ঢাকার পুরোনো গণভবনের সামনে শুক্রবার হঠাৎ করেই একটি ঝটিকা মিছিল বের করে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। মিছিলটি স্থায়ী হয়েছিল মাত্র কয়েক মিনিট। পুলিশের হস্তক্ষেপে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় অংশগ্রহণকারীরা। ঘটনাস্থল থেকেই আটক করা হয় যুবলীগ কর্মী খোকন কাজীকে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মেজবাহ উদ্দিন জানান, শুক্রবার দুপুর প্রায় ২টা ১৫ মিনিটে পুরোনো গণভবনের পশ্চিম পাশের মোড়ে ৩০ থেকে ৩৫ জনের একটি দল জড়ো হয়ে মিছিল শুরু করে।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “তারা ইকবাল রোডের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের টহল দল বাধা দেয়। পরে বাকিরা দ্রুত সরে যায়, আর খোকন কাজীকে আটক করা হয়।”
পুলিশ জানায়, আটক খোকন কাজীর হাতে একটি ব্যানার ছিল, যেখানে মোহাম্মদপুরের সাবেক কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীবের ছবি ছিল।
রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল এক স্থানে এই মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। একসময় দেশের সবচেয়ে সুরক্ষিত সরকারি বাসভবন হিসেবে পরিচিত গণভবনকে “জুলাই স্মৃতি জাদুঘর” নাম দিয়েছে মুহাম্মদ ইউনুসের অন্তর্বতী সরকার। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সহিংস আন্দোলন ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর ভবনটির চেহারা পাল্টে ফেলা হয়।
সমালোচকদের মতে, এটি শুধু একটি ভবনের রূপান্তর নয়; বরং বাংলাদেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ইতিহাসকে নতুনভাবে পুনর্লিখনের বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ।
শুক্রবারের এই ঝটিকা মিছিল এমন এক সময়ে হলো, যখন দেশে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন অব্যাহত রয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে ইউনুসের সরকার আওয়ামী লীগের সব রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। পরে ২০২৬ সালে বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে সংসদে পাস হওয়া সংশোধিত আইনের মাধ্যমে সেই নিষেধাজ্ঞাকে আরও শক্তিশালী করা হয়।
এর ফলে আওয়ামী লীগ কার্যত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, জনসভা, অনলাইন প্রচার এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ—সব ক্ষেত্র থেকেই বাদ পড়ে।
এদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে সংশোধন এনে শুধু ব্যক্তি নয়, রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের বিরুদ্ধেও বিচার চালানোর সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতাদের অভিযোগ, এই আইনি কাঠামো মূলত দলটিকে রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করা হচ্ছে।
নিষেধাজ্ঞার পর আওয়ামী লীগ তাদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেছিল, “অবৈধ সরকারের সব সিদ্ধান্তই অবৈধ।”
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই আরও উত্তপ্ত ও বিভক্ত হয়ে উঠেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বারবার অভিযোগ করেছে, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক ধরপাকড়, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা, সাংবাদিকদের ওপর চাপ, এমনকি ভিন্নমত দমনের প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ৮ আগস্টের মধ্যে সহিংসতা ও পরবর্তী পরিস্থিতিতে অন্তত ৩১৮ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে শিশুও ছিল। অন্যদিকে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ের পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ওপর দুই হাজারের বেশি হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন আইনপ্রণেতা আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে “প্রতিশোধের চক্র” তৈরি হচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগপন্থিরা “ঝটিকা মিছিল” কৌশল বেছে নিচ্ছেন। ছোট ছোট দল দ্রুত জড়ো হয়ে স্লোগান ও ব্যানার প্রদর্শন করে কয়েক মিনিটের মধ্যেই এলাকা ত্যাগ করছে, যাতে বড় ধরনের পুলিশি অভিযানের মুখে না পড়তে হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড সাধারণত সেইসব দেশে দেখা যায়, যেখানে রাজনৈতিক দমন বেড়ে যায় এবং বিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিসর সংকুচিত হতে থাকে।
দমন-পীড়ন ও গ্রেপ্তারের আশঙ্কা সত্ত্বেও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এখনো বিচ্ছিন্নভাবে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। পুরোনো গণভবনের সামনে শুক্রবারের সংক্ষিপ্ত মিছিলও সেই বাস্তবতারই আরেকটি প্রতিচ্ছবি।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বিচ্ছিন্ন ঝটিকা কর্মসূচিগুলো ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংগঠিত আন্দোলনে রূপ নেয় কি না, সেটিই এখন বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

