ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি: রবিবারের মধ্যে শান্তি প্রস্তাব না মানলে হামাসের জন্য “অভূতপূর্ব নরক”

হামাসকে বন্দি মুক্তি ও যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে রাজি করাতে ব্যস্ত মধ্যস্থতাকারীরা, গাজায় অব্যাহত ইসরায়েলি অভিযান ও ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হামাসকে চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। রবিবার ওয়াশিংটন সময় সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে (বাংলাদেশ সময় সোমবার রাত ৪টা) গাজা যুদ্ধবিরতির মার্কিন শান্তি প্রস্তাব মেনে নিতে হবে—না হলে “অভূতপূর্ব নরক নেমে আসবে” বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।

শুক্রবার নিজের ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে ট্রাম্প লিখেছেন, “এটি হামাসের জন্য শেষ সুযোগ। যদি সমঝোতা না হয়, তবে এমন নরক নেমে আসবে যা এর আগে কেউ কখনো দেখেনি। যে কোনোভাবে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে।”

ট্রাম্পের প্রস্তাব: অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করতে হবে এবং ৭২ ঘণ্টার মধ্যে হামাসকে জীবিত ২০ জন ইসরায়েলি বন্দিকে মুক্তি দিতে হবে। একইসঙ্গে নিহত বলে ধারণা করা বন্দিদের মৃতদেহও ফেরত দিতে হবে। এর বিনিময়ে শত শত ফিলিস্তিনি বন্দিকে ছেড়ে দেবে ইসরায়েল এবং গাজায় ব্যাপক মানবিক সাহায্য প্রবাহিত হবে।

হামাসের ভেতরে বিভক্তি

মধ্যস্থতার চেষ্টা চালাচ্ছে আরব ও তুর্কি কূটনীতিকরা। তবে হামাসের অভ্যন্তরে মতভেদ স্পষ্ট। গাজার সামরিক শাখার প্রধান ইতিমধ্যে প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছেন। তিনি মনে করেন, একসঙ্গে সব বন্দি মুক্তি দিলে হামাসের হাতে আর কোনো চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার থাকবে না।

অন্যদিকে কাতারে থাকা হামাসের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সমঝোতার পক্ষে কিছুটা নমনীয় অবস্থান নিয়েছে, যদিও তাদের হাতে বন্দিদের নিয়ন্ত্রণ নেই।

শান্তি পরিকল্পনার কাঠামো

গত সোমবার হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যৌথভাবে ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। এতে বলা হয়েছে, যুদ্ধ থামলে একটি “অরাজনৈতিক, কারিগরি কমিটি” গাজা পরিচালনা করবে, যা আন্তর্জাতিক সংস্থা “বোর্ড অব পিস”-এর অধীনে কাজ করবে। এই বোর্ডের প্রধান হিসেবে ট্রাম্প নিজেই থাকবেন বলে উল্লেখ রয়েছে।

প্রস্তাবে ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের পথ খোলা রাখা হলেও নেতানিয়াহু পরে স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে এমন রাষ্ট্রের বিরোধী।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ট্রাম্পের উদ্যোগকে “সততা ও দৃঢ়তা”র পরিচায়ক বলে উল্লেখ করেছে। ইউরোপীয় ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকজন নেতা পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে পাকিস্তান প্রথমে সমর্থন জানালেও পরে বলেছে, মুসলিম দেশগুলোর খসড়া প্রস্তাবের সঙ্গে মার্কিন পরিকল্পনার অমিল আছে।

গাজায় রক্তক্ষয়ী বাস্তবতা

এই আলোচনার মধ্যে গাজায় ভয়াবহ হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েলি সেনারা। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছেন, “গাজা সিটির চারপাশের অবরোধ আরও কষে ধরা হচ্ছে।”

হামাস নিয়ন্ত্রিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েল আক্রমণের পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৬৬ হাজার ২৮৮ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। শুধুমাত্র বৃহস্পতিবারই নতুন করে ৬৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দাবি করছে, অবরোধ ও সামরিক অভিযানের মূল উদ্দেশ্য বাকি বন্দিদের মুক্ত করা। তবে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে দক্ষিণাঞ্চলীয় আল-মাওয়াসিতে আশ্রয় নিতে লাখো মানুষকে বাধ্য করা হয়েছে। তবুও আরও বহু মানুষ গাজা সিটিতেই রয়ে গেছেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, সেখানে যারা থাকবে, তারা “সন্ত্রাসী বা সন্ত্রাসের সহযোগী” হিসেবে বিবেচিত হবে।

জাতিসংঘ শিশু সংস্থা ইউনিসেফের মুখপাত্র জেমস এল্ডার শুক্রবার বলেছেন, “গাজায় কথিত নিরাপদ অঞ্চল নিছক প্রহসন। আকাশ থেকে বোমা পড়ছে নিয়মিত। স্কুলগুলো, যেগুলোকে অস্থায়ী আশ্রয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, সেগুলোও মুহূর্তে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে।”

সামনে কী?

হামাস যদি বন্দি মুক্তি না দেয় এবং শান্তি পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করে, তবে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ সমর্থন নিয়ে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু।

ফলে রবিবারের সময়সীমা ঘিরে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে শ্বাসরুদ্ধকর উত্তেজনা বিরাজ করছে। গাজায় যুদ্ধবিরতির আলো যদি নিভে যায়, তবে হয়তো আরও রক্তপাত ও মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে পুরো অঞ্চলকে।

spot_img