কারাবন্দি সাংবাদিকদের মুক্তি, মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার এবং গণমাধ্যমের ওপর দমন–পীড়ন বন্ধের দাবিতে শুক্রবার ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছে ‘নিপীড়নবিরোধী সাংবাদিক ফ্রন্ট’।
সকালে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে অংশ নেন সাংবাদিক, সম্পাদক, গণমাধ্যমকর্মী, মানবাধিকারকর্মী এবং বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতারা। বক্তারা অভিযোগ করেন, মুহাম্মদ ইউনুসের অধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সাংবাদিকদের ওপর সবচেয়ে কঠোর দমন–পীড়নের নজির তৈরি হয়েছে।
তারা বলেছেন, ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে দেশের শত শত সাংবাদিককে মামলা, গ্রেপ্তার, চাকরিচ্যুতি, অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল, ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হয়েছে। বক্তাদের দাবি, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে ভিন্নমত ও সমালোচনামূলক সাংবাদিকতাকে দমন করার চেষ্টা করা হয়েছে।
‘সাংবাদিকদের অপরাধীতে পরিণত করা হয়েছিল’
মানববন্ধনে বক্তব্য দিতে গিয়ে নিপীড়নবিরোধী সাংবাদিক ফ্রন্টের আহ্বায়ক আকতার হোসেন অভিযোগ করেন, ইউনূস সরকারের সময় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, “ইউনূস সরকারের আমলে সাংবাদিকদের নামে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দেওয়া হয়েছে। অনেককে চাকরি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে, অনেককে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।”
“কারাবন্দি সাংবাদিকদের মুক্তি দেওয়া এবং সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন বন্ধ করা বর্তমান সরকারের দায়িত্ব। তারা যদি এই দায়িত্ব না নেয়, তাহলে ধরে নিতে হবে তারা সাংবাদিকদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে।”
আকতার বলেন, সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ইতিবাচক হবে এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি দেশের অঙ্গীকারও শক্তিশালী হবে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ভয়ভীতি, নজরদারি এবং প্রশাসনিক চাপের মধ্যে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা টিকে থাকতে পারে না।
তার ভাষায়, “যদি সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা না থাকে, তাহলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ধ্বংস হয়ে যাবে। দুর্নীতি ও অনিয়মের তথ্য জনগণের সামনে আর আসবে না।”
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে এমন একটি নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে সাংবাদিকরা ভয় ছাড়া পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।
‘পরিকল্পিতভাবে দমন করা হয়েছে স্বাধীন সাংবাদিকতা’
সংগঠনের সদস্য সচিব শেখ জামাল মানববন্ধনে সাংবাদিক নির্যাতনের একটি বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে শুধু আইনি হয়রানি নয়, বরং শারীরিক হামলা, মব সহিংসতা, প্রশাসনিক চাপ এবং সংগঠিত দমননীতি চালানো হয়েছে।
শেখ জামাল বলেন, “২০২৪ সালের আগস্টে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখলের পর ইউনূসগোষ্ঠী বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মুক্তমনা মানুষের ওপর আঘাত হানে।”
তিনি অভিযোগ করেন, শুধু সাংবাদিক ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানই নয়, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন, মাজার এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বিভিন্ন স্থাপনাও হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল।
তার ভাষায়, “একটি গোষ্ঠী স্বাধীন গণমাধ্যমকে দুর্বল করে রাষ্ট্রীয় বয়ান নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। সমালোচনামূলক সাংবাদিকতা এবং বিরোধী মতকে পরিকল্পিতভাবে দমন করা হয়েছে।”
গ্রেপ্তার, হত্যা ও শত শত মামলা
মানববন্ধনে সাংবাদিকদের ওপর দমন–পীড়নের বিভিন্ন পরিসংখ্যানও তুলে ধরা হয়।
মানব বন্ধনে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে সারাদেশে অন্তত ৪৭ জন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন শাহরিয়ার কবির, মোজাম্মেল বাবু, শ্যামল দত্ত, শাকিল আহমেদ, ফারজানা রূপা, মঞ্জুরুল আলম পান্না এবং আনিস আলমগীরসহ আরও অনেকে। তাদের কয়েকজন এখনো কারাগারে রয়েছেন বলেও তিনি দাবি করেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক সহিংসতা ও অস্থিরতার মধ্যে মেহেদী হাসান, শাকিল হোসেন, তাহির জামান, এটিএম তুরাব, প্রদীপ কুমার ভৌমিক এবং সোহেল আখঞ্জিসহ অন্তত ১৩ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন।
বক্তাদের দাবি অনুযায়ী, সারাদেশে ৪৪৯ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। একইসঙ্গে এক হাজার ২০০-র বেশি সাংবাদিক, সম্পাদক, বার্তা প্রধান, সংবাদকর্মী ও প্রতিনিধিকে চাকরি হারাতে হয়েছে।
প্রতিবাদকারীরা আরও অভিযোগ করেন—
- ১৬৮ জন সাংবাদিকের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল করা হয়েছে
- ৭০০-র বেশি সাংবাদিকের প্রেস ক্লাব সদস্যপদ স্থগিত বা বাতিল করা হয়েছে
- অর্ধশতাধিক সাংবাদিকের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে
- অন্তত ৪৭ জন সাংবাদিকের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে
তবে এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে তাৎক্ষণিক যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
‘গণমাধ্যম অফিসে হামলা ও অগ্নিসংযোগ’
বক্তারা অভিযোগ করেন, ২০২৪-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়েছে।
মানববন্ধনে যেসব গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়, তার মধ্যে রয়েছে একাত্তর টিভি, সময় টিভি, ডিবিসি নিউজ, এটিএন নিউজ, নিউজ ২৪, দৈনিক জনকন্ঠ, ডেইলি স্টার, এবং প্রথম আলো।
বক্তারা বলেন, এসব ঘটনায় দায়ীদের বিচার না হওয়ায় দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য বিপজ্জনক নজির তৈরি হয়েছে।
এক বক্তা বলেন, “টেলিভিশন চ্যানেল ও সংবাদপত্র অফিসে আগুন দিয়ে সাংবাদিকদের হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।”
গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ
মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা বলেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও দমন–পীড়ন শুধু ব্যক্তি পর্যায়ের সমস্যা নয়; এটি দেশের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক কাঠামোকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
তাদের ভাষ্য, স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তি। ভয়ভীতি, মামলা ও পেশাগত হয়রানির মাধ্যমে সাংবাদিকদের চুপ করিয়ে দেওয়া হলে জনগণের তথ্য জানার অধিকারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বক্তারা বলেন, “একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে সংবাদমাধ্যমের ওপর হামলা কখনো গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।”
তারা সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও সহিংসতার সব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেন।
মানবাধিকারকর্মী ও গণমাধ্যম বিশ্লেষকরাও সতর্ক করে বলেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি ভয়ভীতি ও অনিশ্চয়তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সাংবাদিকতা পেশায় আসা থেকে নিরুৎসাহিত করতে পারে।
তাদের মতে, বর্তমানে দেশের গণমাধ্যম খাতে ভয় ও অনিশ্চয়তার একটি গভীর পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
মানববন্ধন থেকে যেসব দাবি জানানো হয়
নিপীড়নবিরোধী সাংবাদিক ফ্রন্ট কর্মসূচি থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরে। এর মধ্যে রয়েছে—
- কারাবন্দি সাংবাদিকদের অবিলম্বে মুক্তি
- সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহার
- সাংবাদিক হত্যার নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার
- চাকরিচ্যুত সাংবাদিকদের পুনর্বহাল
- ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন ও বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের কার্যালয় খুলে দেওয়া
- জাতীয় প্রেস ক্লাবসহ বিভিন্ন প্রেস ক্লাবের স্থগিত সদস্যপদ পুনর্বহাল
- বাতিল হওয়া অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড ফিরিয়ে দেওয়া
- সাংবাদিকদের ব্যাংক হিসাব জব্দের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার
- বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার
শেখ জামাল বলেন, “ভবিষ্যতে যেন আর কোনো সরকার সাংবাদিকদের ওপর এ ধরনের নির্যাতন চালাতে না পারে, সে লক্ষ্যেই নিপীড়নবিরোধী সাংবাদিক ফ্রন্ট গঠন করা হয়েছে।”
গণমাধ্যমকর্মীদের বড় উপস্থিতি
আকতার হোসেনের সভাপতিত্বে এবং শেখ জামালের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত কর্মসূচিতে আরও বক্তব্য দেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আশরাফ আলী, বগুড়া সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি জে এম রউফ, যুগ্ম আহ্বায়ক জাকির হোসেন ইমন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের কোষাধ্যক্ষ সোহেলী চৌধুরী, আইনবিষয়ক সম্পাদক আসাদুর রহমান, দপ্তর সম্পাদক জান্নাতুল ফেরদৌস সোহেল, নির্বাহী সদস্য সাজেদা হক ও একেএম ওবায়দুর রহমান।
এছাড়া উপস্থিত ছিলেন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক অর্থ সম্পাদক রেজাউল করিমসহ দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীরা।
মানববন্ধনের শেষ পর্যায়ে অংশগ্রহণকারীরা সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষা, পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার দাবিতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

