ভরসা হারিয়েছে সহযোগীরা, বৈদেশিক ঋণ ছাড় ১৯% কমেছে

অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির প্রভাব উন্নয়ন ব্যয়ে

অর্থনৈতিক সংকোচনের ফলে বাংলাদেশকে ঋণ প্রদানে ভরসা পাচ্ছে না বৈদেশিক উন্নয়ন সহযোগীরা। ফলে চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে বাংলাদেশে বৈদেশিক ঋণ প্রবাহে উল্লেখযোগ্য ধীরগতি দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে ঋণ পরিশোধের চাপ, যা দেশের উন্নয়ন ব্যয় ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে।

সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (Economic Relations Division) ইআরডি প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে উন্নয়ন সহযোগী ও আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের কাছ থেকে বাংলাদেশ পেয়েছে ৩ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার ঋণ ও অনুদান। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে বৈদেশিক সহায়তা ছাড়ে প্রায় ১৯ শতাংশ পতন ঘটেছে।

এদিকে, একই সময়ে বৈদেশিক ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধে সরকারকে ব্যয় করতে হয়েছে ৩ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের ৩ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বেশি। ফলে নতুন করে যে অর্থ আসছে, তার বড় একটি অংশই চলে যাচ্ছে পুরোনো ঋণ শোধে—যা অর্থনীতিবিদদের কাছে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইআরডির কর্মকর্তারা বৃহস্পতিবার ঢাকায় এক ব্রিফিংয়ে স্বীকার করেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক সমন্বয় প্রক্রিয়ার কারণে ঋণ ছাড়ে এই পতন দেখা যাচ্ছে। এক কর্মকর্তা বলেন, “প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ এবং অর্থনৈতিক সমন্বয়ের কারণে ঋণ ছাড়ের গতি কমে গেছে।” তিনি আরও জানান, বেশ কিছু বড় প্রকল্প নির্ধারিত সময় অনুযায়ী এগোতে না পারায় অর্থ ছাড়েও বিলম্ব হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পালাবদল ও অস্থিরতার পর পরবর্তী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। এর প্রভাব পড়ছে উন্নয়ন কার্যক্রমে এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থায়। ফলে নতুন ঋণ চুক্তি যেমন কমছে, তেমনি পুরোনো প্রকল্পেও অর্থ ছাড় ধীর হয়ে পড়ছে।

অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন এক নীতিনির্ধারণী আলোচনায় বলেন, “রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকলে উন্নয়ন সহযোগীরা স্বাভাবিকভাবেই সতর্ক থাকে। এতে নতুন প্রতিশ্রুতি ও অর্থ ছাড়—দুটোই প্রভাবিত হয়।” তিনি উল্লেখ করেন, শুধু রাজনৈতিক নয়, প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতার ঘাটতিও এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী।

ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, নতুন করে বৈদেশিক সহায়তার প্রতিশ্রুতিও কমেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে নতুন প্রতিশ্রুতি এসেছে ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের ৩ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় প্রায় ৬ শতাংশ কম।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বৈদেশিক ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়া এবং ঋণ পরিশোধ বেড়ে যাওয়ার এই দ্বৈত চাপ দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনাকে সংকুচিত করতে পারে। অবকাঠামো, জ্বালানি ও সামাজিক খাতে বড় বড় প্রকল্প অনেকাংশেই বিদেশি অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল। অর্থ ছাড়ে বিলম্ব হলে এসব প্রকল্পের কাজ পিছিয়ে যায়, ব্যয় বাড়ে এবং কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

এর পাশাপাশি, ২০২৪ সালের পর থেকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ এবং মুদ্রার ওঠানামা—এসব বিষয়ও অর্থনীতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে সরকারকে একদিকে যেমন উন্নয়ন ব্যয় চালিয়ে যেতে হচ্ছে, অন্যদিকে বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনাও আরও সতর্কভাবে করতে হচ্ছে।

নীতিনির্ধারকরা বলছেন, পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে হলে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা জরুরি। পাশাপাশি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা গেলে বৈদেশিক সহায়তা প্রবাহও স্বাভাবিক হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।

তবে সরকারি কর্মকর্তারা আশাবাদী যে, দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভাবনা এখনো শক্তিশালী রয়েছে। গত এক দশকের অবকাঠামোগত অগ্রগতি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা উল্লেখ করে তারা বলেন, বর্তমান চ্যালেঞ্জ সাময়িক—সঠিক নীতি ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles