উন্নয়ন কর্মে চরম মন্দা, এবার ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন এডিপি বাস্তবায়ন

৯ মাসে মাত্র ৩৬% ব্যয়। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ধীরগতিতে চাপে অর্থনীতি। রাজনৈতিক পরিবর্তন ও প্রশাসনিক অনিশ্চয়তায় এডিপি বাস্তবায়নে চরম মন্দা।

বাংলাদেশে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে চরম ধীরগতি শুরু হয়েছে। চলতি অর্থবছর সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে নিচে নেমে এসেছে। কমে গেছে কর্মসংস্থান। ফলে দারিদ্র বিমোচন ও দেশের সামগ্রিক উন্নয়নধারা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ—Implementation Monitoring and Evaluation Division (আইএমইড)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই–মার্চ) উন্নয়ন বাজেটের মাত্র ৩৬.১৯ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে—যা গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

এই সময়ে উন্নয়ন ব্যয় হয়েছে ৭৫ হাজার ৬০৭ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা কম। মার্চ মাসেও ব্যয়ের গতি কমেছে। ফলে ইতোমধ্যে বড় অঙ্কে বার্ষিক উন্নয়ন বাজেট এডিপি (Annual Development Programme-ADP) কাটছাঁট করতে হয়েছে।

২০ বছরের তুলনায় কোথায় দাঁড়িয়েছে বাস্তবায়ন

গত দুই দশকের প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাধারণত অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে এডিপি বাস্তবায়ন ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশের মধ্যে থাকত। যেমন—

  • ২০২১–২২ অর্থবছরে ছিল প্রায় ৪৫ শতাংশ
  • ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ছিল ৪২ শতাংশের বেশি
  • ২০২৪–২৫ অর্থবছরেও অস্থিরতার মধ্যেও হার ছিল ৩৬.৬৫ শতাংশ

কিন্তু চলতি বছরে তা নেমে এসেছে ৩৬ শতাংশে—যা শুধু সাম্প্রতিক সময় নয়, পুরো দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল পারফরম্যান্স।

এছাড়া ২০২৫ অর্থবছরে সংশোধিত এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছিল মাত্র ৬৮ শতাংশ—যা ১৯৭৬–৭৭ সালের পর সর্বনিম্ন। ফলে ধারাবাহিকভাবে উন্নয়ন ব্যয়ের গতি কমছে।

খাতভিত্তিক উন্নয়নের চিত্র: কোথায় কত পিছিয়ে

এডিপির বড় অংশই কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়। মোট বরাদ্দের প্রায় ৭১ শতাংশ গেছে ১৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে। কিন্তু এসব খাতেই দেখা যাচ্ছে বড় ধরনের বৈষম্য।

স্বাস্থ্য খাত
সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে স্বাস্থ্য খাত। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের বাস্তবায়ন হার প্রায় ২১ শতাংশ। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগে অনেক ক্ষেত্রে ব্যয় আরও কম। এমনকি কিছু প্রকল্পে ৩ শতাংশেরও কম অর্থ খরচ হয়েছে।

রেল ও শিক্ষা খাত
রেলপথ মন্ত্রণালয়ে বাস্তবায়ন প্রায় ২৩.৬৪ শতাংশ। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রায় ২৫ শতাংশ। অর্থাৎ শিক্ষা ও পরিবহন—দুই গুরুত্বপূর্ণ মানবসম্পদ খাতেই অগ্রগতি খুবই ধীর।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে বাস্তবায়ন প্রায় ৩১ শতাংশ। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে প্রায় ৩৫ শতাংশ। কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগেও ৩০–৩৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে।

মাঝামাঝি অবস্থায় থাকা খাত
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে তুলনামূলক ভালো অগ্রগতি বলা হলেও তা অর্ধেকের কাছাকাছি। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে বাস্তবায়ন ৫০ শতাংশের বেশি। কৃষি মন্ত্রণালয়ে প্রায় ৫৫ শতাংশ। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়েও ৫০ শতাংশের বেশি বাস্তবায়ন হয়েছে।

অবকাঠামো ও উৎপাদনমুখী খাতে কিছু অগ্রগতি থাকলেও সামাজিক খাতগুলো ভয়াবহভাবে পিছিয়ে পড়েছে।

কেন কমছে উন্নয়ন ব্যয়

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একাধিক কারণে এই ধীরগতি তৈরি হয়েছে।

প্রথমত, বড় ধরনের রাজস্ব ঘাটতি। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই প্রায় এক লাখ কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে সরকার বাধ্য হয়ে বেতন, ভর্তুকি ও ঋণের সুদ পরিশোধকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থছাড় কমে যাচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক পরিবর্তন। ২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী প্রশাসনের সময় অনেক প্রকল্প পরিচালক দায়িত্ব ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। নতুন নিয়োগে সময় লাগে। ফলে প্রকল্পের ধারাবাহিকতা ভেঙে যায়।

তৃতীয়ত, প্রশাসনিক জটিলতা। অনুমোদন, দরপত্র, ক্রয়—সব ধাপে দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। নতুন ক্রয়নীতি চালুর পর দরপত্র প্রক্রিয়া আরও ধীর হয়েছে।

চতুর্থত, প্রকল্প পরিকল্পনার দুর্বলতা। সম্ভাব্যতা যাচাই সঠিকভাবে না হওয়ায় পরে নকশা পরিবর্তন, ব্যয় বৃদ্ধি এবং সময়ক্ষেপণ হয়।

পঞ্চমত, জমি অধিগ্রহণের জটিলতা ও মামলা। এতে প্রকল্প শুরুতেই দীর্ঘ সময় নষ্ট হয়।

স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি

সামাজিক খাতের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক।

র‌্যাপিড-এর গবেষণা পরিচালক মো. দীন ইসলাম বলেন,
“স্বাস্থ্যখাতে এই দুর্বলতা শাসনব্যবস্থার গভীর সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে ভয় কাজ করে, বিশেষ করে ক্রয় সংক্রান্ত বিষয়ে জবাবদিহিতার চাপ থাকলে।”

বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ মানুষকে নিজের পকেট থেকে দিতে হয়। ফলে স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ কমে গেলে দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর চাপ আরও বাড়ে। দীর্ঘমেয়াদে এটি দারিদ্র্য বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করে।

অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক প্রভাব

উন্নয়ন ব্যয় কমে গেলে তার প্রভাব সরাসরি কর্মসংস্থানে পড়ে। নির্মাণ, পরিবহন, সরবরাহ—সব খাতেই কাজ কমে যায়। এতে দিনমজুর ও নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

একই সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (National Board of Revenue) এনবিআরের এর রাজস্ব আদায়ও কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারণ উন্নয়ন প্রকল্প থেকেই বড় অংশের আয়কর ও ভ্যাট আসে।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রধান অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান বলেন, “জাতীয় নির্বাচন, রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক অস্থিরতা—সব মিলিয়ে উন্নয়নে ব্যয় কমে গেছে।”

তিনি মনে করেন, বছর শেষে মোট বাস্তবায়ন হার ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশের মধ্যে থাকতে পারে।

প্রকল্প পর্যালোচনা ও অনিশ্চয়তা

বর্তমান প্রশাসন প্রায় ১,৩০০টি প্রকল্প পর্যালোচনা করছে। নতুন অগ্রাধিকারের সঙ্গে মিলিয়ে কিছু প্রকল্প সংশোধন বা বাতিল হতে পারে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তাফা কে মুজেরি বলেন,
প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন স্বাভাবিক হলেও এতে সময় লাগে। শুধু পরিসংখ্যান ভালো দেখাতে তড়িঘড়ি ব্যয় বাড়ানো উচিত নয়।

এই পর্যালোচনার কারণে অনেক প্রকল্পে অর্থছাড় কমে গেছে, কাজের গতি কমেছে।

সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

অর্থবছরের বাকি তিন মাসে সরকারকে মোট এডিপির প্রায় ৬৪ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে হবে—যা বাস্তবে খুবই কঠিন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধারা চলতে থাকলে—

  • অবকাঠামো উন্নয়ন ধীর হবে
  • কর্মসংস্থান কমবে
  • অর্থনীতির গতি দুর্বল হবে

সবচেয়ে বড় কথা, উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে মানুষের হাতে যে অর্থ পৌঁছায়, তা কমে যাবে। এতে দারিদ্র্য কমানোর অগ্রগতি থেমে যেতে পারে।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles