যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থীকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই নতুন নতুন তথ্য সামনে আসছে। সর্বশেষ যে তত্ত্বটি গুরুত্ব পাচ্ছে, তা হলো—অভিযুক্ত ব্যক্তি, তার রুমমেট এবং রুমমেটের প্রেমিকাকে ঘিরে একটি সম্ভাব্য ‘লাভ ট্রায়াঙ্গেল’ বা ত্রিভুজ প্রেম।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ২৬ বছর বয়সী হিশাম আবুগারবিয়েহ—যার বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে—তিনি শুধু ভুক্তভোগী জামিল লিমনের রুমমেটই ছিলেন না, বরং দুই ভুক্তভোগীর সঙ্গেই তার এমন এক সম্পর্ক ছিল, যা এখন ঈর্ষা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা একতরফা অনুভূতির দিকে ইঙ্গিত করছে।
দুই মেধাবী শিক্ষার্থীর স্বপ্নভঙ্গ
নিহত জামিল লিমন (২৭) এবং নাহিদা বৃষ্টি (২৭)—দুজনই বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা নিতে গিয়েছিলেন। তারা টাম্পা (Tampa) শহরে নতুন জীবন গড়ে তুলছিলেন।
লিমন পড়ছিলেন ভূগোল ও পরিবেশবিজ্ঞান নীতি বিষয়ে, আর বৃষ্টি ছিলেন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষার্থী। পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনদের মতে, তারা গভীর সম্পর্কে আবদ্ধ ছিলেন এবং ভবিষ্যতে বিয়ের কথাও ভাবছিলেন।
২০২৬ সালের ১৬ এপ্রিল তাদের শেষবার দেখা যায়। লিমন ছিলেন তার অফ-ক্যাম্পাস অ্যাপার্টমেন্টে, যেখানে তিনি অভিযুক্তের সঙ্গে থাকতেন। এর কিছুক্ষণ পর বৃষ্টিকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দেখা যায়। এরপরই তাদের হদিস মিলছিল না।
নিখোঁজ থেকে হত্যাকাণ্ড—ঘটনার ভয়াবহ মোড়
দুজনের নিখোঁজ হওয়ার পরপরই পুলিশ জরুরি অনুসন্ধান শুরু করে এবং তাদের “ঝুঁকিপূর্ণ নিখোঁজ ব্যক্তি” হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
ঘটনার নাটকীয় মোড় আসে ২৪ এপ্রিল, যখন টাম্পা বে এলাকার হাওয়ার্ড ফ্যাঙ্কল্যান্ড সেতুর (Howard Frankland Bridge) কাছে মানবদেহের অংশবিশেষ উদ্ধার করা হয়। পরে তা জামিল লিমনের বলে শনাক্ত করা হয়।
ময়নাতদন্তে নিশ্চিত হওয়া যায়, ধারালো অস্ত্র দিয়ে বারবার আঘাত করার ফলে তার মৃত্যু হয়েছে এবং এটি একটি স্পষ্ট হত্যাকাণ্ড।
অন্যদিকে, নাহিদা বৃষ্টির খোঁজ অব্যাহত ছিল। তদন্তকারীরা আশপাশের জলাশয় ও এলাকা খুঁজতে থাকেন এবং তার ঘটনাকেও সম্ভাব্য হত্যাকাণ্ড হিসেবে বিবেচনা করেন।
অভিযুক্তের গ্রেপ্তার ও অভিযোগের বিস্তার
এই ঘটনার তদন্তে দ্রুতই কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে ওঠেন হিশাম আবুগারবিয়েহ। তিনি লিমনের সঙ্গে একই অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন, যা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রায় এক মাইল দূরে।
২৪ এপ্রিল ফ্লোরিডার লুটজ এলাকায় তার পারিবারিক বাসায় এক ধরনের পারিবারিক বিরোধের খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে যায়। প্রায় ২০ মিনিটের মুখোমুখি অবস্থানের পর তিনি আত্মসমর্পণ করেন।
প্রথমে তার বিরুদ্ধে হামলা ও অবৈধভাবে আটকে রাখার অভিযোগ আনা হলেও, পরে তা দ্রুতই রূপ নেয়—দুইটি প্রথম ডিগ্রি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, প্রমাণ নষ্ট, মৃতদেহ সরানো এবং মৃত্যুর তথ্য গোপন করার মতো গুরুতর অভিযোগে।
ডিজিটাল সূত্রে পরিকল্পনার ইঙ্গিত
এই মামলার অন্যতম আলোচিত দিক হলো অভিযুক্তের ডিজিটাল কার্যকলাপ। তদন্তে উঠে এসেছে, ঘটনার তিন দিন আগে, অর্থাৎ ১৩ এপ্রিল, তিনি চ্যাটজিপিটিকে (ChatGPT) প্রশ্ন করেছিলেন:
“মানুষকে কালো আবর্জনার ব্যাগে ভরে ডাম্পস্টারে ফেললে কী হয়?”
চ্যাটবট এই প্রশ্নকে বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করলে তিনি আরও জানতে চান—এমন ঘটনা কর্তৃপক্ষ কীভাবে শনাক্ত করে।
এছাড়াও তিনি খোঁজ করেছিলেন গাড়ির ভিআইএন (VIN) নম্বর পরিবর্তন, লাইসেন্স ছাড়া অস্ত্র রাখা, গুলির শব্দ প্রতিবেশীরা শুনতে পাবে কি না এবং “ঝুঁকিপূর্ণ নিখোঁজ ব্যক্তি” বলতে কী বোঝায়—এসব বিষয়ে।
এসব ডিজিটাল অনুসন্ধান এবং কালো ব্যাগ, পরিষ্কার করার সামগ্রী ও ডাক্ট টেপ কেনার তথ্য—সব মিলিয়ে তদন্তকারীদের কাছে পূর্বপরিকল্পনার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরে রক্তের চিহ্নও পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে।
ত্রিভুজ প্রেম: সম্ভাব্য মোটিভ
তদন্তকারীরা এখন যে তত্ত্বটির উপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তা হলো—একটি ত্রিভুজ প্রেম।
লিমন ও বৃষ্টি যে পরস্পর প্রেমের সম্পর্কে আবদ্ধ ছিলেন, তা পরিষ্কার। তবে ধারণা করা হচ্ছে, অভিযুক্তের পক্ষ থেকেও বৃষ্টির প্রতি এক ধরনের আগ্রহ বা অনুভূতি তৈরি হয়েছিল।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এই একতরফা অনুভূতি, ঈর্ষা বা মানসিক দ্বন্দ্ব থেকেই সহিংসতার সূত্রপাত হতে পারে।
এই তত্ত্বকে আরও জোরদার করেছে একটি তথ্য—লিমন তার পরিবারের কাছে আগেই অভিযোগ করেছিলেন, তার রুমমেট “অমিশুক, অস্বস্তিকর এবং কিছুটা সাইকোপ্যাথিক আচরণ” করতেন।
বিভিন্ন বক্তব্যে অসঙ্গতি
জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত একাধিকবার ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। কখনও বলেছেন, তিনি দম্পতিকে কোথাও নামিয়ে দিয়েছেন। আবার কখনও বলেছেন, বৃষ্টির “ওখানে থাকা উচিত ছিল না।”
এই বক্তব্যগুলো তদন্তকারীদের কাছে ইঙ্গিত দেয়—ঘটনাটি হয়তো পরিকল্পিতভাবে লিমনকে লক্ষ্য করে শুরু হলেও, বৃষ্টির উপস্থিতির কারণে তা দ্বৈত হত্যাকাণ্ডে রূপ নেয়।
বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রবাসী সমাজে শোক
এই হত্যাকাণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গভীর শোক নেমে এসেছে। দুই শিক্ষার্থীই ছিলেন মেধাবী, পরিশ্রমী এবং সম্ভাবনাময়।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য কাউন্সেলিং সেবা চালু করেছে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনা করছে।
টাম্পার বাংলাদেশি কমিউনিটিতেও নেমে এসেছে শোকের ছায়া—দূর দেশে এসে উচ্চশিক্ষা নিতে গিয়ে দুই তরুণ প্রাণের এমন পরিণতি সবাইকে নাড়া দিয়েছে।
আইনি প্রক্রিয়া ও সম্ভাব্য শাস্তি
অভিযুক্ত বর্তমানে জামিন ছাড়াই আটক রয়েছেন। ফ্লোরিডার আইনে প্রথম ডিগ্রি পূর্বপরিকল্পিত হত্যার জন্য দোষী সাব্যস্ত হলে তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড কিংবা মৃত্যুদণ্ড হতে পারে।
তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
তদন্তকারীরা এখন খুঁজছেন—অভিযুক্তের বৃষ্টির প্রতি অনুভূতির প্রকৃতি কী ছিল, ঘটনার আগে কোনো নির্দিষ্ট বিরোধ বা ঈর্ষা কাজ করছিল কি না, এবং কীভাবে একটি সাধারণ রুমমেট সম্পর্ক এত ভয়াবহ পরিণতিতে পৌঁছাল।
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে ডিজিটাল তথ্য, সাক্ষ্য এবং ফরেনসিক প্রমাণ বিশ্লেষণ চলছে।
শেষ কথা
এই ঘটনা শুধু একটি দ্বৈত হত্যাকাণ্ড নয়—এটি প্রবাসে থাকা তরুণদের জীবন, সম্পর্ক, মানসিক চাপ এবং একাকীত্বের জটিল বাস্তবতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
একই সঙ্গে এটি দেখিয়েছে, আধুনিক প্রযুক্তি—বিশেষ করে এআই ও ডিজিটাল পথরেখা—কীভাবে অপরাধ তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তদন্ত এখনও চলছে। ত্রিভুজ প্রেমের তত্ত্বটি এখনো প্রমাণিত নয়, তবে এটি এই ভয়াবহ ঘটনার একটি শক্তিশালী সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসেবে সামনে এসেছে।
এই মর্মান্তিক ঘটনার সম্পূর্ণ সত্য উন্মোচিত হতে সময় লাগতে পারে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—একটি সাধারণ সহবাসের সম্পর্ক কীভাবে অদৃশ্য দ্বন্দ্ব, ঈর্ষা ও সহিংসতায় রূপ নিতে পারে, তার এক শীতল উদাহরণ হয়ে উঠেছে এই ঘটনা।

