দেইর আল-বালাহ, কেন্দ্রীয় গাজা — দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের ক্লান্তি যেন স্পষ্ট গাজার প্রতিটি পরিবারে। ভাঙা ঘরবাড়ি, অস্থায়ী তাঁবু আর ধ্বংসস্তূপের ভেতরেই দিন কাটছে বাস্তুচ্যুত হাজারো মানুষের।
এই প্রেক্ষাপটে খবর এলো—হামাস যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া ২০ দফা শান্তি প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। এই ঘোষণা গাজার শরণার্থীদের মনে নতুন করে আশা জাগালেও গভীর সংশয়ও রয়েছে তাদের চোখে।
২৮ বছর বয়সী আরিজ আয়ুশ বলেন, “আমি বিশ্বাস করি এবার যুদ্ধবিরতি হবে। সবাই এতটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে যে এর বিকল্প নেই।”
কিন্তু আশার পাশাপাশি হতাশার কথাও শোনা যায়। লিনা তাহা, যিনি পরিবার নিয়ে দেইর আল-বালাহর একটি অস্থায়ী আশ্রয়ে আছেন, হতাশ কণ্ঠে বলেন, “দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে একই কথা বলা হচ্ছে—শান্তিচুক্তি আসছে, যুদ্ধ থামছে। কিন্তু কিছুই হয়নি। আমাদের শুধু মিথ্যে আশাই দেওয়া হয়।”
হামাসের ঘোষণা ও ট্রাম্পের প্রস্তাব
হামাস জানিয়েছে, তারা সব ইসরায়েলি জিম্মি মুক্তি দিতে প্রস্তুত এবং অবিলম্বে আলোচনায় বসতে চায়, যাতে ট্রাম্পের প্রস্তাবের খুঁটিনাটি পরিষ্কার হয়। ট্রাম্প এই সাড়া ইতিবাচক হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং ইসরায়েলকে বোমা হামলা থামানোর আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে জিম্মি মুক্তি প্রক্রিয়া এগোতে পারে।
তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু শর্তসাপেক্ষে সমর্থন জানালেও মূল বিষয়গুলো—বিশেষ করে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং গাজার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ—নিয়ে দ্বিধান্বিত অবস্থান বজায় রেখেছেন।
গাজার বাস্তবতা
আলোচনা যতই চলুক, গাজার মানুষ প্রতিদিন মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়েই বাঁচছে। বিমান হামলায় নিয়মিত প্রাণ হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ, হাসপাতালগুলোতে জায়গা নেই, খাবার ও পানির অভাব প্রকট।
অন্যদিকে, জিম্মি সংকট সমাধান যে কোনো শান্তিচুক্তির মূল শর্ত। ২০২৩ সালের হামলার পর থেকে শতাধিক ইসরায়েলি জিম্মি নেওয়া হয়; কয়েকজন ফেরত এলেও অনেকে এখনো বন্দি বা নিখোঁজ। এই সমস্যা না মিটলে কোনো স্থায়ী শান্তি আসবে না।
কেনো এখনো আশা জেগে আছে
গাজার অনেকেই বলছেন, মানুষের অতিরিক্ত ক্লান্তি এবং ভোগান্তিই এখন শান্তির দিকে ধাবিত করছে সবাইকে। হামাস প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনায় আগ্রহী হয়েছে, এটিও সাধারণ মানুষকে কিছুটা আশাবাদী করছে।
একই সঙ্গে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর চাপও বাড়ছে। মিশর, কাতার ও তুরস্ক—সবাই হামাসকে প্রস্তাব মেনে নিতে বলছে। আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের মতে, দীর্ঘদিন পর এটিই শান্তি আলোচনার সবচেয়ে বড় সুযোগ।
তবে বাধাও অনেক
তবুও সামনে বহু অচলাবস্থা রয়েছে:
- হামাসের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে ভিন্নমত
- ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার শর্ত
- গাজার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ কে নেবে, সেই অনিশ্চয়তা
- অতীতের ভঙ্গ প্রতিশ্রুতির কারণে সাধারণ মানুষের অবিশ্বাস
সামনে কী অপেক্ষা করছে
যদি পরিকল্পনা সফল হয়, যুদ্ধের মোড় ঘুরে আলোচনার পথে অগ্রসর হতে পারে। সাধারণ মানুষের জন্য এর মানে হবে যুদ্ধবিরতি, মানবিক সাহায্য প্রবাহের সুযোগ, এবং হয়তো পুনর্গঠনের পথচলা।
কিন্তু ব্যর্থ হলে আবারও রক্তপাত, অনিশ্চয়তা ও হতাশার ঘূর্ণিতে পড়বে গাজা।
দেইর আল-বালাহর শরণার্থীরা তাই দ্বিধায়—আশা করছেন শান্তি আসবে, আবার ভয়ে আছেন অতীতের মতো এবারও যেন প্রতিশ্রুতি ভেঙে না যায়।

