার প্রশাসন” বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার প্রতিটি ঘটনার পেছনে রয়েছে ভেঙে পড়া পরিবার, মানসিক আঘাতে বিপর্যস্ত শিশু, সামাজিক বঞ্চনা, আত্মহত্যা, শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়া এবং দীর্ঘমেয়াদি ট্রমা। এর ফলে শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো সমাজ ও রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

গবেষণায় বেশ কিছু সুপারিশও করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ধর্ষণ মামলার জন্য স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল, ভুক্তভোগীদের জন্য চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা, পুলিশি জবাবদিহিতা, শিশু সুরক্ষা কাঠামো শক্তিশালী করা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বিচার নিশ্চিত করা।

প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হয়েছে, এটি আর শুধু নারী অধিকার বা আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং মানবিক দায়িত্ব পালনের পরীক্ষা। নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়বে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

spot_img