ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউর সাদা আলোয় নিস্তব্ধ হয়ে শুয়ে ছিলেন ৭৫ বছরের প্রবীণ রাজনীতিক নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন। বিছানায় স্যালাইন ঝুলছিল, অক্সিজেন লাইন শরীরের সঙ্গে লেপ্টে ছিল, আর ডান হাতের কব্জিতে ভারী লোহার হাতকড়া। মৃত্যুর পরও সেই হাতকড়া খোলা হয়নি। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে সেই ছবি।
একসময় মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্রধরা তরুণ যোদ্ধা, জীবনভর মানুষের কল্যাণে কাজ করা জননেতা এবং শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভায় শিল্পমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা জনপ্রিয় মানুষটির শেষ দিনগুলো কেটেছে শৃঙ্খলে বন্দি হয়ে। মুহাম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকারের চরম প্রতিহিংসা ও মানবতা বিরোধী কর্মকাণ্ডের অসংখ্য শিকারের একজন হয়ে গত ২৪ সেপ্টেম্বর তাকে মরতে হয়েছে।
“একজন মৃত্যুপথযাত্রী মানুষকে শিকলে বাঁধা—এ শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়, এটি এক জাতির বিবেককে আহত করার মতো ঘটনা,” ভয়েসকে বলেছেন তাঁর সহযোদ্ধা ও মানবাধিকার কর্মী তাজুল ইমাম।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র আন্দোলন আর সহিংস বিক্ষোভের পর শেখ হাসিনার পতনের পরপরই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগ ছিল ভাঙচুর ও হত্যায় জড়িত থাকার। “বয়স, শারীরিক অবস্থা এবং তাঁর সারাজীবনের অহিংস রাজনৈতিক পটভূমিই প্রমাণ দিচ্ছে, এসব আদৌ কোনো মামলা নয়, বরং অপরাধমূলক সরকারের প্রতিহিংসা,” বলেন তাজুল।
হুমায়ূনের মৃত্যু শুধুই একজন নেতার প্রয়াণ নয়। তাঁর হাতকড়া পরা নিথর দেহ আজ প্রতীক হয়ে উঠেছে বাংলাদেশে চলমান মানবাধিকার সংকটের।

আদালতের রায় উপেক্ষিত
২০১৮ সালে হাইকোর্ট স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিল, অসুস্থ বা মৃত্যুপথযাত্রী বন্দিকে নির্বিচারে হাতকড়া পরানো যাবে না। বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)-এর করা মামলার রায়ে এই নির্দেশ আসে।
ব্লাস্টের আইনজীবী আবু ওবায়েদুর রহমান হুমায়ূনের ছবিকে “সরাসরি আদালতের রায়ের লঙ্ঘন” আখ্যা দিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন: “৭৫ বছরের এক অসুস্থ মানুষকে পালানোর ঝুঁকি হিসেবে দেখা কিভাবে যুক্তিযুক্ত হতে পারে?”
“একজন মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক মন্ত্রী, প্রবীণ রাজনীতিক—যিনি মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে—তাঁকে শিকলে বেঁধে রাখা কেবল মানবতার বিরোধিতা নয়, এটি রাষ্ট্রের দায়িত্বহীনতার চরম বহিঃপ্রকাশ,” বলেছেন মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফায়জুল কবির।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থা একযোগে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা বলেছে, বাংলাদেশ জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কনভেনশনের সইকারী দেশ, তাই মৃত্যুপথযাত্রী একজন বন্দিকে হাতকড়া পরানো সরাসরি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন।
বিরোধীদের দমন, সমর্থকদের জন্য দায়মুক্তি
হুমায়ূনের মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং এটি এখন প্রতীক হয়ে উঠেছে বিরোধী রাজনৈতিক দমননীতির। ইউনুসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আওয়ামী লীগকে যেভাবেই হোক খতম করার কৌশল নিয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ব্যাপক হারে গ্রেপ্তার করেছে।
সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৫ প্রকাশিত পুলিশের সদর দপ্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৩ মাসে অন্তত ৪৪ হাজার ৪৭২ জন আওয়ামী লীগ–সমর্থিত বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অধিকাংশই বিচারহীন অবস্থায় কারাগারে পড়ে আছেন। আদালতে হাজির করার সময় তাদের ওপর বারবার হামলার ঘটনাও ঘটেছে। হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে, আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনের সময় যারা সহিংসতা চালিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার সুযোগ রুদ্ধ করেছে সরকার। ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক আদেশে জানায়, ১৫ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত “গণঅভ্যুত্থান সফল করতে যারা মাঠে কাজ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা, গ্রেপ্তার বা হয়রানি করা যাবে না।” সমালোচকরা এটিকে কার্যত দায়মুক্তি বা ইন্ডেমনিটি হিসেবে অভিহিত করেছেন।
২০২৪ সালের জুলাই থেকে আগস্ট পর্যন্ত আন্দোলনের সময় সহিংসতায় শত শত আওয়ামী লীগ সমর্থক নিহত হয়। পুলিশ স্টেশন ও সরকারি স্থাপনায় হামলায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার অভিযোগ ওঠে। বিরোধীরা দাবি করে, আন্দোলনকারীদের হাতে নিহত পুলিশের সংখ্যা তিন হাজার ছাড়িয়েছে। অথচ ইউনূস প্রশাসন স্বীকার করে মাত্র ৪৪ জন পুলিশ নিহত হয়েছে।
”এসব হত্যার তদন্ত ও বিচার বন্ধ করতে বিস্ময়কর সরকারী আদেশ আওয়ামী লীগবিরোধী ইসলামী মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোকে সুযোগ, আর আওয়ামী লীগপন্থীদের প্রতিহিংসার সহজ শিকারে পরিণত করেছে,” বলছেন মানবাধিকার কর্মীরা।
সংখ্যালঘুদের উপর তাণ্ডব
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) জানায়, শেখ হাসিনার পতনের পর মাত্র চার দিনে ৩১৮ জন নিহত হয়।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের তথ্যমতে, ৪ আগস্ট থেকে ২০ আগস্টের মধ্যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর অন্তত ২,০১০টি সহিংস হামলা, হত্যা ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, দোকান লুটপাট হয়—অভিযোগ ওঠে যে, এসব হামলা প্রো-ইউনূস গোষ্ঠীর ছত্রছায়াতেই হয়েছে।
শুধু রাজনৈতিক নেতাই নন—আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীরাও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। কেউ চাকরি হারিয়েছেন, কারও স্বীকৃতি কেটে দেওয়া হয়েছে, আবার কারও বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, সরকারপন্থী গোষ্ঠীগুলো অবাধে তাদের প্রচারণা চালাতে পেরেছে।
সংবাদপত্রের কণ্ঠ রুদ্ধ
সরকারি নির্দেশে সংবাদপত্রগুলো আওয়ামী লীগের কোনো বক্তব্য প্রকাশ করতে পারছে না। শুধু সমালোচনা প্রকাশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন—বিধি ভাঙলে কঠোর শাস্তি হবে। সচিবালয়ে প্রবেশাধিকারও সীমিত করে দেওয়া হয়েছে কেবল সরকার–সমর্থক সাংবাদিকদের জন্য। প্রায় ৫০০ সাংবাদিককে গণহারে হত্যা মামলার আসামী করে মুখ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
বিচার না প্রতিশোধ?
অন্তর্বর্তী সরকার বলছে, নুরুল মজিদদের গ্রেপ্তার ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার বিপ্লবী প্রয়াস। তারা বলছে শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে দুর্নীতি ও স্বৈরাচার ঘটেছে জন্য এখন প্রতিকার করা হচ্ছে। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, এটি আসলে এক নির্মম প্রতিশোধের রাজনীতি।
বাংলাদেশ যখন ২০২৫ সালের নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে, তখন নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূনের মৃত্যুশয্যায় হাতকড়ার সেই ছবি দেশবাসীর কাছে প্রতিশোধের চেয়ে মানবতার ক্ষয়িষ্ণু চিত্রকে আরও প্রকট করে তুলেছে।
এটি এক ভীতিকর প্রশ্ন তুলেছে—আমরা কি এমন এক রাষ্ট্রের দিকে এগোচ্ছি, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বীরা শৃঙ্খলে মারা যাবে আর সমর্থকেরা দায়মুক্তি পাবে?

