দেড় মাসের শিশু-সন্তানসহ কারাগারে পাঠানো হলো যুবনেত্রী শিল্পীকে

আদালত প্রাঙ্গণে হৃদয়বিদারক দৃশ্য। বিস্ফোরক মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে জামিন নামঞ্জুর; রাজনৈতিক হয়রানির অভিযোগ আসামিপক্ষের

দেড় মাসের শিশু-সন্তানসহ যুব মহিলা লীগ নেত্রী শিল্পী বেগমকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। রাজধানীর তেজগাঁও থানায় দায়ের করা বিস্ফোরক আইনের একটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। আদালতের এই আদেশের ফলে আদালত প্রাঙ্গণে তৈরি হয় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য—দেড় মাস বয়সী দুধের শিশুকে কোলে নিয়ে এক মা দাঁড়িয়ে আছেন বিচারিক আদালতের সামনে।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সোমবার সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে তেজগাঁও থানার রেলওয়ে কলোনি স্টেশন রোডের নিজ বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে সরকারের পক্ষ থেকে আদালতকে জানানো হয়। তবে রাখি ও তার আইনজীবীরা বলছেন, মামলাটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার জন্য সারাদেশে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নামে এ ধরনের হাজার হাজার মামলা দায়ের করা হয়েছে।

মাত্র দেড় মাস বয়সী পুত্রসন্তান কাইফা ইসলাম সিমরানকে সঙ্গে নিয়ে শিল্পী বেগমকে আদালতে হাজির করা হয়। আজ ঢাকার অতিরিক্ত মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আওলাদ হোসাইন মুহাম্মদ জোনাইদ শুনানি শেষে তার জামিন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

মঙ্গলবার দুপুর ২টার দিকে তাকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। পরে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক শেখ নজরুল ইসলাম তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন। আবেদনে বলা হয়, আসামির বিরুদ্ধে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার যথেষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং তদন্তের স্বার্থে তাকে কারাগারে রাখা প্রয়োজন।

অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাখি জামিন চেয়ে আবেদন করেন। তিনি বলেন, এমন কোনো ঘটনার সঙ্গে রাখি জড়িত নন। মামলাটি সম্পূর্ণরূপে রাজনৈতিক হয়রানিমূলক।

তিনি আদালতে উল্লেখ করেন, শিল্পী বেগম একজন সিজারিয়ান অপারেশনের রোগী এবং তার মাত্র ১ মাস ১৬ দিনের শিশু সন্তান রয়েছে। মানবিক দিক বিবেচনায় তার জামিন প্রার্থনা করা হয়।

শুনানি শেষে আদালত জামিন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

রায় ঘোষণার পর বিকেল ৩টা ১২ মিনিটে তাকে আদালত থেকে বের করা হয়। এ সময় আদালত চত্বরের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। কিছুক্ষণ পর তার কোলে তুলে দেওয়া হয় দেড় মাস বয়সী শিশুকে।

আদালতের বারান্দায় বসেই শিশুকে দুধ খাওয়ান তিনি—একটি নিস্তব্ধ, ভারী মুহূর্তে আদালত প্রাঙ্গণ যেন থমকে যায়। পরে সেই দুধের শিশুকে কোলে নিয়েই তাকে হাজতখানায় নেওয়া হয়।

এ সময় কান্নাজড়িত কণ্ঠে শিল্পী বেগম অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক কারণে তাকে শিশুসন্তানসহ কারাগারে যেতে হচ্ছে।

মামলার নথি অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. তাহমিদ মুবিন রাতুল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই চানখাঁরপুল এলাকায় আওয়ামী লীগ সরকার উৎখাতের জন্য আন্দোলন চলাকালে তিনি গুলিবিদ্ধ হন।

উল্লেখ্য, সশস্ত্র ওই আন্দোলনে বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছিল। মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে সেনাসমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও পুলিশ সদস্যদের হত্যার জন্য আন্দোলনকারীদের দায়মুক্তি দিয়ে আইন পাস করে। এরপর আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার হত্যার দায়মুক্তি অব্যাহত রেখেছে। অথচ নানা কাল্পনিক ঘটনায় আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের আসামি বানিয়ে গ্রেপ্তার করা অব্যাহত রয়েছে।

আলোচ্য মামলার বর্ণনা অনুযায়ী, পরবর্তীতে ২৩ জুলাই সন্ধ্যায় মামলার এজাহারনামীয় আসামিসহ প্রায় ১২০–১৩০ জন দেশীয় অস্ত্র, পিস্তল ও বোমা নিয়ে তার বাসায় হামলা চালায় বলে অভিযোগ করা হয়। এতে ভাঙচুর, লুটপাট ও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে এবং তার বাবাকে মারধর করা হয় বলেও মামলায় উল্লেখ রয়েছে। আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বাসায় হামলার এই কাহিনিগুলো সম্পূর্ণ কাল্পনিক বলে দাবি করেছেন।

এরকম ঘটনা উল্লেখ করে ৬ মাস পর, ২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি তেজগাঁও থানায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নামে মামলাটি দায়ের করা হয়।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles