জ্বালানি সংকটে টেলিকম সেবা বন্ধের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

জ্বালানি তেলের সরবরাহে ঘাটতির কারণে ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্কে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা

জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে সারাদেশে মোবাইল ও ইন্টারনেট সেবায় বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সরকার জ্বালানি তেল সরবরাহ নিয়মিত রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় দেশের টেলিযোগাযোগ খাত এখন গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট খাতের কর্মকর্তারা।

সোমবার (২০ এপ্রিল) বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)-এর কাছে পাঠানো এক চিঠিতে অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশ (এএমটিওবি) জানায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে টেলিযোগাযোগ সেবা সচল রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। জ্বালানির ঘাটতি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা মিলিয়ে অপারেটররা তাদের নেটওয়ার্ক চালু রাখতে হিমশিম খাচ্ছে।

চিঠিতে এএমটিওবি উল্লেখ করে, “পরিস্থিতি এখন অপারেশনাল নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।” একই সঙ্গে তারা সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, “এই অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বড় পরিসরে টেলিকম নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”

বাংলাদেশ প্রায় ৯৫ শতাংশ জ্বালানি তেল ও গ্যাস আমদানি করে, যার বড় অংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় দেশে জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে টেলিকম অবকাঠামোর ওপর, বিশেষ করে ডেটা সেন্টারগুলোর কার্যক্রমে।

এএমটিওবির তথ্যমতে, একটি ডেটা সেন্টার সচল রাখতে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। দৈনিক হিসেবে এই চাহিদা প্রায় ৪,০০০ লিটার। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে স্থানীয় ফিলিং স্টেশনগুলো থেকে এই পরিমাণ জ্বালানি সংগ্রহ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ টেলিকম স্থাপনা এখন খুব সীমিত জ্বালানি মজুদের ওপর নির্ভর করে চলছে।

এ বিষয়ে এএমটিওবির মহাসচিব মোহাম্মদ জুলফিকার আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপিকে বলেন, “আংশিক বা পূর্ণাঙ্গ নেটওয়ার্ক বিপর্যয় ঘটলে কল, ইন্টারনেট, এসএমএস—সব ধরনের সেবা বন্ধ হয়ে যেতে পারে বা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।” তিনি আরও বলেন, “ডেটা সেন্টারগুলোই পুরো নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র। এগুলো বন্ধ হয়ে গেলে ইন্টারনেট অত্যন্ত ধীর হয়ে যেতে পারে, এমনকি পুরোপুরি বন্ধও হয়ে যেতে পারে।”

জ্বালানি সংকটের মধ্যে গত শনিবার সরকার ডিজেল ও পেট্রোলের দাম বাড়িয়েছে। ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা এবং পেট্রোলের দাম ১১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে দাম বাড়ানোর পরও সরবরাহ পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

রোববার (১৯ এপ্রিল) সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, “বিশ্ববাজারের পরিস্থিতির কারণে এই দাম সমন্বয় করতে হয়েছে। পুরো বিশ্বই দাম বাড়িয়েছে—যুক্তরাষ্ট্রও এর বাইরে নয়।”

তবে মাঠপর্যায়ে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন অব্যাহত রয়েছে। অনেককে ১০ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে জ্বালানি নিতে।

ঢাকার মোটরসাইকেল চালক মো. সাগর বলেন, “তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও খুব বেশি এগোতে পারিনি।” অপরদিকে গাড়িচালক জাকির মিয়া জানান, “একটু তেল নিতে আমাকে প্রায় ১৬ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। অনেক জায়গায় মানুষ ১০-১২ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে আছে।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টেলিকম সেবা বন্ধ হয়ে গেলে এর প্রভাব শুধু যোগাযোগ খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ব্যাংকিং, অনলাইন লেনদেন, জরুরি সেবা, এমনকি সরকারি কার্যক্রমও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। এতে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও জনজীবনে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এই পরিস্থিতি আবারও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলাদেশের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। বিশ্লেষকদের মতে, বিকল্প জ্বালানি উৎসে বিনিয়োগ, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং কৌশলগত মজুত ব্যবস্থাপনা জোরদার করা না গেলে ভবিষ্যতে এমন সংকট আরও গভীর আকার ধারণ করতে পারে।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles