জুরিখে অর্ধশতকে ১,৭০০ প্রাণহানি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে: অক্সফোর্ড

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন এক গবেষণা জানাচ্ছে—জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সুইজারল্যান্ডের জুরিখ ক্যান্টনে গত অর্ধশতকে তীব্র গরমে কমপক্ষে ১,৭০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ বাস্তবতার এক কড়া সতর্কবার্তা।

জুরিখে উষ্ণতার ঘাতক ছায়া

অক্সফোর্ডের স্মিথ স্কুল অব এন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড দ্য এনভায়রনমেন্ট-এর গবেষকরা ১৯৬৯ থেকে ২০১৮ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, আবহাওয়ার অস্বাভাবিকতা এবং বাড়তে থাকা গরমের কারণে প্রতিবছরই গড়ে একাধিক মৃত্যু ঘটেছে। আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার উন্নতি সত্ত্বেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মৃত্যুর হার দ্রুত বেড়েছে।

প্রধান গবেষক ড. রুপার্ট স্টুয়ার্ট-স্মিথ বলেছেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি মানুষ মারা যাচ্ছেন। ভবিষ্যতে এই মৃত্যু রোধের একমাত্র কার্যকর উপায় হলো দ্রুত ও স্থায়ীভাবে কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং জীবাশ্ম জ্বালানি ও প্রাণীজ খাদ্যের ওপর নির্ভরতা কমানো।”

বৈশ্বিক তাপমাত্রার রেকর্ড ভাঙছে প্রতিনিয়ত

এ বছরের জুন মাস ছিল ১৮৫০ সালের পর থেকে তৃতীয় উষ্ণতম জুন। শুধু এক সপ্তাহেই সুইজারল্যান্ডের ২৮২টি স্থানে তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙেছে। এই প্রবণতা প্রমাণ করে, পৃথিবী দ্রুত উষ্ণ হয়ে উঠছে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের জীবনে। বিশেষ করে প্রবীণ নাগরিক, শ্রমজীবী মানুষ এবং যাদের শীতলীকরণ ব্যবস্থার পর্যাপ্ত সুযোগ নেই—তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে।

প্রতিরোধ সম্ভব, তবে সীমিত

গবেষণা বলছে, পানি পান করা, ঘরে অবস্থান করা, ফ্যান বা এসি ব্যবহার করা—এসব সহজ পদক্ষেপ বহু মৃত্যুকে রোধ করতে পারে। ২০০৪ সালের পর থেকে এ ধরনের পদক্ষেপে প্রায় ৭০০ মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়েছে। কিন্তু মানুষ যতই অভিযোজনের চেষ্টা করুক, প্রকৃতির সব জীবের পক্ষে তা সম্ভব নয়। প্রাণীরা গরমে আশ্রয় নিতে পারে না, ফলে তাপজনিত চাপ, পানিশূন্যতা ও রোগবালাইয়ে তারা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সমাধানের পথ কোথায়?

ড. স্টুয়ার্ট-স্মিথের মতে, এই সংকট মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো বৈশ্বিক তাপমাত্রা হ্রাস করা। জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার, পরিবেশবান্ধব খাদ্যাভ্যাস, হাঁটা বা সাইকেল চালনার মতো টেকসই জীবনধারা গ্রহণ—এসব পদক্ষেপ বৈশ্বিক তাপমাত্রা কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

একই সঙ্গে ব্যক্তিগত পর্যায়ে গ্যাসচালিত চুলার পরিবর্তে ইন্ডাকশন কুকটপ ব্যবহার কিংবা গাড়ির বদলে হাঁটা ও সাইকেল বেছে নেওয়ার মতো ছোট পরিবর্তনও পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বিশ্বজুড়ে সতর্কবার্তা

জুরিখের এই গবেষণা কেবল একটি অঞ্চলের ছবি নয়, বরং বৈশ্বিক বাস্তবতার প্রতিফলন। জলবায়ু পরিবর্তন ভবিষ্যতের জন্য নয়, এখনই জীবন কেড়ে নিচ্ছে। বিজ্ঞানীদের ভাষায়, যদি এখনই নির্গমন হ্রাসে বড় পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে মৃত্যুর সংখ্যা কেবল বাড়তেই থাকবে।

spot_img