শ্রম দিবসে শিল্পখাত নিয়ে শেখ হাসিনার সতর্কবার্তা

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অর্থনীতিতে ধস, কারখানা বন্ধ ও দারিদ্র্য বৃদ্ধির অভিযোগ সাবেক প্রধানমন্ত্রীর

আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বার্তায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা দেশের শিল্প ও কৃষিখাতে বড় ধরনের ধাক্কার চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, গত এক দশকেরও বেশি সময়ে অর্জিত অর্থনৈতিক অগ্রগতি ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

শ্রমিক দিবস উপলক্ষে দেওয়া ওই বার্তায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে হাজার হাজার কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।

তিনি বলেন, “দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, শিল্প ও কৃষিতে দেড় দশকে যে গতি আমরা তৈরি করেছিলাম, তা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ভেঙে পড়ে। অবৈধ ও অনির্বাচিত ইউনুস সরকারের প্রতিহিংসামূলক কর্মকাণ্ডের কারণে হাজার হাজার কারখানা—গার্মেন্টসসহ—বন্ধ হয়ে গেছে। মাত্র এক বছরের মধ্যে ২১ লাখ শ্রমিক তাদের চাকরি হারিয়েছেন।”

এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি বর্তমান অন্তর্বর্তী প্রশাসন, যার নেতৃত্বে রয়েছেন ড. মুহাম্মদ ইউনুস, তাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলেন।

Image

কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য নিয়ে উদ্বেগ

শেখ হাসিনা আরও দাবি করেন, শিল্পখাতের এই সংকট সরাসরি মানুষের জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তার ভাষায়, “২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে ৩০ লাখ মানুষ নতুন করে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে গেছে। এই সংকটের ধারা এখনও অব্যাহত রয়েছে।”

বাংলাদেশের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে রপ্তানিমুখী শিল্প, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল। এই খাতে উৎপাদন ব্যাহত হলে তার প্রভাব দ্রুতই শ্রমবাজার ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে পড়ে। অর্থনীতিবিদদের একাংশও সাম্প্রতিক সময়ে বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা, উৎপাদন কমে যাওয়া এবং রপ্তানিতে চাপের বিষয়টি তুলে ধরছেন, যদিও সরকারি তথ্য নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

শ্রমনীতি ও সংস্কারের কথা স্মরণ

নিজ সরকারের সময়কার বিভিন্ন শ্রমবান্ধব উদ্যোগের কথাও স্মরণ করেন শেখ হাসিনা। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন ২০১৮, জাতীয় শ্রমনীতি ২০১২, শিশু শ্রম নিরসন নীতি ২০১০, পেশাগত স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা নীতি ২০১৩, শ্রম বিধিমালা ২০১৫ এবং গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতির মতো পদক্ষেপগুলো শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

তিনি বলেন, এসব উদ্যোগের ফলে বাংলাদেশ একটি স্থিতিশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির অবস্থানে পৌঁছেছিল।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক বাস্তবতা

শেখ হাসিনা তার বক্তব্যে দেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর আদর্শের কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামই তার সরকারের নীতিনির্ধারণে পথ দেখিয়েছে।

এদিকে, ২০২৪ সালের আগস্টের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ব্যাপকভাবে পাল্টে যায়। সাবেক সরকারের পতনের পর সেনাসমর্থিত অন্তর্বর্তী প্রশাসন দায়িত্ব নেয়। এই সময়টিতে সহিংসতা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র-এর তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ের সহিংসতায় শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, রাজনৈতিক কর্মীদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন এবং গণমাধ্যমের ওপর চাপ—এসব বিষয়ও আলোচনায় আসে।

অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের আহ্বান

শ্রমিক দিবসের বার্তার শেষাংশে শেখ হাসিনা বলেন, শিল্প ও কর্মসংস্থান ধ্বংস করে কোনো দেশ এগোতে পারে না। “কারখানা বন্ধ করে, কর্মসংস্থান ধ্বংস করে, কৃষকদের ক্ষতিগ্রস্ত করে কোনো দেশ এগোতে পারে না,”—তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি আরও যোগ করেন, “এই ঐতিহাসিক দিনে আমি আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই—আওয়ামী লীগ সবসময় শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, স্বার্থ ও কল্যাণের পক্ষে ছিল। আমরা অবশ্যই এই অন্ধকার সময় অতিক্রম করে দেশকে আবার উন্নয়নের ধারায় ফিরিয়ে আনব।”

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো শিল্পখাত পুনরুজ্জীবিত করা, বিনিয়োগের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো। এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতিগত ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles