যুক্তরাজ্যের কনজারভেটিভ পার্টি বা টোরিরা তাদের নতুন অভিবাসন পরিকল্পনায় ঘোষণা দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ধাঁচের “রিমুভালস ফোর্স” নামে ‘অভিবাসী বিতারণ পুলিশ’ বাহিনী গঠন করবে। বছরে অন্তত ১ লাখ ৫০ হাজার ‘অবৈধ অভিবাসী’কে দেশ থেকে ফেরত পাঠানোর লক্ষ্যে এই বাহিনী গঠন করা হবে।
দলটির ভাষায় এটি হবে “অভিবাসন আইন কার্যকরের এক সাহসী রূপরেখা,” যা তারা যুক্তরাজ্যের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার এক ‘নতুন যুগ’ হিসেবে উপস্থাপন করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ধাঁচে কঠোর পদক্ষেপ
দলীয় নেতা কেমি ব্যাডেনক জানিয়েছেন, নতুন ইউনিটটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের Immigration and Customs Enforcement (ICE)–এর মতোই কাজ করবে। প্রস্তাবিত এই সংস্থার জন্য বরাদ্দ ধরা হয়েছে প্রায় ১.৬ বিলিয়ন পাউন্ড।
টোরিদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন ইউনিটের কর্মকর্তারা পুলিশ ও সীমান্ত কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একযোগে কাজ করবেন এবং দ্রুত সিদ্ধান্তে অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত করে ফেরত পাঠাবেন।
দলীয় নেতারা বলেছেন, নতুন আইন পাস হলে পুলিশকে থামানো বা আটক করার সময় অভিবাসন যাচাই করার ক্ষমতা দেওয়া হবে। এছাড়া মুখ চিনে শনাক্ত করার প্রযুক্তি ব্যবহার করে অভিযানে গতি বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।
ব্যাডেনকের অবস্থান ও বিতর্ক
এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে কেমি ব্যাডেনক বলেন, “এটি একটি বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা, এবং দেশকে আবার নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দিতে আমরা সংকল্পবদ্ধ।”
তবে সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি স্পষ্ট করে বলেননি—যাদের ফেরত পাঠানো হবে, তাদের গন্তব্য কোন দেশ হবে। ব্যাডেনক ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রয়োজনে যুক্তরাজ্য European Convention on Human Rights (ECHR) থেকে বেরিয়ে আসবে, যাতে আদালতের বাধা এড়ানো যায়।
জেনরিকের কড়া মন্তব্য
শ্যাডো জাস্টিস সেক্রেটারি রবার্ট জেনরিক ডেইলি এক্সপ্রেস-এ বলেন, “অনেক দিন ধরে আমরা এই বিষয়ে ভয় পেয়ে ঘুরপাক খাচ্ছি। এবার কঠিন সিদ্ধান্ত নিতেই হবে।” পত্রিকাটি পরিকল্পনাটিকে “সাহসী পদক্ষেপ” আখ্যা দিয়ে লিখেছে—“নতুন আসা সব অবৈধ অভিবাসীকে এক সপ্তাহের মধ্যে ফেরত পাঠানো হবে।”
বর্তমান বাস্তবতা ও সীমাবদ্ধতা
সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালে যুক্তরাজ্য থেকে প্রায় ৩৪ হাজার মানুষকে ফেরত পাঠানো হয়েছিল—যার মধ্যে বাধ্যতামূলক বহিষ্কার ছিল মাত্র ৮ হাজারের মতো। অর্থাৎ টোরিদের ঘোষিত লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে গেলে বর্তমান সক্ষমতা প্রায় চারগুণ বাড়াতে হবে।
বর্তমানে দেশটির ডিটেনশন সেন্টার বা আটকাগারে জায়গা আছে প্রায় ২২০০ জনের মতো, যার ৭০ শতাংশের বেশি আসন সবসময় পূর্ণ থাকে। ফলে নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গেলে বিশাল পরিমাণ অবকাঠামো, জনবল ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা লাগবে।
ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি
টোরিরা বলছে, এই কঠোর পদক্ষেপ মূলত ছোট নৌকায় চ্যানেল পাড়ি দেওয়া অবৈধ অভিবাসীদের নিয়ন্ত্রণে আনতেই নেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে ৪৩ হাজারেরও বেশি মানুষ ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করেছে—যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ছোট নৌকায় আগত অভিবাসীরা মোট অভিবাসীর একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র, কিন্তু রাজনীতিতে বিষয়টি অতিমাত্রায় আলোচিত।
লেবার পার্টির প্রতিক্রিয়া
প্রধান বিরোধী দল লেবার পার্টি বলেছে, “বছরে ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে ফেরত পাঠানোর লক্ষ্য অবাস্তব।”
তাদের দাবি, সরকার যদি পূর্ববর্তী রুয়ান্ডা পরিকল্পনা-র মতো প্রকল্প হাতে নেয়, তাতে ব্যর্থতাই ঘটবে। লেবার সরকার বর্তমানে সীমান্ত সুরক্ষার জন্য একটি Border Security Command চালু করেছে এবং ফ্রান্সের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক “ওয়ান-ইন, ওয়ান-আউট” নীতি নিয়ে কাজ করছে।
আইন, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, টোরিদের প্রস্তাব আন্তর্জাতিক আইনের non-refoulement নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে, কারণ এটি কাউকে এমন দেশে ফেরত পাঠানো নিষিদ্ধ করে যেখানে তার জীবন বা মানবাধিকার বিপন্ন হতে পারে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (UNHCR) আগেও এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, অনিয়মিত পথে আগত আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদন সরাসরি বাতিল করা আন্তর্জাতিক চুক্তির লঙ্ঘন হবে।
এছাড়া ECHR থেকে যুক্তরাজ্য বেরিয়ে গেলেও মানবাধিকার সংরক্ষণ সম্পর্কিত দায়বদ্ধতা সম্পূর্ণ বাতিল হবে না, কারণ দেশটির আদালত নিজস্ব আইনেও মানবিক সুরক্ষার ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
টোরি পার্টি বর্তমানে জনসমর্থনে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে এবং রিফর্ম ইউকের মতো দক্ষিণপন্থী দলের চাপ বাড়ছে। তাই এই কড়া অভিবাসন নীতি তাদের নির্বাচনী কৌশলের কেন্দ্রে চলে এসেছে। দলটি বিশ্বাস করছে, কঠোর সীমান্তনীতি দেখিয়ে তারা হারানো জনসমর্থন ফিরে পেতে পারে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, মূল প্রশ্ন এখনও রয়ে গেছে—এত বিপুল সংখ্যক মানুষকে ফেরত পাঠানো সম্ভব হবে কীভাবে, কোন দেশে পাঠানো হবে, এবং আদালত বা মানবাধিকার সংস্থা এ বিষয়ে কী অবস্থান নেবে।

