পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ঐতিহাসিক জয়ে শুভেন্দুকে অভিনন্দন শেখ হাসিনার

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে দুই বাংলার সম্পর্ক আরও জোরদারের আশা প্রকাশ করলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে ঐতিহাসিক বিজয়ের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসা ভারতীয় জনতা পার্টির নেতা ও নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

শনিবার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীর শপথ গ্রহণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শেখ হাসিনা এই অভিনন্দন বার্তা দেন। বর্তমানে ভারতে নির্বাসনে থাকা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী তাঁর বার্তায় শুভেন্দুর “জনমুখী ও দৃঢ় নেতৃত্বের” প্রশংসা করেন।

বিবৃতিতে শেখ হাসিনা বলেন,
“আমি ব্যক্তিগতভাবে এবং বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির ভূমিধস বিজয় এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ উপলক্ষে শ্রী শুভেন্দু অধিকারীকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।”

তিনি আরও বলেন, পশ্চিমবঙ্গের জনগণের এই রায় শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বের প্রতি মানুষের “গভীর আস্থা ও শ্রদ্ধার” বহিঃপ্রকাশ।

বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহাসিক সম্পর্কের প্রসঙ্গ তুলে শেখ হাসিনা বলেন,
“বাংলাদেশ ও ভারতের বন্ধুত্বের ইতিহাসে পশ্চিমবঙ্গের একটি বিশেষ স্থান রয়েছে। ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের বন্ধনে আমরা আবদ্ধ। আমি বিশ্বাস করি, তাঁর নেতৃত্বে এই সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও উচ্চতায় পৌঁছাবে।”

এবারের নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি ২৯৪ সদস্যের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ২০৭টি আসনে জয় পেয়ে সরকার গঠন করে। এর মাধ্যমে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর দল সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের টানা ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে।

শুভেন্দু অধিকারী দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পরিচিত। রাজ্যে ভারতীয় জনতা পার্টির উত্থানের পেছনেও তাঁকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক হিসেবে দেখা হয়। তিনি বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং বিজেপি-শাসিত বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের উপস্থিতিতে শপথ নেন।

শেখ হাসিনার এই অভিনন্দন বার্তাকে শুধু আনুষ্ঠানিক সৌজন্য হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, এর আঞ্চলিক রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। কারণ, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির মধ্যে নতুন ধরনের রাজনৈতিক সংযোগ তৈরি হয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র আন্দোলন ঘিরে সহিংস অস্থিরতার মধ্যে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে সেনাসমর্থিত ও ইসলামপন্থী গোষ্ঠী-সমর্থিত অন্তর্বর্তী প্রশাসন গঠিত হয়। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সেই প্রশাসন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশ পরিচালনা করে।

এই সময় মানবাধিকার সংগঠন, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং আওয়ামী লীগ নেতারা অভিযোগ করেন, দেশে বিরোধী মত দমন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, সাংবাদিকদের হয়রানি এবং ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক শক্তিকে দুর্বল করার পরিকল্পিত প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে।

সমালোচকদের মতে, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরও মূলত সেই রাজনৈতিক কাঠামোর ধারাবাহিকতাই বজায় রয়েছে। বহুল আলোচিত ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। বিরোধীরা নির্বাচনটিকে “একতরফা” ও “প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন” বলে বর্ণনা করে।

সেই নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। অন্যদিকে বিএনপির রাজনৈতিক মিত্র বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সংসদের বিরোধী দলে পরিণত হয়। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অনেক সমালোচক ২০২৪ সালের পর গড়ে ওঠা ক্ষমতার কাঠামোর ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছেন।

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী প্রশাসনের সময় থেকেই শুভেন্দু অধিকারী প্রকাশ্যে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের পক্ষে অবস্থান নেন। একই সঙ্গে তিনি মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের কঠোর সমালোচনা করেন।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনার এক অনুষ্ঠানে শুভেন্দু অধিকারী বলেছিলেন,
“শেখ হাসিনাই বাংলাদেশের বৈধ প্রধানমন্ত্রী। অন্তর্বর্তী সরকার অবৈধ।”

সেই অনুষ্ঠানে তিনি আরও বলেন,
“শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফিরবেন, এবং তাঁকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দিয়ে বরণ করবে বাংলাদেশের মানুষ।”

শুভেন্দুর এসব বক্তব্য বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের রাজনীতির পারস্পরিক প্রভাব এবং সীমান্ত-রাজনীতির প্রসঙ্গ আবারও সামনে আসে।

বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে রয়েছে দীর্ঘ সীমান্ত, অভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির সম্পর্ক। ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান ও সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও দুই বাংলার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। তবে সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশের বিষয়টি এবারের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে ওঠে। নির্বাচনী প্রচারে ভারতীয় জনতা পার্টি অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধে কঠোর অবস্থানের প্রতিশ্রুতি দেয়।

সর্বশেষ বিবৃতিতে শেখ হাসিনা দুই বাংলার মানুষের উন্নয়ন ও শান্তির স্বার্থে সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

তিনি বলেন,
“প্রতিবেশী হিসেবে আমরা সবসময় পশ্চিমবঙ্গের শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করেছি। আমি আশা করি, শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে আমাদের দীর্ঘদিনের সহযোগিতার সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে এবং দুই বাংলার মানুষের কল্যাণ ও উন্নয়নে আমরা একসঙ্গে কাজ করে যেতে পারব।”

বিশ্লেষকদের মতে, এই অভিনন্দন বার্তা শুধু কূটনৈতিক সৌজন্য নয়; ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, পশ্চিমবঙ্গের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির ক্ষেত্রেও এর বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles