ইউক্রেনজুড়ে শনিবার রাত থেকে রবিবার ভোর পর্যন্ত আকাশজুড়ে আগুনের লেলিহান শিখা। রাশিয়া রাতভর চালায় ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা—যা সাম্প্রতিক মাসগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ। পশ্চিমের লভিভ থেকে শুরু করে দক্ষিণের জাপোরিঝিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত এই হামলায় অন্তত পাঁচজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং লাখো মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে।
লভিভে মৃত্যু, জাপোরিঝিয়ায় ধ্বংস
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, দেশজুড়ে এই হামলায় পাঁচজন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে চারজন লভিভ অঞ্চলে। লভিভের গভর্নর মাকসিম কোজিতস্কি বলেন, শহরের বেশ কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বাসাবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণের জাপোরিঝিয়ায় একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলায় এক ব্যক্তি নিহত ও নয়জন আহত হয়েছেন।
জাপোরিঝিয়ার গভর্নর ইভান ফেদোরভ জানিয়েছেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ৭৩ হাজারের বেশি গ্রাহক বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে একজন ১৬ বছর বয়সী কিশোরীও আছে।
লভিভ শহরের মেয়র আন্দ্রি সাদোভি জানান, শহরের বহু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে, গণপরিবহন বন্ধ, এবং মানুষকে ঘরের বাইরে না যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষায়, “রাস্তায় নামা এখন বিপজ্জনক।”
ইউক্রেনজুড়ে হামলা, আকাশজুড়ে আতঙ্ক
রাশিয়ার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করেছে আরও অন্তত সাতটি অঞ্চলে — ইভানো-ফ্রাঙ্কিভস্ক, চেরনিহিভ, সুমি, খারকিভ, খেরসন, ওডেসা ও কিরোভোহ্রাদে। ইউক্রেনের বিমানবাহিনী জানায়, রাশিয়া একযোগে পশ্চিম ও দক্ষিণ—দুই দিক থেকেই আঘাত হানে, যাতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে।
জেলেনস্কি এক বিবৃতিতে বলেন, “আমাদের আরও দ্রুত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বাস্তবায়ন দরকার। যত তাড়াতাড়ি এই সুরক্ষা জোরদার করা যায়, তত দ্রুত রাশিয়ার এই ‘বিমান সন্ত্রাস’-এর কোনো অর্থই থাকবে না।”
তিনি আরও বলেন, “যদি কোনো পক্ষ একতরফাভাবে আকাশে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে, সেটিই হয়তো প্রকৃত কূটনীতির পথ খুলে দিতে পারে।”
ন্যাটোর সীমান্তে তীব্র তৎপরতা
রাশিয়ার এই হামলা ইউক্রেনের পশ্চিম সীমান্তের খুব কাছে হওয়ায় প্রতিবেশী পোল্যান্ড তাৎক্ষণিকভাবে ফাইটার জেট পাঠায়। পোলিশ সামরিক বাহিনী জানায়, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও রাডার সর্বোচ্চ সতর্কতায় আছে। যদিও পোল্যান্ডের আকাশসীমা লঙ্ঘনের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি, তবুও ন্যাটো মিত্রবাহিনী যৌথ টহল শুরু করেছে।
নেদারল্যান্ডসের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানও ন্যাটোর বিমান প্রতিরক্ষা অভিযানে অংশ নেয়। পাশাপাশি লিথুয়ানিয়ায় একাধিক অজানা উড়ন্ত বস্তু শনাক্ত হওয়ার পর কয়েক ঘণ্টার জন্য রাজধানী ভিলনিয়াসের আকাশসীমা বন্ধ রাখা হয়।
কৌশলগত উদ্দেশ্য: শীতের আগে চাপ সৃষ্টি
বিশ্লেষকদের মতে, এই আক্রমণ রাশিয়ার একটি পরিচিত কৌশল—শীতের আগে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও যোগাযোগব্যবস্থাকে অচল করা। প্রতি বছর শীতের আগমনে রাশিয়া অবকাঠামোতে হামলা বাড়ায়, যাতে জনজীবন ব্যাহত হয় ও সরকার জনরোষে পড়ে।
তবে এত ব্যাপক হামলা চালাতে রাশিয়ার খরচও কম নয়। পশ্চিম ইউক্রেনের মতো দূরবর্তী এলাকায় টানা হামলা চালাতে বিশাল সরবরাহ লাইন, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন, এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ দরকার—যা দীর্ঘমেয়াদে ব্যয়বহুল ও জটিল।
রাজনৈতিক ঝুঁকি ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
রাশিয়ার এই তীব্র হামলা শুধু সামরিক নয়, রাজনৈতিক ঝুঁকিও বহন করছে। ইউক্রেন দ্রুত ‘প্যাট্রিয়ট’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চেয়ে তার মিত্রদের আহ্বান জানিয়েছে। অপরদিকে ন্যাটোর কোনো সদস্য দেশের আকাশসীমা লঙ্ঘন হলে তা বৃহত্তর যুদ্ধের সূচনা করতে পারে—এই আশঙ্কায় মিত্ররা বিশেষ সতর্ক।
২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ আক্রমণের পর থেকে দেশটি ইউক্রেনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ভূখণ্ড দখলে রেখেছে, যার মধ্যে ক্রিমিয়া ও দোনবাস অঞ্চলও অন্তর্ভুক্ত। তবে পশ্চিম ইউক্রেন, বিশেষত লভিভ, এতদিন তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ছিল। এবার সেই ধারণা ভেঙে পড়েছে।
এর আগে ২০২৪ সালের মার্চেও রাশিয়া শতাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ইউক্রেনের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালিয়েছিল। পাল্টা হিসেবে ইউক্রেন “অপারেশন স্পাইডারওয়েব” চালিয়ে রুশ ভূখণ্ডে গভীর ড্রোন হামলা করেছিল।
সামনে কী?
ইউক্রেন এখন এক সঙ্কটময় সময় পার করছে। দেশটির নেতৃত্বকে দ্রুত আরও উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পশ্চিমা মিত্ররা যদি অতিরিক্ত সহায়তা না দেয়, তবে আকাশ প্রতিরক্ষা দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
কূটনৈতিকভাবে, জেলেনস্কির প্রস্তাবিত “আকাশ যুদ্ধবিরতি” আপাতত বাস্তবায়নযোগ্য নয়, কারণ রাশিয়া কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়। তবে এই প্রস্তাবই ভবিষ্যতে শান্তি আলোচনার ভিত্তি হতে পারে বলে কূটনীতিকরা মনে করছেন।
তবে বাস্তবে ইউক্রেনীয়দের জন্য এখন প্রশ্ন একটাই — পরবর্তী সাইরেন বেজে উঠলে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরেকটি রাত টিকতে পারবে তো?

